ব্যবসার উচ্চ ব্যয় ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে: ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড on 7 October 2026

বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৪ শতাংশের পূর্বাভাস: দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন।

ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসলেও—বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। তাদের সর্বশেষ “বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট”-এ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস—ব্যাপকভাবে কমিয়ে ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থা।

গত এপ্রিলে ৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করে বিশ্বব্যাংক, সেখান থেকে এবার ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়েছে তারা। এই নতুন পূর্বাভাস ২০২০ সালের কোভিডের অভিঘাতকালীন ৩.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম, এবং সরকারের নির্ধারিত ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের প্রস্তাবিত প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন। অথচ ২০২৭ সালে পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গড় প্রবৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

গতকাল এই প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংক্ষেপে বলেন, “ওয়েট অ্যান্ড সি”।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ থমকে গিয়েছিল। নির্বাচিত সরকার আসার পর ব্যবসায়ী সমাজ একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করলেও, বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আট মাস পার হলেও—কাঠামোগত বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে বাধা সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হওয়া, ব্যাংকিং খাতের চরম দুর্বলতা, বেসরকারি ঋণের মন্থর প্রবৃদ্ধি এবং প্রত্যাশার চেয়ে কঠিন রাজস্ব সীমাবদ্ধতাই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমানোর মূল কারণ।”

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, অর্থনীতির এই স্থবিরতা মূলত দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রধান চালিকাশক্তিতে জমে থাকা দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, বর্তমানে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত—প্রথমত, বিদ্যমান সংকটকে যেন আর গভীর হতে না দেওয়া এবং দ্বিতীয়ত, তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে দূর করা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যবসার উচ্চ ব্যয়, অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং খাতের সুদীর্ঘ দুর্বলতা প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কাজ নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

রপ্তানিতে মন্থরতা

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে জানিয়েছে যে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও দুর্বল থাকবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, “ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানির গতি মন্থর হয়ে পড়বে।”

গত মাসে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) চলতি অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। তার আগে জুলাই মাসে ৪.৫ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৪.৭ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছিল ঋণদাতাটি। বিশ্বব্যাংক ও এডিবি—উভয়ই সরকারের নির্ধারিত ৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার থেকে অনেক কম প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করেছে।

বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রাক্কলন অনুযায়ী, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা টানা তৃতীয় বছরের মতো প্রবৃদ্ধির পতনকে নির্দেশ করে।

“এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়”

দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে, ২০২৩ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে। আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের ভঙ্গুরতা, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট এবং সরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করেছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেম বলেন, অর্থনীতিকে মন্দার হাত থেকে বাঁচাতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “দরিদ্রদের সুরক্ষা এবং আরও ভালো কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে ত্বরান্বিত করতে হবে। এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।”

জ্যাঁ পেম ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যেখানে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, ২০২৬ সালে তা লাফিয়ে ৩২.২ শতাংশে পৌঁছেছে।

ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিকে আরেকটি বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সম্পদমূল্য বা অ্যাসেট কোয়ালিটি পর্যালোচনা শেষ করা, এবং কার্যকর ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন ও তাদের পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে মূলধন জোগানোর তাগিদ দেন।

একই সাথে বেসরকারি বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে কমে গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩০ বছরের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিবেশ ও অনিশ্চয়তার কারণে, ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহ পাচ্ছেন না।

রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটাইজেশন, করের আওতা বাড়ানো এবং কর ছাড় ব্যবস্থাপনার উন্নতির ওপর জোর দিয়েছেন জ্যাঁ পেম। এছাড়া জ্বালানি খাতের সংস্কারে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, সুশাসন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে

দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্থরতা, শ্রমের চাহিদা হ্রাস এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিবারের সার্বিক কল্যাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উভয়ই বেড়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার ১.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে এক বছরের ব্যবধানে দেশে নতুন করে আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়েছে।

জাতীয় দারিদ্র্যের হারও টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়ে ২০২৬ সালে ২২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে ২২.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, তবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে সামান্য কমে ২২.৪ শতাংশে নামতে পারে।

আয়ের বৈষম্য পরিমাপক ‘গিনি সহগ’ ২০২৬ অর্থবছরে ০.৯ পয়েন্ট বেড়ে ৩৪.৯-এ পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের চেয়ে ৪ পয়েন্ট বেশি। নিকট ভবিষ্যতে আয়ের এই বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছর নাগাদ গিনি সহগ ৩৫.৬-এ পৌঁছাতে পারে।

লক্ষ্যভিত্তিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে দারিদ্র্য থেকে রক্ষা পেতে পারে ২৮.৫ লাখ মানুষ

শ্রমের দুর্বল চাহিদা ও ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোর আয় কমিয়ে দিয়েছে, যা বহু পরিবারকে নতুন কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কার সামনে অরক্ষিত করে তুলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষা ও ভর্তুকি খাতে বার্ষিক জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ ব্যয় করলেও—দেশের চরম দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পায় না।

কেবল ফ্যামিলি কার্ড-এর কার্যকর ব্যবহারই আনুমানিক ১৫.৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে রক্ষা করতে পারে। এর সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক অনুদান এবং খাদ্য ও নগদ সহায়তার সমন্বয় করা গেলে, নতুন করে আরও ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলা সম্ভব বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।

