Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যাণ্ডার্ড on 14 April 2026
রাজস্ব অনিশ্চয়তার মাঝেই কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধিতে জোর দিয়ে বড় বাজেটের পরিকল্পনা সরকারের

নব-নির্বাচিত বিএনপি সরকার তার প্রথম অর্থবছরের বাজেটে বড় আকারের সম্প্রসারণমূলক পরিকল্পনা নিচ্ছে। জনপ্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকান্ডকে গতিশীল করা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরানোই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৯.৩০ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে সরকার; যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৫% বেশি। যার মধ্যে ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে অর্থবিভাগ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা প্রাক্কলিত বাজেট নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
এই প্রস্তাব অনুমোদিত হলে রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চলতি বছরের তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে, যা অর্থনীতিবিদদের মতে বিদ্যমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে রয়েছে। অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহে এনবিআরকে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতি কমানো, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়ানো এবং আমদানি পণ্যের ট্যারিফ রেটকে বাজারভিত্তিক করার মতো এমন কিছু সিদ্ধান্ত এনবিআরকে নিতে হবে।
গবেষণা সংস্থা-সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বলেন, সাধারণত বাজেটের আকার বছরে ১২% থেকে ১৫% বাড়ে। কিন্তু সরকার একাধিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ২৫% এর বেশি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যা রাজস্ব আহরণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত করবে।
তিনি বলেন, “প্রাক্কলিত বাজেটের মূল সমস্যা হচ্ছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং দরকারি তহবিল কীভাবে সংগ্রহ হবে। এই বিপুল অর্থের জোগান কীভাবে আসবে—সেটি বড় প্রশ্ন।”
তার মতে, বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে এনবিআরের পক্ষে এমন লক্ষ্য অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়; সরকারের বরং উচিৎ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিয়ে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা।

বাজেটে অগ্রাধিকার
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭.৯০ লাখ কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটে এটি কমিয়ে ৭.৮৮ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ২.৫০ হাজার কোটি টাকা।
গত শুক্রবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় উপস্থাপন করা প্রাক্কলিত বাজেট নথি অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে নির্বাচনী ইশতিহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড-এর মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরি ও দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ধারায় নিয়ে যাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিখাতে সহায়তা বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, আর্থিকখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ডি-রেগুলেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করাও অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এজন্য চলচ্চিত্র, সঙ্গীত শিল্প, স্পোর্টস ও গ্রামীণ সংস্কৃতি বিকাশে বাজেটে বাড়তি গুরুত্ব থাকছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্রীড়া ও সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি অ্যাথলেটদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া শুরু করেছে বিএনপি সরকার।
ঘাটতি অর্থায়ন
নতুন অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরকে ৬.০৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা দিতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়, যা জিডিপির ৯.২১ শতাংশ, যদিও বর্তমানে কর-জিডিপির অনুপাত কমে ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিম্নমুখী প্রবণতায় রয়েছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, করের আওতা বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেবে সরকার।
এছাড়া, এনবিআরের বাইরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে এখাত থেকে ৫,৭৮৬ কোটি টাকা আদায় হলেও আগামী বছর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫,০০০ কোটি টাকা।
এত বড় বাজেট করতে গিয়ে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২.৩৫ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। অথচ চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার আগের অর্থবছরের তুলনায় কম হলেও বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে জিডিপির ৩.৪ শতাংশ, যা আগামী বাজেটের প্রাক্কলিত ঘাটতির তুলনায় বেশি।
এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে দেশীয় চড়া সুদের ঋণের বদলে—কম সুদের বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকবে বিএনপি সরকার। কারণ, প্রতিবছর বাজেট থেকে সুদ পরিশোধ বাবদ যে অর্থ ব্যয় হয়, তার বড় অংশই যায় স্থানীয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধে ১.২৭ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২,৫০০ কোটি টাকা।
তবে দেশে জ্বালানির দাম বাড়লে বা মূল্যস্ফীতি কমে না আসলে, এবং আর্থিকখাতে তারল্য ফিরে আসতে বিলম্ব হলে—অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নিরাপদ, তবুও নির্বাচনী ইশতিহারে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে আসার কথা স্মরণ রেখে ঘাটতির অংক ছোট করা হচ্ছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ সম্ভব না হলে পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যয় করতে গিয়ে বাড়তি ঋণ নিতে হতে পারে সরকারকে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ বর্তমান সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে বলে আশা করছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
আগামী অর্থবছর সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপির ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার আশা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার ১ টাকা বিনিয়োগ করলে বেসরকারিখাত এর কয়েকগুণ বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। ফলে বেসরকারিখাতে জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার বেড়ে ২৪.৯ শতাংশে উন্নীত হবে।
ভর্তুকির চাপ বাড়ছে
এদিকে বাজেটের আকার বড় হলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকি বরাদ্দ পুরোপুরি প্রাক্কলন করা হয়নি। আগামী অর্থবছর বিদ্যুৎখাতে ৩৭,০০০ কোটি টাকা, এলএনজিতে ৬,৫০০ কোটি টাকা, সারে ২৭,০০০ কোটি টাকা ও খাদ্য সহায়তায় ৯,৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দসহ মোট ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এখাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা।
ইরান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে অতিরিক্ত ৩৬,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের প্রাক্কলিত নথিতে সতর্ক করা হয়েছে, এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি আরও বাড়তে পারে।
বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি—যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড—বাস্তবায়নেও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে মাসে ২,৫০০ টাকা করে দেওয়া শুরু হয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ৯,৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এখাতে ৯,৬৬৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যা সংশোধিত বাজেটে বাড়িয়ে ১০,২১৪ কোটিতে উন্নীত করা হয়েছে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষিখাতে প্রণোদনা, রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনায় বরাদ্দের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকায় এখাতে প্রণোদনায় বরাদ্দ ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৭,০০০ কোটিতে উন্নীত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ২০,৬০৮ কোটি টাকা করা হয়েছে; যা সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। এতে এই খাত ১৫তম অবস্থান থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে।
আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকছে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। এরপরের অবস্থান বিদ্যুৎ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায়।


