Originally posted in বণিকবার্তা on 8 April 2026

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো এবং অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত ‘অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জেনেভায় জাতিসংঘ দপ্তরগুলোতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, নির্বাচন, নতুন সরকার, সামষ্টিক অর্থনীতিসহ বিভিন্ন সমসাময়িক ইস্যুতে কথা বলেছেন বণিক বার্তার অন্তর্দৃষ্টিতে
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ দেড় বছর সময় পার করল, একটা নির্বাচন হলো। একই সময়ে আমাদের আশপাশের দুটো দেশ শ্রীলংকা ও নেপালে দুটো অভ্যুত্থানের পর রেজিম চেঞ্জ হয় এবং নির্বাচনও হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে যদি তুলনা করেন, তাদের কী অর্জন? বাংলাদেশের কী অর্জন?
তিনটি দেশে প্রায় কাছাকাছি সময়ে অভ্যুত্থান হয়েছে। অবশ্যই এটা একটা নতুন ঘটনা সবার জন্যই। তরুণ সমাজ যদি মনে করে তারা প্রতারিত হয়েছে, তাহলে তারা কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়ায় এবং প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে সেটাই আমরা দেখছি। স্বাভাবিকভাবে তিনটি দেশের সূচনাবিন্দু ভিন্ন। যেসব বিষয় নিয়ে তারা আন্দোলন করেছেন, তার ব্যাপ্তিও ভিন্ন। যে প্রক্রিয়াতে করেছেন, সেটাতেও কিছু ভিন্নতা আছে। ফলাফলেও ভিন্নতা আছে। এ তিনটি দেশের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ব্যাপক পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাংলাদেশে ছিল। বাংলাদেশের এ পরিবর্তন শুধু অর্থনীতির না, শুধু সামাজিক না। সামগ্রিকভাবে রাজনীতি, সংসদ এবং এমনকি সংবিধান ইত্যাদি নিয়ে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা। যদি আপনি শ্রীলংকার দিকে তাকান, তাদেরও কাঠামোগত পরিবর্তন আছে, কিন্তু সেগুলো অনেকটাই খাতভিত্তিক পরিবর্তন, যতখানি না সামগ্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিবর্তন বা সংস্কারের বিষয়। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়াদি আমাদের তুলনায় শক্তিশালী। আর যদি আপনি নেপাল দেখেন, তাহলে নেপালের পুরোটা হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। তাদের প্রথাগত রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকে তারা সংশয়ের মুখে ফেলেছেন, প্রশ্নের মুখে দিয়েছেন। সেহেতু, ব্যাপ্তির দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশ সর্বাপেক্ষা বড়, তারপর শ্রীলংকা, তারপর নেপাল। ফলাফলগুলো ভিন্ন রকমের এসেছে।
শ্রীলংকায় দেখবেন, প্রথাগত রাজনীতিরই একটি ভিন্নধারার দল, যারা মূলধারায় ছিল না তারা এসে প্রথমবার সেই দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের মধ্যে বাম চিন্তা যেমন আছে, তেমনি উদারনৈতিক চিন্তাও আছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে খাতভিত্তিক সংস্কারের পরিকল্পনা করেছে। বিশেষ করে শিক্ষা খাত বড় ধরনের পরিবর্তনে গেছে, যা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে হয়েছে।
নেপালে একটি সদ্যগঠিত দল, ব্যতিক্রমধর্মী নেতৃত্ব এবং তরুণ সমাজের মাধ্যমে নির্বাচনে বড় বিজয় অর্জন করেছে, প্রথাগত রাজনীতিবিদদের পরাজিত করে।
আর বাংলাদেশে যে অভ্যুত্থানটি হয়েছিল, সেখানে তরুণ সমাজের প্রতিনিধিত্ব সংসদে এসেছে, কিন্তু তারা নিয়ামক ভূমিকায় আসতে পারেনি। এর একটি বড় কারণ আদর্শগত ঐকমত্যের অভাব এবং সামগ্রিক রূপকল্প বা ভিশনের অভাব। শুধু তরুণ হওয়াই রাজনীতি করার জন্য যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে প্রথাগত দুটি দলের একটি দায়িত্ব পেয়েছে। কিন্তু তাদেরও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সংবেদনশীল থাকতে হয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ এবং আচরণের মধ্যে যাচ্ছে, যাতে করে আগের অভ্যুত্থানের চেতনা থেকে যেন দূরে না যেতে পারে। সংসদে জুলাই সনদ পাস নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সেখানেও তারা বারবার জুলাইয়ের চেতনার প্রতি তাদের নিবেদন ও প্রতিশ্রুতি আছে, সেগুলো থেকে তারা বের হচ্ছে না। সেহেতু তিন জায়গাতেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা রাজনীতিবিদদের ধারণ করতে হচ্ছে।
আপনি বলছিলেন যে বাংলাদেশে প্রথাগত রাজনৈতিক দলই সংসদ নির্বাচন করে সরকার গঠন করেছে। কিন্তু এ প্রথাগত দল কি সেই জায়গায় কাজ করতে পারবে—যেখানে আপনারা বলেছিলেন লুণ্ঠন বন্ধ করা, ব্যাংকের টাকা চুরি বন্ধ করা?
