Tuesday, March 17, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Khondaker Golam Moazzem

‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ছাড়াই সংবিধান সংশোধন সম্ভব – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও রুকাইয়া ইসলাম

Originally posted in সমকাল on 16 March 2026

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সবাই ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ সদস্যরূপে শপথ নিয়েছেন শুধু জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি ও স্বতন্ত্র সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি এ-সংক্রান্ত আদেশকে ‘অসাংবিধানিকʼ আখ্যা দিয়ে।

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গৃহীত ১৩৩টি আদেশ ও অধ্যাদেশ উপস্থাপিত হয়েছে, সংসদের বিবেচনার জন্য। এর মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) আদেশটিও রয়েছে। এ আদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অনুচ্ছেদ হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা। এসব অধ্যাদেশ ও আদেশ ৩০ দিনের মধ্যে (কর্মদিবস) বিল আকারে উত্থাপন ও সংসদের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নতুবা এ আদেশ বা অধ্যাদেশগুলো আপনাআপনি বাতিল হয়ে যাবে। তবে এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো পুনরায় বিল আকারে উত্থাপন করে সংসদে উত্থাপনের সুযোগ থাকবে।

জুলাই জাতীয় সংসদ (সংবিধান সংশোধন) আদেশের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে– ক. সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি এ ধরনের আদেশ (অধ্যাদেশ) জারি করতে পারেন কিনা? খ. এ আদেশের সকল অনুচ্ছেদ সংবিধানসম্মত কিনা বা কোনো অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক কিনা? গ. যদি কোনো অনুচ্ছেদ অসাংবিধানিক থাকে, তা সংশোধন না করে এ আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সুযোগ আছে কিনা? ঘ. যদি আদেশটি সংশোধন করার যৌক্তিকতা থাকে, তবে অসংশোধিত আদেশের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের যৌক্তিক ভিত্তি থাকে কিনা? এবং ঙ. সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলো প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোতে সংশোধন সম্ভব ছিল কিনা?

সংবিধানের ৯৩ ধারা অনুসারে পার্লামেন্ট কার্যকর না থাকলে বা পার্লামেন্টে অধিবেশন না চললে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা রাখেন। তবে সেসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে কোনোক্রমেই বর্তমান সংবিধানের ব্যত্যয় হতে পারবে না; কোনোভাবেই সংবিধানের কোনো ধারা পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারবে না; বা আগে গৃহীত কোনো অধ্যাদেশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য হতে পারবে না। এতে দুটো জিনিস পরিষ্কার– ক. রাষ্ট্রপতির পক্ষে অধ্যাদেশ ছাড়া অন্য কিছু জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সেই বিচারে আদেশ জারির বিষয়টি অসাংবিধানিক। খ. সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত কোনো বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রাপতির অধ্যাদেশ জারি অসাংবিধানিক হবার অর্থ দাঁড়ায়– রাষ্ট্রপতি অন্য কোনো উপায়েও তা জারি করতে পারেন না। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে জুলাই সনদ (সংবিধান সংশোধন) আদেশের যে বিভিন্ন অনুচ্ছেদ সম্পর্কে অসাংবিধানিকতার অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগই নেই।

সমকালে এর আগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) আদেশের সংবিধান সংস্কার পরিষদ সম্পর্কিত বেশ কিছু অনুচ্ছেদ কেন ‘অসাংবিধানিকʼ– ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম। এর মধ্যে রয়েছে– ১০(৩) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত সিদ্ধান্ত’ সংবিধানের ১৪২ ধারা অনুসারে সংবিধান সম্পর্কিত বিল পাসের ক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রযোজনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আদেশের ১৪ অনুচ্ছেদ ‘এ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত সংবিধান সংস্কারকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা এবং উক্ত রূপ সংস্কার বিষয়ে অন্য কোনোভাবে অনুমোদন বা সম্মতির প্রয়োজন পড়বে না’ বলাও অসাংবিধানিক। এ ছাড়া আদেশের সংবিধান সংস্কার পরিষদ পরিচালনা সম্পর্কিত অনুচ্ছেদে জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ পরিচালনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সম্মতিতে নির্বাচিত ‘সভাপ্রধান’ বা ‘উপ-সভাপ্রধান’ বিষয়টিও অসাংবিধানিক। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এ পরিষদের আওতাভুক্ত হওয়ার কথা নয়, যা কেবল মূল জাতীয় সংসদের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে পূর্ণ বেঞ্চে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে হওয়া উচিত।

