রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমাতে প্রয়োজন সামগ্রিক সংস্কার পরিকল্পনা: মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in FNS24 on 11 October 2026

আয়হীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে

আয়হীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। লোকসানী ও আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ওসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রতি বছরই সরকারের বিপুল অর্থ খরচ হচ্ছে। আর সমপ্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ায় সরকারের ওপর আরো বাড়বে ব্যয়ের চাপ। রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠানেই উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। তাতে রাষ্ট্রের বাজেটের ওপর বাড়ছে চাপ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টিরই নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। আর বাকি ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের মাত্র ২ হাজার ৫২ কোটি টাকা সম্মিলিত আয় ছিলো। বর্তমানে দেশে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৩০টি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ওসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাবদ ৮৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার বা পুনর্গঠনের পরিবর্তে একই কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে বছরের পর বছর। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোয় ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৮৭ জন কর্মচারী কর্মরত। অর্থ বিভাগের একাধিক প্রতিবেদনে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন খাতে অনুদান পাওয়া ১৭৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৮টিরই নিজস্ব কোনো আয় ছিল না। তাছাড়া ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অতি উচ্চ ঋণ ঝুঁকিতে রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। ওসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। তাছাড়া ২৪টি প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে অতি উচ্চ ঋণ ঝুঁকি ও আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত মোট ৩১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ২৭ হাজার জনবল কর্মরত।

সূত্র জানায়, অতি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ১৯টি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় ২ লাখ ২২ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। ওই তালিকায় রয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড, ইস্টার্ন টিউবস লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড, মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড, জয়পুরহাট সুগার মিলস লিমিটেড, খুলনা ওয়াসা, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড, মোবারকগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, নাটোর সুগার মিলস লিমিটেড, পাবনা সুগার মিলস লিমিটেড, রাজশাহী সুগার মিলস লিমিটেড, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস লিমিটেড, জিল বাংলা সুগার মিলস লিমিটেড ও টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। তাছাড়া ১৯৯৬ সালে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির উদ্দেশ্যে সরকারি মালিকানাধীন ঢাকা লেদার কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কাঁচামাল সংকটে চালুর মাত্র ৬ দিন পরই বন্ধ হয়ে যায় কারখানার উৎপাদন। আর ১৯৯৮ সাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ ঢাকা লেদারের কার্যক্রম। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এখনো সরকারি অর্থে পরিশোধ করা হচ্ছে। তাছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের টেলিকম খাতে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। গ্রাহক সংখ্যা ও আয়ের দিক দিয়ে সবার পেছনে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। প্রতিষ্ঠানটি অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকায় রয়েছে। কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডেরও একই চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ। কারখানাটি সংস্কারে গত এক দশকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কোম্পানিটি এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। এ ধরনের আরো অনেক অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও করপোরেশনের পরিচালন কার্যক্রম থেকে কোনো আয় নেই। বরং ওসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রতি বছর সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আর সরকার নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করায় বেতন-ভাতা খাতে দ্বিগুণ হবে ওসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয়।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত ২৪টি অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়ও রয়েছে ১২টি প্রতিষ্ঠান। আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড, ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, গাজী ওয়্যারস লিমিটেড, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ, রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড, সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস লিমিটেড, ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। ওসব প্রতিষ্ঠানের নিট আয়, পরিচালন মুনাফা ও পরিচালন নগদ প্রবাহে নেতিবাচক ধারা বিদ্যমান। ফলে ওসব প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি, অনুদান অথবা ঋণের ওপর। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয়ে ৩৯টি হাই-টেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ করেছে। কিন্তু ওসব পার্ক থেকে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি আসেনি। তাতে প্রকট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আর্থিক দুরবস্থাও। আর্থিকভাবে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান করেছে ১১৮ কোটি টাকা।

এদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতিতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সাশ্রয়ী হতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য কার্যকর সংস্কার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কারণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের কাঠামোগত ও আর্থিক ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতের বেশকিছু বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক লোকসান গুনছে। ওসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতি বছরই জাতীয় বাজেট থেকে সরকারকে ভর্তুকি, অনুদান বা ঋণের মাধ্যমে বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। যা সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নেয়া ঋণের বিপরীতে সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি প্রদান করে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা সরাসরি সরকারের ঘাড়ে চাপে। যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বড় ঝুঁকি। বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অ-আর্থিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত লোকসান দাঁড়ায় ৪৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ভর্তুকি, উন্নয়ন সহায়তাসহ ওসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের মোট নিট আর্থিক সহায়তা বেড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের পাশাপাশি নেগুলোকে সচল রাখতে সরকারের ওপর তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের আর্থিক দায়।

অন্যদিকে লোকসান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানান, বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আর্থিকভাবে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ লোকসানে থাকার কারণ। বিগত সরকার সেগুলোতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা করলেও সেগুলো বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। এখন পর্যন্ত যশোর, চট্টগ্রাম ও নাটোরের ৩টি পার্ক ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়নি। বিদ্যমান পার্ক ও যেগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে, সেগুলোতে কীভাবে বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ও বাস্তবসম্মত করা যায় ওই চেষ্টা করা হচ্ছে। সেগুলোই মূলত আর্থিকভাবে লোকসানে থাকার কারণ।

এ প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান কৌশলগত কারণে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন। তার বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেগুলো ছেড়ে দেয়া বা বন্ধ করে দেয়া যেতে পারে। কারণ সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়। তবে ওই ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা কেবল প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত সিদ্ধান্তে মাধ্যমে সম্ভব নয়। সেজন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখলে প্রতি বছর বেতন-ভাতা, অবসরকালীন সুবিধাসহ নানা ধরনের ব্যয় বহন করতে হয়। তাতে সরকারের বাজেটের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। অথচ ওসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ অকার্যকর ও লোকসানি। বিশ্বের অনেক দেশই কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই ধরনের সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা পুনর্গঠন করতে পেরেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অনেক প্রতিষ্ঠানই সরকারের জন্য আর্থিক রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেগুলো নিয়ে সামগ্রিকভাবে সংস্কার পরিকল্পনা করা জরুরি। সেক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়া যেতে পারে, কোনোটি সরকারি মালিকানায় রেখে ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে দেয়া যেতে পারে, আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড করা যেতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল জমি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে, সেগুলো কীভাবে আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় তা বিবেচনা করতে হবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.