প্রথাগত দলের কাজ করার ক্ষেত্রে যে শব্দটি আমার তরুণ ভাইয়েরা ব্যবহার করেন, পুরনো বন্দোবস্ত আর নতুন বন্দোবস্ত। তারা শেষ পর্যায়ে এসে পুরনো বন্দোবস্তেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তারা পুরনো বন্দোবস্তের কিছু পরিবর্তনের সূচনা করতে পেরেছেন। প্রথাগত দলগুলোকেও এ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আত্মস্থ করতে হয়েছে। কারণ আগের মতো করলে পরিণতি কী হতে পারে, দেশে থাকতে না পারা, দেশ ছেড়ে পালাতে হওয়া, এ উপলব্ধি এসেছে। নির্বাচনের আগে আমি যখন বিভিন্ন আঞ্চলিক সভা করেছি, দুটি বিষয় খুব বড় করে এসেছে। প্রথমত, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়াতে হবে। শুধু সংসদে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। দ্বিতীয়ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে জনগণ নির্দয়ভাবে তাদের পরিণতি নির্ধারণ করবে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনীতিবিদদের অনেক বেশি নমনীয় দেখেছি। নাগরিকদের পক্ষ থেকে আমরা কালো টাকার ব্যবহার সীমিত করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেই অর্থে বড়ভাবে পারিনি। ঋণখেলাপি, করখেলাপিদের বাদ দেয়ার চেষ্টা করেছি, সেটাও পুরোপুরি হয়নি। দ্বৈত নাগরিকত্বের, আমাদের দুঃখ এ বিষয়টিও কার্যকরভাবে হয়নি। সেহেতু কালো টাকার প্রাদুর্ভাব যে একেবারে থাকবে না এটাও আমরা মনে করি না। সাম্প্রতিক ব্যাংক সংস্কারের ক্ষেত্রে যে পিছু হটার লক্ষণ দেখা যায়। সেখান থেকেও অনাদায়ী ঋণ আদায় করার ক্ষেত্রে, লুণ্ঠিত টাকাকে ফেরত আনার ক্ষেত্রে আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে একটি উপলব্ধি এসেছে। সেটা হলো নির্বাচনের পর জনগণ যদি প্রতিনিধিদের ছেড়ে দেয়, তাহলে আগের মতোই পরিস্থিতি হবে। তাই সদা জাগ্রত থাকতে হবে। প্রথমত, মিডিয়া। মিডিয়াকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হবে, মালিকানার বাইরে গিয়ে। কারণ মিডিয়াগুলোর মালিকানা একটা সমস্যাও বটে। দ্বিতীয়ত, নাগরিক সমাজ। নাগরিক সমাজ তাদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে বিশেষ করে দলীয় পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে, মূল্যবোধের পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে না, মূল্যবোধ থেকে কাজ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা শ্রেণীকে সরকারি আনুকূল্যের ওপর নির্ভর করে নয়, স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। একটা বিধিবদ্ধ নির্বাচিত সরকারকে সঠিক পথে রাখার জন্য এ তিনটি অংশীজন—মিডিয়া, নাগরিক সমাজ এবং উদ্যোক্তা শ্রেণীর ভূমিকা ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনারা প্রতিবেদনেও এবং আপনি নিজেও বলেছেন—বিগত সরকারের সময় দুটি প্রবণতা ছিল: মেগা প্রকল্প ও উচ্চ সরকারি ঋণ। অন্তর্বর্তী সরকার বলেছিল তারা এগুলো করবে না, কিন্তু পারেনি। আপনি কি মনে করেন, এখন এ ধরনের প্রকল্প নেয়া উচিত?
