Monday, April 6, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Khondaker Golam Moazzem

সব বাড়তি ব্যয় ভর্তুকি বা লোকসান নয় – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

জ্বালানি পরিস্থিতি: অভিমত

Originally posted in প্রথম আলো on 3 April 2026

বৈশ্বিক অস্থিরতায় দেশের জ্বালানি খাতে সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। এ সংকট মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের অভিমত।

সরকারের বাড়তি ব্যয়, ভর্তুকির চাপ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি—এ তিনটি বিষয় এখন আলোচনায়। তবে এ আলোচনায় একটি মৌলিক বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। সেটি হলো সব বাড়তি ব্যয়ই লোকসান বা ভর্তুকি নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটি আগের মুনাফা বা কাঠামোগত ত্রুটির ফল, যা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রথমেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রসঙ্গটি বিবেচনা করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হচ্ছে, সেটিকে অনেকেই লোকসান বা ভর্তুকি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি তা নয়। বিপিসি গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করেছে। গত অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তাই বর্তমান ঘাটতি বিপিসির জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো বোঝা নয়। প্রতিষ্ঠানটির অতীত মুনাফা থেকেই এ ব্যয় বহন করার সক্ষমতা রয়েছে। এটি বিপিসির উপার্জিত অর্থ, যা মূলত ভোক্তাদের কাছ থেকেই আগে সংগ্রহ করা হয়েছে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর ত্রুটির কারণে ভোক্তাদের প্রায় ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি মূল্য দিতে হয়েছে, যা বিপিসির মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

একই ধরনের চিত্র দেখা যায় আরপিজিসিএলসহ (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড) অন্যান্য জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। যদিও তাদের মুনাফা তুলনামূলক কম, তবুও তারা পুরোপুরি লোকসানে নেই। ফলে জ্বালানি খাতে সব ব্যয়কে সরাসরি ভর্তুকি হিসেবে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। তবে এই সংকট আজকের নয়, এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। গত কয়েক বছর ধরে বিদ্যুৎ খাত ধারাবাহিকভাবে লোকসানে রয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ, উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের কারণে এই খাতের আর্থিক চাপ বেড়েছে। তবে ভর্তুকি কমানো মানেই জ্বালানির দাম বাড়ানো নয়। বরং মূল্য নির্ধারণ কাঠামো সংশোধন করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। সঠিক মূল্য নির্ধারণ করা গেলে ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ না দিয়েও অনেক অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডলার–সংকট। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া হলেও তা সরাসরি জ্বালানি আমদানি বাড়াতে সাহায্য করবে না। কারণ, ভোক্তা টাকা দেন, ডলার দেন না। জ্বালানি আমদানি করতে হলে ডলার প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প তৈরি করা। যেমন কৃষি সেচে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তিনির্ভর সেচব্যবস্থা চালু করা গেলে বছরে বিপুল পরিমাণ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। একইভাবে পরিবহন খাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র দ্রুত অনুসন্ধান ও উৎপাদনে আনা গেলে এলএনজির ওপর চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বর্তমান পরিস্থিতি একটি বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের অংশ। ফলে পুরো অর্থনীতিতেই এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন—সবখানেই। এই বাস্তবতায় সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথে হাঁটা। জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে শুধু ভর্তুকি বা মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না। সঠিক মূল্য নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.