Tuesday, February 17, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Khondaker Golam Moazzem

নতুন সরকারের মন্ত্রী হওয়ার ‘যোগ্যতা’ কী – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

Originally posted in সমকাল on 16 February 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। মন্ত্রিসভাও শপথ নিতে যাচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংবিধান অনুযায়ী তিনি সরকার পরিচালনায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রী বেছে নিয়ে পছন্দমতো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেবেন। মন্ত্রিসভার এক-দশমাংশ সদস্যকে অনির্বাচিত বা ‘টেকনোক্র্যাট’ কোটায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

সচরাচর দেখা যায়, মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচনের মাপকাঠি হিসেবে রাজনৈতিক দক্ষতা, আঞ্চলিকতা, ধর্মীয় পরিচয়, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বশীলতা প্রভৃতি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেখা গেছে, মন্ত্রী হিসেবে এসব মাপকাঠি ‘প্রয়োজনীয়’ হলেও ‘পর্যাপ্ত’ নয়। বিগত সময়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্ষমতা, অভিজ্ঞতার অভাব, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র হস্তক্ষেপ, মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব, মন্ত্রী-সচিব দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্বলতা সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

বর্তমান কাঠামোতে অন্তত ৫০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। এসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা রাজনৈতিকভাবে প্রজ্ঞাবান হবেন– এটা প্রত্যাশিত। কিন্তু মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক কাজে আগ্রহ, সমস্যার গভীরে গিয়ে অনুধাবন, বিষয়ভিত্তিক তথ্যপ্রমাণ ও গবেষণায় জোর, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন, মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক ‘দুষ্টচক্র’ বিষয়ে সচেতনতা, সরকারি প্রকল্প প্রস্তুতি, প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতায় সর্বোচ্চ নজরদারি ইত্যাদি মন্ত্রী হিসেবে ‘বিশেষ যোগ্যতা’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়’ সব মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কার্যক্রমে কতটা হস্তক্ষেপ করবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভরশীল। বিগত সরকারের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের নামে তাঁর কার্যালয়ের অধস্তন সচিব, অতিরিক্ত সচিবরাও মন্ত্রী বা সচিবের ওপর ছড়ি ঘোরাতেন। মন্ত্রী-সচিবদের এক রকম অসহায় অবস্থায় সিদ্ধান্তের আশায় বসে থাকতে দেখা যেত। নতুন সরকারে ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়’ নিজের হাতে থাকা মন্ত্রণালয়গুলো ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে– এটা প্রত্যাশা। তবে মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত রিপোর্টিং কাঠামো চিন্তা করা যেতে পারে।

আবার প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সচিব বা অধস্তনদের অনীহা বা দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রশাসনিক যুক্তি, আইনি ব্যাখ্যা-অপব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কাজের আওতার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়। প্রশাসনের এসব অসহযোগিতা মোকাবিলায় মন্ত্রীদেরই হস্তক্ষেপ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্ব এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিপ্রায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।

নতুন সরকারের বড় সংস্কারের জায়গা হবে মন্ত্রণালয়ের শতভাগ কাজ ডিজিটালাইজ করা। পূর্বতন সরকারের সময় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ যতটা প্রচার পেয়েছে, প্রশাসনিক কাজকর্ম ছিল ততটাই ‘অ্যানালগ’। মন্ত্রণালয়গুলোর ডিজিটাল ফাইল লেনদেনে ‘ডি-নথি’ কাঠামো চালু হলেও সচিব থেকে অধস্তন– সবাই কাগজের ফাইলে স্বাক্ষর ও মন্তব্য দেওয়া পছন্দ করতেন। এ ধরনের ফাইল চালাচালির মধ্যে ঊর্ধ্বতন-অধস্তনরা নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে চান। আবার এর সঙ্গে নিয়মবহির্ভূত অন্যান্য বিষয়ও জড়িত থাকে, যা ডিজিটাল সিস্টেমে কম হয়। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ, এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করায়ও ডিজিটাল সিস্টেম কার্যকর হতে পারে। ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ পর্যাপ্ত নয় বলে সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব পর্যায়ে অনেকে অ্যানালগ ফাইল পদ্ধতি চালিয়ে যেতে চান। প্রধানমন্ত্রীর এ ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং সময় নির্দিষ্টভাবে প্রশাসনিক সব কাজ ডিজিটাল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ে ডিজিটাল সিস্টেম পুরো বাস্তবায়নে মন্ত্রীদেরই সামনে থেকে ভূমিকা রাখার প্রয়োজন পড়বে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নিজেদের ডিজিটাল লিটারেসিও বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে।