এমনকি ‘সভাপ্রধান’ হিসেবে ‘স্পিকার’কে বা ‘উপ-সভাপ্রধান’ হিসেবে ‘ডেপুটি স্পিকারকে’ নির্বাচিত করে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও মূল সংসদের অধিবেশনে সংবিধান সম্পর্কিত বিল উত্থাপন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এ ছাড়া অনুচ্ছেদ ৭ অনুসারে ‘পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার করবে এবং তা সম্পন্ন করার পর পরিষদের কার্যক্রম সম্পন্ন’ করা সময় বেঁধে দেওয়ার বিষয়টিও সংসদীয় রেওয়াজে নেই। প্রচলিত সংবিধান অনুসারে যে কোনো বিল সংসদে উত্থাপনের পর তা ফ্লোরে আলাপ-আলোচনার পর প্রয়োজনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতামতের জন্য প্রেরণ করা এবং সেখানে আলোচনার পর তা সংসদে উত্থাপিত হয় অনুমোদনের জন্য। এ প্রক্রিয়ায় সংসদে একটি বিল আইনে রূপান্তরিত হতে অনেক সময় প্রয়োজন। এর বিপরীতে সংস্কার আদেশ এবং গণভোটের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে বিপুল সংখ্যক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে, যা সময়সাপেক্ষ।

এ ছাড়া এ আদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংবলিত অনেক বিষয় রয়েছে। বিশেষত বিএনপির উচ্চকক্ষ সম্পর্কিত একাধিক বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। গণভোটে সন্নিবেশিত ‘পিআর’ পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার শুরুতে সময় অতিবাহিত হবে তার কার্যপ্রণালি নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে। অনুচ্ছেদ ৭(৩) অনুসারে কার্যপ্রণালি নির্ধারণের দায়িত্ব সংস্কার পরিষদের। তবে সংবিধান সংস্কার আদেশের সংশোধন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যপ্রণালি বিধি নির্ধারণ এবং সেই বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদীয় কার্যক্রম-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা করা সময়সাপেক্ষ। সুতরাং ১৮০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া অসাংবিধানিক। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৮ অনুসারে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ তপশিল-২ অনুযায়ী পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের বিষয়াদিও অসাংবিধানিক।

এত দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও জুলাই সনদ (সংবিধান সংশোধন) আদেশকে গণভোটে অন্তর্ভুক্ত করা সঠিক হয়নি। গণভোটের বিভিন্ন দুর্বলতা নিয়ে ৩ ফেব্রুয়ারির নিবন্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ ও চাপিয়ে দেওয়া হিসেবে ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। একই সঙ্গে মাত্র একটি প্রশ্নের মাধ্যমে ১২২টি বিষয় বা প্রশ্নের জন্য জনগণের কাছে হ্যাঁ বা না ভোটের জবাব চাওয়া মোটেও গণভোটের ফলাফলকে যৌক্তিকতা দেয় না। এর ফলে গণভোটের প্রাপ্ত ফলাফলে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলেও এর ভিত্তি খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপে জুলাই সনদের ‘আইনি ভিত্তি’ দিতে গিয়ে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি লেজেগোবরে করে ফেলেছে।

প্রশ্ন হলো, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়াও কি প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোতে জুলাই সনদের আলোকে সংস্কার সম্ভব ছিল না? উত্তর– হ্যাঁ, সম্ভব ছিলো এবং এখনও আছে। প্রচলিত সংবিধানের আলোকেই বর্তমান সংসদ জুলাই সনদে গৃহীত বিষয়গুলো বিল আকারে উত্থাপন করে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে আইনে পরিণত করতে পারে। এসব বিল সরকারি বিল হিসেবে উত্থাপনের পাশাপাশি বেসরকারি বিল আকারে উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। জুলাই সনদের সংবিধান সংশোধনের কোনো বিল সরকারি দল উত্থাপন না করলে বেসরকারি বিল হিসেবে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদে উত্থাপন করতে পারেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংবিধান সংস্কার কমিটির এসব দুর্বলতা না জানার কথা নয়। এমনকি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনাতেও এর পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছিল। এসব জানার পরও জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ জারি এবং সেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ সন্নিবেশিত করার ক্ষেত্রে অন্য কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা থাকতে পারে, যা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার জন্য ইতিবাচক নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংশোধন) আদেশ’ সংবিধানসম্মত নয়। তবে আগামী দিনে জুলাই সনদের আলোকে সাংবিধানিক কাঠামোতে সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো বিল আকারে উত্থাপন এবং তা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পর্যালোচনার পর সংসদে উত্থাপিত হতে পারে। এভাবে সংসদের মেয়াদজুড়েই এসব বিষয় বিল আকারে ধারাবাহিকভাবে উত্থাপনের সুযোগ আছে। এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও রুকাইয়া ইসলাম: লেখকদ্বয় সিপিডি পার্লামেন্টারি স্টাডিজে কর্মরত

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.