Thursday, March 19, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Mustafizur Rahman

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে চাপ সামলানোর প্রস্তুতি দ্রুত নিতে হবে – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in বণিকবার্তা on 17 March 2026

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এখনো ওই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। খুব শিগগিরই হবে এমনটিও প্রত্যাশা করা যাচ্ছে না।

আর এ সংঘাতের ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক অভিঘাত থেকে বাংলাদেশ দূরে থাকতে পারব না। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আমাদের ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরের হলেও এ যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সংকটগুলো দেশকেও বিপর্যস্ত করবে। এ যুদ্ধের অভিঘাত দেশের অর্থনীতি, বিদেশে জনশক্তি রফতানি, জ্বালানি চাহিদা ও মজুদ করার প্রক্রিয়াকে নানাভাবে ব্যাহত করবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সমস্যা দেখা দেবে। আন্তর্জাতিক পরিসরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—এ দুই পর্যায়েই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগটাই অধিক। যুদ্ধের কৌশলগত অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি কিছুদিন বন্ধ রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে তা সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত করে দিয়ে তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ছাড়া সবার জন্য প্রণালিটি উন্মুক্ত। বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজের দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি মিত্রদের যুদ্ধজাহাজ প্রেরণের আহ্বান করেছেন। যদিও এখন পর্যন্ত দেশটির কোনো মিত্রপক্ষই সক্রিয়ভাবে সাড়া দেয়নি। জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ রুট অনিরাপদ থাকায় অনেক তেলবাহী জাহাজ এখান দিয়ে চলাচল করছে না। আর করলেও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের ফলে জ্বালানি তেলের আমদানি উৎস, সরবরাহ এবং প্রাপ্তির পথ সংকুচিত হয়ে উঠছে। এর প্রভাবে ব্যয় বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কিছু চুক্তি অবশ্য রয়েছে। কিন্তু সেগুলো এত স্বল্প সময়ে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। চুক্তি বাস্তবায়ন করতে না পারায় জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানোর জন্য স্পট প্রাইজ বা নগদ মূল্য দিয়ে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। বেশি মূল্যে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে কিছু চাপ পড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে অনেক আমদানিকারকও বিপাকে পড়েছেন। অনেকের প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক কাঁচামাল কিংবা বাণিজ্যিক পণ্য এখনো বিভিন্ন বন্দরে আটকে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি নিরাপদ নয় বিবেচনায় অনেক জাহাজ পরিবহন সংস্থা পরিবহন সেবা দিচ্ছে না। আর যেগুলো দিচ্ছে সেগুলো আফ্রিকার দক্ষিণের উত্তমাশা অন্তরীপ কিংবা কেপ অব গুড হোপ দিয়ে পণ্য পরিবহন করছে। অর্থাৎ তারা মধ্যপ্রাচ্য ও নিকটস্থ এলাকাগুলো এড়িয়ে চলেছে। বিকল্প ওই রুটে পরিবহন সেবা শুরু হওয়ায় পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়েছে। অর্থাৎ যেসব ব্যবসায়ী আমদানি করা পণ্যের মাধ্যমেই বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন তারাও বিপদগ্রস্ত হয়েছেন।

শুধু বাণিজ্যিক কার্যক্রমই এক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছে এমনটি নয়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ আসে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের মাধ্যমে। প্রতি বছর বহু মানুষ কর্মজীবনের উদ্দেশে বিদেশগমন করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের গন্তব্য থাকে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করায় সেখানে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর স্থানীয় অনেকেই বাড়িতে নিরাপদ অবস্থান নিচ্ছেন। এ সময় খাবার বা অন্য কোনো সেবার জন্য তারা ডেলিভারি সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। ডেলিভারি সার্ভিসের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোতে বাংলাদেশী প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে জড়িয়ে পড়ছেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যেও অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়েছে। জীবিকার তাগিদেই প্রবাসী অনেকে এসব কাজে জড়াচ্ছেন। প্রবাসীদের এ সমস্যাগুলো থেকেও মনোযোগ ফেরানোর সুযোগ আমাদের নেই। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে থাকা দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় হতে হবে।

এছাড়া যারা বিদেশগমন করতে আগ্রহী তাদের যাওয়া ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, বিশ্বের অনেক দেশই নিরাপত্তাজনিত কারণে ফ্লাইট বাতিল করছে। ফলে অনেকে সব প্রক্রিয়া শেষ করেও বিদেশ যেতে পারছেন না। অনেক দেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে ভিসা বন্ধ রেখেছে। কিছু দেশ তাদের ভিসার সময়সীমা বাড়িয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে ভিসা প্রক্রিয়া ও নীতিও অনেকাংশে দুর্ভোগের কারণ হয়ে গেছে। এগুলোও বড় সমস্যা। কারণ এগুলো রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর সরাসরি অভিঘাত ফেলবে। স্বল্পমেয়াদে বিষয়টি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে কিছুদিন আগেও অনেকে নানাভাবে আয় করেছেন। সংকটকালীন অনেকে দেশে বেশি টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে আয়ের পরিসরও কমে যাবে। তখন দেখা যাবে, প্রবাসীরা খুব বেশি অর্থ পাঠাতে পারছেন না।