অর্থমন্ত্রীকে আর্থিক বিষয়-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর সামষ্টিক অর্থনীতি, আন্তঃমন্ত্রণালয়ভিত্তিক বাজেট প্রস্তুতি, রাজস্ব আয়, অর্থ সরবরাহ, বৈদেশিক ঋণ, ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের প্রয়োজন। দেখা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈদেশিক ঋণের নেগোসিয়েশনে দুর্বলতা, দেশে-বিদেশি পক্ষের হস্তক্ষেপ, অপ্রয়োজনীয় ঋণের জন্য দেনদরবার, রাজস্ব আদায়ে কর ফাঁকি, কর এড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে কম নজরদারি, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনের গুরুত্ব উপলব্ধিতে ব্যর্থতা ও উদ্যোগের অভাব, বিভিন্ন বেসরকারি খাতের ন্যায্য-অন্যায্য চাপ মোকাবিলা, বাজেট প্রণয়নে ব্যয় হ্রাস ও ব্যয় যৌক্তিকীকরণের মতো বিষয়ে সম্যক ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো দুর্বলতা রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় করণীয় বুঝে কাজ করা– বিশেষত বেসরকারি খাতের জন্য সংস্কার উদ্যোগ বিষয়ে উপলব্ধি ও কাজ গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে বাজারে পণ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রী সনাতনী উপায়ে আমদানি পণ্যের শুল্ক হ্রাস-বৃদ্ধি করে সমাধান চাইলে তা দুর্বলতা প্রকাশ করবে। বাজারে কিছু বড় ব্যবসায়ীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো মানসিক ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা না থাকলে মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল রাখা কঠিন। সাপ্লাই চেইন ডিজিটাল করে পণ্যভিত্তিক বাজার নজরদারির মতো বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আগ্রহ কম। একইভাবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল রাখার চাপেও থাকে। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এসব চাপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেখানোই বাণিজ্যমন্ত্রীর যোগ্যতা। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার করণীয় বিষয়েও সম্যক জ্ঞান ও উদ্যোগ প্রয়োজন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনহীন প্রকল্প অনুমোদনে এক শ্রেণির কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, উন্নয়ন সহযোগী, কমিশন এজেন্টদের আগ্রহ অনেক বেশি। পরিকল্পনামন্ত্রীর দ্রুত প্রকল্প চয়ন, প্রণয়ন, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অনুধাবন এবং অনিয়ম হ্রাস করে দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণে দৃঢ়তা প্রয়োজন। প্রকল্প মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এনে মূল্যায়নভিত্তিক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণে মন্ত্রণালয়গুলোকে চাপ দিয়ে কাজ করানোর যোগ্যতাও প্রয়োজন। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আলোকে ঠিকাদার চক্র গড়ে ওঠে। এসব চক্র অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসব চক্র বিভিন্ন প্রকল্প বাগিয়ে নেয়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার শক্তি থাকা জরুরি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে আর্থিকভাবে পুনরুদ্ধারে বিশেষ কারিগরি বিষয়গুলো উপলব্ধি করা প্রয়োজন। বিগত সরকারের সময়ে এ মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা-ব্যবসায়ী-ঠিকাদার চক্র গড়ে উঠেছিল। এই চক্র ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর রাজনৈতিকভাবে দৃঢ়চিত্ত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো মনোবল, নতুন চক্রকে জেঁকে বসতে না দেওয়ার শক্তি থাকা চাই।
একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, নারী ও শিশু, শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসীকল্যাণ, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রভৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেসরকারি খাতের যেমন ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা প্রয়োজন, তেমনই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চনাও মোকাবিলা করা প্রয়োজন। এই দ্বিবিধ দায়িত্বশীলতা অনেক মন্ত্রীর মধ্যে দেখা যায় না। বরং বেসরকারি খাতের লেজুড়বৃত্তির প্রবণতা দেখা যায়। প্রশাসনকে লেজুড়বৃত্তি থেকে দূরে রেখে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষমতা মন্ত্রীদের থাকা চাই।

সর্বশেষ, অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রীরা কারিগরি বিষয় অনুধাবন না করে যদি চটজলদি সমাধান খোঁজেন, তবে অর্থনৈতিক বিষয়ের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হবে না। কাঠামোগত বিষয় বুঝে সে অনুযায়ী সুপারিশ এবং প্রশাসনকে দিয়ে স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়নের ক্ষমতাই হওয়া উচিত নতুন সরকারের মন্ত্রীদের যোগ্যতার মূল মাপকাঠি।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সিপিডি