জ্যাঁ পেম প্রান্তিক পরিবারগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে পাইকারি ভর্তুকি থেকে সরে এসে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

মূল্যস্ফীতি চড়া থাকবে, প্রকৃত মজুরি ঋণাত্মক

বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশের মতো উচ্চ হারে থাকবে এবং মধ্যমেয়াদে এটি ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে।

তবে দেশের বাজারে জ্বালানির উচ্চ মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং তুলনামূলক কম সংকুচিত মুদ্রানীতির কারণে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি কমার গতি মন্থর থাকবে। পরবর্তীতে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমলে, এবং মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে এটি কমতে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সুচিন্তিত ও সতর্ক মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং ব্যাংক খাতকে সহায়তা দিতে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ায়—এমন অর্থায়ন এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি বলে বিশ্বব্যাংক মনে করছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরির প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক। ৯ শতাংশের ওপরে থাকা খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি ও পরিষেবা খাতের বাড়তি খরচ শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত করেছে।

অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকিং, জ্বালানি, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস, বন্দর, পরিবহন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—এই খাতগুলো বর্তমানে সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে টেনে ধরছে।

তবে জ্বালানি সংকট এবং উচ্চ খেলাপি ঋণ মোটেও নতুন সমস্যা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তাই প্রথম কাজ হলো পরিস্থিতির যেন আর কোনো অবনতি না ঘটে, তা ঠেকানো। বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যান্য মৌলিক শর্তাবলির দৃশ্যমান উন্নতি করতে হবে।”

এই অর্থনীতিবিদ জানান, মন্থর প্রবৃদ্ধি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সীমিত করে দিচ্ছে, যা ঘুরেফিরে মানুষের মজুরি ও আয় বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি জনগণের ক্রয়ক্ষমতাকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষয় করছে।

তিনি বলেন, “প্রবৃদ্ধি দুর্বল, কর্মসংস্থান সীমিত, মানুষের আয় বাড়ছে না, অথচ মূল্যস্ফীতি চড়া রয়ে গেছে। এই সবকিছুর সমন্বিত প্রভাবে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।”

দারিদ্র্য নিরসনের জন্য কেবল সামাজিক সুরক্ষামূলক সহায়তাই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর জন্য প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং এবং জ্বালানি সরবরাহের মতো মৌলিক জায়গাগুলোর দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (কস্ট অব ডুইং বিজনেস) বেশি হওয়া এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ দুর্বল রয়ে গেছে।”

সরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের মন্থর গতি এবং বিশ্ববাজারে রপ্তানি চাহিদা কমে যাওয়াও—অর্থনীতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদী নিম্ন প্রবৃদ্ধি দেশে দারিদ্র্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে।

ড. ফাহমিদা বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের—বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর—ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে, যেখানে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বৃদ্ধি একেবারেই পর্যাপ্ত ছিল না।”

এসব সংকট সমাধানের উপায় বাতলে তিনি বলেন, যেসব ব্যাংক এখনো টিকে থাকার সামর্থ্য রাখে (ভাইয়েবল), সেগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট পুনর্গঠন পরিকল্পনা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা উচিত। আর যেসব ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে অক্ষম (নন-ভাইয়েবল), আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে এবং করদাতাদের ওপর আর্থিক দায় সর্বনিম্ন রাখতে সেগুলোর সুশৃঙ্খল অবসান বা বিলুপ্তির (অর্ডারলি রেজোলিউশন) ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ আরও যোগ করেন, “ঋণ আদায় ব্যবস্থার জোরদার উন্নতি করতে হবে এবং বড় কোনো খেলাপিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণদানের সিদ্ধান্তে সুশাসন জোরদার, স্বচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।”

দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস

বিশ্বব্যাংক তাদের “সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট”-এ জানিয়েছে, জ্বালানির উচ্চ মূল্য সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি শক্তিশালী রয়েছে।

২০২৬=২৭ অর্থবছরে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি নিয়ে অঞ্চলে শীর্ষস্থানে থাকবে ভারত। বৈশ্বিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও জোরালো রপ্তানি দেশটির এই প্রবৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রাখবে।

৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভুটান দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দ্বিতীয় দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার জিডিপি ৪.২ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হলেও, দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি এখনো অসম রয়ে গেছে।

প্রত্যাশার চেয়ে পর্যটন খাত বেশি স্থিতিশীলতা দেখানোয় ২০২৬ সালে মালদ্বীপের অর্থনীতি ২.২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে ২০২৭ সালের জন্য দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.১ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৪.১ শতাংশে নামানো হয়েছে।

পণ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য– সেবা ও শিল্প খাতকে চাপে রাখায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি সার্বিকভাবে ৩.৮ শতাংশে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বন্যায় জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলা এবং বাণিজ্য, পরিবহন ও পর্যটন খাতের স্থবিরতা—সেবা খাতকে সংকুচিত করায়, নেপালের প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৭ শতাংশে নামার প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে ধীরগতির অর্থনীতি আফগানিস্তানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.