সব মিলিয়েই আমরা একটা জটিল পরিস্থিতিতে রয়েছি। এদিকে সদ্য একটি নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। জ্বালানি তেলের এমন একটি পণ্য যার সরবরাহ ও দামের ওপর অনেকগুলো পণ্য ও সেবার দাম নির্ভরশীল। এ পণ্যটির ওপরই যখন চাপ তৈরি হয়েছে তখন মূল্যস্ফীতি বাড়ার উদ্বেগ থাকাটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাজারের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এখন যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের এ বাজার স্থবির কিংবা অস্থিতিশীল তাই আমাদের বিকল্প বাজারের অনুসন্ধান করতে হবে। এজন্য বাংলাদেশের উদ্যোগ আছে। এক্ষেত্রে ব্রুনাইয়ের দারুস সালাম একটি বিকল্প। আবার কিছু জ্বালানি আমদানির জন্য ভারতের সঙ্গেও আমাদের আলোচনা শুরু হয়েছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের ডিজেলের যে পাইপলাইন আছে সেটাকে ব্যবহার করে কম ব্যয়ে জ্বালানি তেল আনা সম্ভব। আবার ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা হয়। ভারত ও নেপালের সঙ্গে আলোচনা করে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে জ্বালানি পণ্য আনা যায় কিনা এ জন্য আলোচনা করা যেতে পারে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির জন্য রাশিয়া একটি ভালো বাজার। ভারত এখন রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কিছু জটিলতা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি সে অবস্থার পরিবর্তন আসছে। এখন আমরাও আশু সমস্যা সমাধানে রাশিয়ার তেল পেতে পারি কিনা এ নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু এখানে একটি সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক কিছু বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। এসব বাধ্যবাধকতা দেশের জন্য নানা দিক থেকে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এরই মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এটি চূড়ান্ত কিছু নয়। তাই এ চুক্তির বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। আমাদের এখন জাতীয় স্বার্থ ও সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হতে হবে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটানোর জন্য এবং এটি যেন জনদুর্ভোগের কারণ না হয় সেজন্য সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। জানা গেছে, জ্বালানি তেলবাহী কয়েকটি জাহাজ এরই মধ্যে দেশে আসছে। জ্বালানি তেলের সংকটের কথা শুনে যখন অনেকের মধ্যে উদ্বেগ ভয়াবহ বেড়েছিল তখন সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে। সেটিও জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে তুলে দেয়া হয়। এগুলো ইতিবাচক পদক্ষেপ। এ সময়ে সংকট আকস্মিকভাবেই আসবে। তাই আমাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। সমস্যার আশু সমাধান করার মতো মানসিকতা রেখে উদ্যোগ নিতে হবে। যেকোনো পদক্ষেপ হবে তাৎক্ষণিক।

বিদ্যমান সংকটকালীন আমাদের আরেকটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ নেই বললেই চলে। জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ সক্ষমতা হওয়ার পর কৌশলগত মজুদের অবকাঠামো এবং তা সংরক্ষণের ব্যয় কীভাবে আসবে—এসব সার্বিক বিষয় নিয়ে ভাবনা থাকবেই। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশলগত মজুদ সীমিত পরিসরে হলেও শুরু করা জরুরি। তাতে যেকোনো আকস্মিক জটিলতায় আমরা কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকতে পারব। এ স্বস্তির মূল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশের মানুষের মনে আতঙ্ক দেখা দেয়। জ্বালানি তেলের মজুদের বিষয়ে আস্থাহীনতার কারণেই এমন আতঙ্ক। যখন কোনো পণ্যের মজুদ থাকে, তখন সবার মনে আস্থা অন্তত থাকে। এক্ষেত্রে মানুষ আতঙ্কিত হয় না এবং সরকারের পক্ষেও তাৎক্ষণিক জটিলতা মোকাবেলা করা স্বস্তিদায়ক হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিই অচলাবস্থায় পড়বে। একদিকে মূল্যস্ফীতি আর অন্যদিকে শ্লথ প্রবৃদ্ধি অর্থাৎ স্ট্যাগফ্লেশনের দিকে বিশ্ব যেতে পারে। এ বাস্তবতা বিবেচনা করে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এ কথা সত্য, আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি রেমিট্যান্স ও কিছু শিল্প খাতের রফতানি আয়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আমাদের দেশের সিংহভাগ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দখলে রেখেছে। এখানকার সামগ্রিক ক্রমবর্ধমান চাহিদা আমাদের বড় শক্তি। নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির চাহিদা পূরণ, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, ক্রয়ক্ষমতা সৃষ্টির মতো বিষয়গুলো ভেবে কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। ভারত তো হরমুজ প্রণালি দিয়েই তেল পরিবহনের বিষয়ে ইরানের সঙ্গে সফল আলোচনা করে ফেলেছে। আমাদের পক্ষেও তা সম্ভব অবশ্যই। এটি কূটনৈতিক তৎপরতা, প্রজ্ঞা এবং ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার বিষয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সংঘাতে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো কোলেটারাল ড্যামেজের শিকার হয়। যুদ্ধ যত দ্রুত থামবে, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। কিন্তু তা দীর্ঘায়িত হলে জটিলতা সামলানোর মতো মানসিকতা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি আমাদের রাখতেই হবে।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.