মেগা প্রকল্প নেয়ার মতো পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের ছিলই না। এ ধরনের প্রকল্প তৈরি করতে যে চিন্তা, ধারণা, কারিগরি প্রস্তুতি এবং অর্থায়ন লাগে, সেটা করার সুযোগই তাদের ছিল না। কিন্তু ঋণ তো তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়েছে। নিতে বাধ্য হয়েছে। নিয়েছে পরিকল্পনার অভাবের কারণে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অসুবিধার কারণে। একইভাবে যে ধরনের সংস্কার আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, সেই সংস্কারগুলো করতে না পারা এবং শেষ পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের কাছেই আত্মসমর্পণ করা। যার ফলে আমরা দেখেছি বিদেশী ঋণের পরিমাণও বেড়েছে, অভ্যন্তরীণ ঋণেরও পরিমাণ বেড়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ার ফলে ব্যক্তি খাতে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যাংকগুলো ব্যক্তি খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। সেহেতু ঋণের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের খুব বড় সাফল্য ছিল বলে আমি মনে করি না।
এখন আগামী দিনের কথা যদি বলেন, আপনি লক্ষ্য করে দেখেন, বিএনপি বলেছে তারা বড় প্রকল্প বা মেগা প্রকল্প করবে না। আবার একই সঙ্গে দ্বিতীয় পদ্মা ব্রিজ, আরেকটি ব্রহ্মপুত্র ব্যারাজ, পদ্মা ব্যারাজ, এ ধরনের বিষয়ও বলছে, যেগুলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। এগুলোকে প্রকল্পে রূপ দেয়া আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে কীভাবে হবে, সেটা আমার কাছে স্পষ্ট না। ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রেও এখন চাপ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে এখন জ্বালানির কারণে। এ আর্থিক, সামষ্টিক দুর্বলতা নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে, সেখানে আমার ভয় হয় মাঝে মধ্যে যে তারা এখনো পুরো বিপর্যয়টা সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা গ্রহণ করেনি। সরকার ক্ষমতায় এসে অর্থনীতিকে কী অবস্থায় পেয়েছে, তার কোনো মূল্যায়ন এখনো করেনি। আগামী দিনে উন্নয়নের যে বয়ান দাঁড় করাতে হবে, দেড় মাস হয়ে গেছে, আমি কোনো দালিলিক মূল্যায়ন দেখিনি। এতে আমি দুশ্চিন্তায় আছি। এ দালিলিক প্রমাণ না থাকার কারণে স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, এমনকি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ভিত্তিও পরিষ্কার হচ্ছে না। বর্তমান সরকারের একটি সমস্যা আমি এখানে দেখি। এটা না হওয়ার কারণে ওনারা যে এখন বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে আছে। যেমন কর নাই, আর্থিক সক্ষমতা বা ফিসক্যাল স্পেস সীমিত, জ্বালানিসহ বিশ্ববাজারের পরিস্থিতি, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি আমরা করেছি তার ফলাফলে, নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশে রয়েছে আইএমএফের প্রোগ্রাম। সবকিছু মিলিয়ে এটাকে আত্মস্থ করে একটি স্বল্পমেয়াদি বাস্তবধর্মী পরিকল্পনার ইঙ্গিতও আমি এখনো দেখিনি। তারা বেঞ্চমার্কিং করেনি, সূচনা বিন্দুগুলো স্পষ্ট করেনি। দ্বিতীয়ত, এ চাপগুলোকে সমন্বিতভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে এখনো আত্মস্থ করা হয়নি বলে আমার মনে হয়। তৃতীয়ত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সূচনা তারা করেছে, এটা দোষের কিছু না। কিন্তু এগুলোর অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ যেসব রয়েছে, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা কতটা স্পষ্ট, সেটা পরিষ্কার না। এ অবস্থায় সরকার আগামী দিনে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যদি