বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু হবে বাংলাদেশ – রেহমান সোবহান

Originally posted in দৈনিক ইনকিলাব on 6 October 2026

বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র যখন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ার দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে, ঠিক তখনই ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬। বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভূ-রাজনীতি, টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কৌশল নির্ধারণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশি-বিদেশি শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কার, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। সম্মেলনের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশ কেবল একটি উদীয়মান অর্থনীতি নয়, বরং আগামী দশকে বিশ্ব অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

সম্মেলনের প্রথম দিনে উদ্বোধনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখা উন্মোচন করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের ধাপে প্রবেশ করেছে। সরকারের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি বিশ্বস্ত উৎপাদন এবং বিনিয়োগের হাবে রূপান্তর করা। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং সুশাসনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদী কর্মপরিকল্পনায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের নৌপথ, বন্দর এবং উপকূলীয় মৎস্য ও পর্যটন সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য তিনি আঞ্চলিক অংশীদারদের একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে উঠে আসে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সিপিডি-এর চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্লেষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র এখন পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এশিয়ার দিকে, বিশেষ করে চীন ও ভারতের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই দুই পরাশক্তির মাঝখানে ভৌগোলিক অবস্থান হওয়ার কারণে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাজারের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে। তিনি অতীতের ব্যর্থতা কাটিয়ে ভৌগোলিক সুবিধার পূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তাঁর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশ কেবল একটি দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্র নয়, বরং এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, সঠিক অর্থনৈতিক সংস্কার বজায় রাখলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটিতে পরিণত হবে। তিনি বাংলাদেশকে উচ্চাকাক্সক্ষা এবং পরিণতির দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশের বাজারে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির তাগিদ দেন। তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।

তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত সমতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে পুঞ্জীভূত না থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক মডেলের পক্ষে তিনি মত দেন। তিনি ড. ইউনূসের থ্রি জিরোস ধারণার আলোকে শূন্য কার্বন নির্গমন, শূন্য বেকারত্ব এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে শূন্য অর্থনৈতিক বৈষম্য অর্জনের আহ্বান জানান। তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি নৈতিক ও টেকসই ভিত্তি তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়নের ওপর আলোকপাত করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে যৌথ অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা আবশ্যক। এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাজ্যের উন্নয়নশীল দেশসমূহের বাণিজ্য স্কিম-এর আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখার বিষয়ে তিনি ইতিবাচক বার্তা দেন। তাঁর এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং বাংলাদেশকে কেবল বাণিজ্যের গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং একটি উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার কথা জানান। তিনি বলেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জিং সময়েও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে। কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, জলবায়ু, প্রযুক্তি, অ্যারোস্পেস, শিক্ষা ও দক্ষতা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বহুদূর নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই সম্পর্ক এখন আর কেবল দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন যৌথ সমৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অংশীদারিত্বে পরিণত হচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির চারটি মূলনীতি তুলে ধরে বলেন, জাতীয় স্বার্থ হবে পথপ্রদর্শক, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হবে শক্তি, অংশীদারত্ব সৃষ্টি করবে নতুন সুযোগ এবং শান্তিই থাকবে চূড়ান্ত লক্ষ্য। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও অর্থনীতিকেন্দ্রিক হতে হবে। বাংলাদেশের বিদেশস্থ মিশনগুলোকে নতুন বাজার অনুসন্ধান, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বাংলাদেশি পণ্যের প্রচার এবং দেশের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। বঙ্গোপসাগরকে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

সম্মেলনে দুর্বল ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমাণ যুক্ত করলেই সংকট কাটবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন। তারা বলেন, এআই ব্যবহারের আগে সিস্টেম সংস্কার, স্থানীয় ও মানসম্মত তথ্য নিশ্চিত করা এবং তথ্য ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক ফাইয়াজ ইয়াসিন বলেন, সরকার ও জনগণের মধ্যে আগে থেকেই আস্থার বড় ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় এআই সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করবে, নাকি আরও ১০-১৫ বছর সমস্যা সমাধান না করার অজুহাত হয়ে উঠবে, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদ ও এআই গবেষক শিমেলসে মেকোনেন এআই ব্যবহারে স্থানীয় বাস্তবতা ও তথ্যের গুরুত্বের কথা বলেন। সোলশেয়ারের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সেবাস্তিয়ান গ্রোহ মনে করেন, মানুষকে সম্পৃক্ত না করে অ্যালগরিদমের ওপর আস্থা তৈরি করা কঠিন। অ্যাকাউন্টেবিলিটি ল্যাব নেপালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক নারায়ণ অধিকারী বলেন, প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সিটি ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের সহযোগী প্রফেসর মার্কো স্কোরিক বলেন, অ্যালগরিদমের অতিরিক্ত বাছাইয়ের কারণে মানুষ একই ধরনের বিষয় বারবার দেখতে থাকে, ফলে ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়।

সিজিএস-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক সুশাসনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং একই সঙ্গে বাণিজ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে যেকোনো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের সহযোগী প্রফেসর ড. সেবাস্তিয়ান গ্রোহ বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে পরিবেশগতভাবে টেকসই করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, কার্বন নিঃসরণ না কমিয়ে যদি অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন চলতে থাকে তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে বড় ধরনের সংকটে ফেলবে। তাই একটি পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন গভর্নেন্স মডেলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।

অর্থনীতিবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬-এর আলোচনা থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তিনটি প্রধান দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারÑবিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে অভ্যন্তরীণ বাজার সংস্কার ও সমান আইনি নীতি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক সংযোগ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, টেকসই উন্নয়ন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ এখন কেবল একটি উদীয়মান অর্থনীতি নয়, বরং আগামী দশকে বিশ্ব অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.