Wednesday, January 28, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

ভোগ্যপণ্যের বাজারে তথ্যের অন্ধকারই নিয়ন্ত্রণের প্রধান বাধা: ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in দৈনিক বাংলা on 19 January 2026

রোজায় এবারও ভোগাবে আমদানিনির্ভর পাঁচ পণ্য

বছর ঘুরে আবারও দোরগোড়ায় চলে এসেছে শবে বরাত ও রমজান মাস। আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত ও ১৭ ফেব্রুয়ারি রোজা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে হিসাবে শবে বরাত আসতে বাকি ১৭ দিন, আর রোজা আসতে বাকি ঠিক এক মাস। প্রতি বছর রোজা ও শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ভোগ্যপণ্য আমদানি ও মজুদের উদ্যোগ নেওয়া হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। গত ৪ থেকে ৫ মাস ধরে পণ্য মজুদের তোড়জোড় চলছে। ইতোমধ্যেই অনেক পণ্য চলে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দরে, কিছু আছে পাইপলাইনে। তবে এবার রোজার আগে ভোক্তাকে ভোগাতে পারে ৫ ধরনের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য। কারণ, আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি ভালো হলেও শবে বরাত ও রোজার আগে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দেন। এবার যে পাঁচ ধরনের পণ্য ভোক্তাকে ভোগাতে পারে তার মধ্যে আছে- ভোজ্য তেল, চিনি, পেঁয়াজ, খেজুর এবং সবজি। এর মধ্যে সবজি বাদে বাকি চার পণ্যই আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বিগত চার-পাঁচ মাসে পেঁয়াজ আমদানি কম হলেও ভোজ্য তেল, চিনি এবং খেজুর আমদানি বেড়েছে এবং মজুদ পরিস্থিতিও খারাপ না। তবু এসব পণ্যের দাম ঠিকই বেড়ে যাবে রোজার আগে। এই পাঁচ পণ্যের বাইরে মুরগি, মাছ, গরুর মাংস, ছোলা এবং বেসনের দামও বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে রোজার আগ দিয়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, শবে বরাত-রোজার মতো বড় উপলক্ষ এলেই বেপরোয়া হয়ে উঠেন ব্যবসায়ীরা, সিন্ডিকেট করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে কষ্ট দেন ভোক্তাকে। এ মন্তব্য করে বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা নিজেদের মুনাফা ছাড়া আর কিছুই চেনে না। রোজার মাস ঘিরে তারা সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকে বাড়তি মুনাফা লুফে নেওয়ার জন্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না, বরং এবার বাজার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কেননা সামনে নির্বাচন, সরকারসহ সবার নজর এখন নির্বাচনের দিকে। বাজারের ভোগ্যপণ্যের দিকে কারও তেমন নজর নেই। তা ছাড়া নির্বাচন হয়ে গেলে নতুন সরকার এসেই বাজার সামাল দিতে পারবে না। তাই এবার রোজায় দেশের মানুষকে আরও বেশি ভুগতে হতে পারে ভোগ্যপণ্য নিয়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে বিগত সরকারের মতো একই পন্থায় কাজ চলছে এখনো। পণ্যের সাপ্লাই চেইনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকে না সরকারের হাতে, এতে এক রকম সংকট দেখা দেয়। প্রতি বছরই দেখা যায় শবে বরাতের আগ পর্যন্ত গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু বেড়ে যায় শবে বরাতের আগে। এখন বাজারে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায় গরুর মাংস পাওয়া যাচ্ছে, শবে বরাতের আগে বেড়ে ৮৫০ টাকা কেজি হবে না- এটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাবে না। তাই সরকারের উচিত ভোটের পাশাপাশি বাজারের দিকেও নজর দেওয়া।

অন্যদিকে এনবিআর ও চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, এ বছর আমদানি নির্ভর ৬ পণ্যের আমদানি পরিস্থিতি বেশ সন্তোষজনক। গত বছরের রোজার আগের পাঁচ-ছয় মাস আগ দিয়ে এসব পণ্য যে হারে আমদানি হয়েছিল, এ বছর আমদানি পরিস্থিতি তার চেয়ে ভালো। পণ্য আমদানি বেশি হলে তো পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা না। অথচ বিগত সরকারের আমলেও দেখা গেছে পণ্য পর্যাপ্ত আমদানি হলেও শবে বরাত ও রোজার আগ দিয়ে ঠিকই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে পণ্যমূল্য। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও আগের সরকারের পথেই হাঁটছে। পণ্য মূল্য কমাতে বা বাজার নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি এই সরকারকে।

বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে রোজা ও শবে বরাতে মূলত চিনি, ভোজ্য তেল, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজ ও গরুর মাংসের চাহিদা বেড়ে যায়। এর মধ্যে গরুর মাংসের জোগান প্রায় শতভাগই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই মেটানো হয়। বাকি ছয় পণ্য আমদানিতে প্রায় ছয় মাস আগে থেকে আমদানির প্রস্তুতি নিতে হয়। ডলার সংকট এবং ঋণপত্র বা এলসি খোলার জটিলতা থাকলেও এবারও এসব পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে গত বছরের চেয়ে পণ্য আমদানি পরিস্থিতি বেশ ভালো এবার।

পণ্য আমদানি পরিস্থিতি : সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, মটর ডাল ও খেজুরের মতো পণ্য বেশি পরিমাণে আমদানি করতে চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেকটাই বেড়েছে। তথ্য বলছে, এ সময় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেল আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ ও খেজুরের আমদানি ২৩১ শতাংশ বেড়েছে। মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, এডিবল অয়েল লিমিটেড ও টিকে গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ভোজ্যতেল ও চিনির প্রধান আমদানিকারক।

অন্যদিকে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডাল ও ছোলাজাতীয় পণ্য আমদানি করে বেসরকারি ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক গ্রুপগুলো। কারণ দেশীয় উৎপাদন চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মেটায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট ৬.২৯ বিলিয়ন ডলার ও অক্টোবরে ৫.৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টন সয়াবিন তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫৬৪ টন। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৭২ টন চিনি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৪৪৬ টন।

অন্য নিত্যপণ্যের আমদানিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৫০ হাজার ৩৫৫ টনের, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬ হাজার ৯১২ টন। ছোলার এলসি ৪২ হাজার ৮৯১ টন থেকে বেড়ে ৫৪ হাজার ৫১৬ টনে দাঁড়িয়েছে। গত দুই মাস নভেম্বর-ডিসেম্বরেও প্রায় একই হারে এলসি খোলা হয়েছে বলে জানা গেছে।

আমদানিকারক ও ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার আগেভাগেই চিনিসহ ছয় ধরনের পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার বেড়েছে। কারণ রমজানে এসব পণ্যের চাহিদা সাধারণত অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য আগেভাগেই পণ্যগুলো আমদানির ঋণপত্র খোলা বাড়িয়েছেন এবং চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি শুরু করেছেন।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, খেজুর, মটর ডাল ও চিনির চাহিদা রমজানে বেড়ে যায়। বছরজুড়ে দেশে ছোলার চাহিদা থাকে দেড় লাখ টন। এর মধ্যে শুধু রমজানে পণ্যটির চাহিদা থাকে ৯৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন। বর্তমানে বিশ্ববাজারে পণ্যটি ৬০-৬২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে আমদানি খরচসহ অন্য খরচ মিলিয়ে পাইকারিতে ৭০-৭৫ টাকায় ক্রেতারা কিনতে পারবেন বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত সাড়ে চার মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খেজুর আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৮৮৩ টন, মসুর ডাল ৪০ হাজার ২৬ টন, মটর ডাল (সব ধরনের) ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৯ টন ও ছোলা ১১ হাজার ৬২৪ টন।

চিনির বাজার সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, আগে চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন মিলমালিকরা। তারাই ইচ্ছামতো দাম বাড়াতেন এবং কমাতেন। এসব মিলমালিক ছাড়া অন্য কেউ চিনি আমদানি করতে পারতেন না। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চিনি আমদানি উন্মুক্ত করে দেয় সরকার। যে কারণে নতুন করে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি করছেন। সে কারণে এবার চিনির দাম না বাড়ার কথা, কিন্তু রোজার আগে ঠিকই বেড়ে যায়।

ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, পণ্যের আমদানি ভালো হলেও ডলারের মূল্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋণপত্র খোলা নিয়ে নানান জটিলতার কারণে সার্বিকভাবে পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। ফলে পণ্যের দামেও সেটির প্রভাব দেখা যাবে।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রধান সমস্যা হচ্ছে বাজার ব্যবস্থায় প্রত্যেকটা পণ্যের সাপ্লাই চেইনের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের জানা নেই। কে কতটুকু আমদানি করছেন, কে কত পরিমাণে এবং কত টাকায় বিক্রি করছেন, তারও কোনো সঠিক তথ্য জানা নেই। এই দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজারের দীর্ঘকালীন এই সমস্যা সমাধানের জন্য ডিজিটাল সাপ্লাই চেইনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, এখন পর্যন্ত আমার চোখে পড়েনি দীর্ঘময়াদি বা বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে।