Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড on 22 May 2026
ঘাটতি, ঋণ আর করের চাপে নতুন বাজেট
নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বড় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তবে বাজেটে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অর্থের জোগান, বাড়তে থাকা ঋণের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। চলতি অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি বাজেট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে তরুণ উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরে সরকারের সম্ভাব্য আয় ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপরই নির্ভর করতে হবে সরকারকে।
বৈঠকে আগামী এক বছরে সরকারের আয়-ব্যয়, কর কাঠামো, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, ঘাটতি বাজেট, মূল্যস্ফীতি, নবম পে-স্কেল, বিনিয়োগ, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, খাল কাটা কর্মসূচি এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা ধরা হচ্ছে। এটি চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেট থেকে ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। আর সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি এক আলোচনাসভায় বলেন, দীর্ঘ সময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অস্থিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের প্রতিফলন থাকবে আগামী বাজেটে। তার ভাষ্যমতে, ‘বাজেট বড় দরকার, কিন্তু অর্থের সংকটও বাস্তবতা। হিসাব মেলানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’
জানতে চাইলে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘সরকারের পরিচালনা ব্যয় অনেকাংশই বেড়ে গেছে। সামনে সরকারি চাকরি-জীবিদের বেতন বাড়ছে, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী জনগণকে আর্থিক সুবিধা প্রদানে কৃষি কার্ড, ফ্যামেলি কার্ডের মতো বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রয়োজন হবে। এই মুহূর্তে বাস্তবতা হচ্ছে—সরকারের বাজেট বড় না হলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়বে। তখন অর্থনীতি আরো বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সব দিক বিবেচনায় এই মুহূর্তে বড় বাজেটের বিকল্প নেই।’
জানতে চাইলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘বাজেট এমন হওয়া প্রয়োজন, যা একদিকে অর্থনীতির বর্তমান চাপ মোকাবিলা করবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। আর্থসামাজিক যে চাহিদা সেটির তুলনা করলে বাজেট বাড়াতে হবে। যদি পাবলিক এক্সপেন্ডেচার (সরকারি উন্নয়ন ও পরিচালনা ব্যয়) বাড়াতে হয় তাহলে বাজেট বাড়াতে হবে। তবে কথা হচ্ছে, বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতা কেমন সেটি দেখতে হবে। সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে কি না, প্রকল্পে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে নাকি সাশ্রয়ী হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু বাজেট প্রণয়ন করলেই হবে না, বরং ব্যয়ের দক্ষতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার মধ্যে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি কমানোর কার্যকর উদ্যোগ থাকা জরুরি। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিদেশি ঋণ পরিশোধে নতুন চাপ :বাজেটের বড় চাপগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)’র তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সরকারকে প্রায় ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। এর মধ্যে আসল বাবদ ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ প্রায় ১২৫ কোটি ডলার গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের জানায়, এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা হবে দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধের রেকর্ড।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়া এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আগামী বছরগুলোতে এ চাপ আরো বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরো জানায়, বিদ্যুত্, জ্বালানি, রেল, সেতু ও যোগাযোগ খাতে নেওয়া বড় বড় ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন ও ভারতের কাছ থেকে নেওয়া তুলনামূলক কঠিন শর্তের ঋণগুলো এখন বাড়তি চাপ তৈরি করছে। গত ৯ মাসে শুধু রাশিয়াকেই প্রায় ৮৩ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংককে সাড়ে ৭৬ কোটি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংককে ৬১ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করতে গিয়ে সরকারকে নতুন ঋণের দিকেও যেতে হচ্ছে। এতে রিজার্ভ, ব্যাংক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
বাড়ছে করের চাপ, শঙ্কায় সাধারণ মানুষ : রাজস্ব বাড়াতে আগামী বাজেটে কর কাঠামোয় কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য করমুক্ত আয়সীমা কিছুটা বাড়ানোর আলোচনা থাকলেও একই সঙ্গে নতুন কিছু খাতে কর আরোপের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষ করে নিত্যপণ্যের ওপর উেস কর বাড়ানোর প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উেস কর দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার চিন্তা চলছে। এটি কার্যকর হলে ধান, চাল, আটা, গম, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, আলু, পেঁয়াজ ও রসুনসহ প্রায় ২৮ ধরনের কৃষিপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানীর রামপুরা বাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী সুজন হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এমনিতেই বাজার সামলানো কঠিন। এর মধ্যে নতুন কর বাড়লে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরো বাড়বে।’
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম হওয়ায় সরকার রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে। তবে শুধু নিয়মিত করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
রেকর্ড উন্নয়ন বাজেট, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন :আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকারের মতে, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো না হলে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়বে না। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, প্রতি বছর বড় বাজেট ঘোষণা হলেও শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতার অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির দ্বৈত চাপ :বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। আগামী বাজেটে সেটি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকতে পারে। কিন্তু ডলারের উচ্চমূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে অস্থিরতার কারণে সাধারণ মানুষ এখনো স্বস্তি পাচ্ছেন না। চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংসসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দামই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুত্, এলএনজি, সার, ওএমএস ও ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি ব্যয় হতে পারে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকারকে একদিকে ভর্তুকি কমানোর চাপ, অন্যদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণ—দুই দিকই সামলাতে হবে।
থাকবে সংস্কারের চাপ :আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণ কর্মসূচির আওতায় সরকারকে রাজস্ব বৃদ্ধি, ভর্তুকি যৌক্তিক করা, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ও ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো নানা শর্ত বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে গত তিন বছরে দেশে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকায় উন্নয়ন ব্যয় ও ঋণ পরিশোধে সরকারের চাপ বাড়ছে।