অন্য কোনো বিকল্প পথে না চলে যায়, তাহলে চ্যালেঞ্জ থাকবে। তারা যেমন বলেছে যে টাকা ছাপাবে না, করভিত্তিক অর্থনীতি হবে, কর হবে প্রবৃদ্ধির অংশ হিসেবে আর প্রবৃদ্ধি আসবে বিনিয়োগের মাধ্যমে। তাদের ম্যানিফেস্টোতে ‘ফিসক্যাল সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ আর্থিক সামাজিক চুক্তি। এর ভিত্তি হলো আমি সরকারকে কর দেব, আর সরকার আমাকে সেবা দেবে। কিন্তু সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে যদি দুর্নীতি শুরু হয়, তাহলে ওই চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যাবে।
একটি উদাহরণ দিই—ধরুন, তারা প্রত্যেক স্কুলে ট্যাব দেয়ার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু যদি ট্যাব সরবরাহে দুর্নীতি হয় বা কোনো পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কোম্পানি সুবিধা পায়, তাহলে পুরো উদ্যোগ আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। এ আশঙ্কাগুলো রয়ে গেছে। আমি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর ও বাইরে থেকে যা দেখেছি, বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে আমি দুটি বিষয় দেখেছি—একটি হলো সমন্বয়ের অভাব। অনেক নতুন মন্ত্রী, অনেকের অভিজ্ঞতা কম।
দ্বিতীয়ত, তথ্য-উপাত্তের প্রতি শ্রদ্ধা। সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সংবেদনশীল হয়ে নিজেকে পরিবর্তন না করলে সমস্যা তৈরি হবে। কিছুদিন আগে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আমি বলেছি, একজন অর্থমন্ত্রীর চিন্তা করা উচিত শুধু আগামী বছরের বাজেট না, বরং তিনি শেষ বছরে বাজেটে কী রেখে যাবেন। উত্তরাধিকারই হওয়া উচিত তার মূল চিন্তা।
অর্থমন্ত্রী একটি কঠিন আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকবেন, আর এটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করবেন প্রধানমন্ত্রী ও অন্যরা। এ সমন্বয় না থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্রে সমস্যা তৈরি হবে। বিশেষ করে যেখানে নিজস্ব চিন্তার শক্তিশালী বিরোধী দল থাকে।
কর নিয়ে বলছিলেন। আমরা দেখি আফ্রিকার অনেক দেশও কর ব্যবস্থায় উন্নতি করেছে যেমন নাইজেরিয়া, ঘানা। বাংলাদেশে কেন করের ভিত্তি বাড়ানো যায় না?
এর একটি বড় কারণ হলো সরকারের আর্থসামাজিক ভিত্তি। সরকারের যদি গণতন্ত্র দুর্বল হয় এবং খারাপ রাজনীতিবিদ, খারাপ আমলা এবং খারাপ ব্যবসায়ী—এ তিনটি একসঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে একটি সংযোগ তৈরি হয় যেখানে বৈধ আয় কর কাঠামোর মধ্যে আসে না, আর অবৈধ আয় বাইরে পাচার হয়। অর্থাৎ সম্পদ আছে, আয় হচ্ছে, কিন্তু করের আওতায় আসছে না।
আমি অর্থমন্ত্রীকে বলেছি, যেখানে কর ছাড় দিয়েছেন সেখানেই অন্তত ৬ শতাংশ জাতীয় আয় ছাড় দিয়ে রেখেছেন। এছাড়া ভর্তুকিও ২ শতাংশের বেশি। এ ছাড়গুলো কি যৌক্তিক নাকি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে দেয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ছাড়গুলোর মধ্যে কৃষি, বিদ্যুৎ, শিল্প, রফতানিমুখী খাত সবই আছে। অনেক সময় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো কর কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলে এসব ছাড় নেয়। আরেকটি বিষয় ভর্তুকি। গরিবের টাকা দিয়ে ধনীদের ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে কিনা, সেটাও দেখতে হবে।
আমার মতে, করের হার কমিয়ে করের জাল বিস্তৃত করতে হবে এবং কর দেয়াকে সহজ করতে হবে, যাতে কর ফাঁকি দেয়া লাভজনক না হয়। তবে কর বিস্তৃত করতে হলে সরকারি সেবার মান ভালো হওয়া জরুরি। নাগরিক সেবা না পেলে করদাতারা উৎসাহিত হবে না। এখানেই ‘ফিসক্যাল সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সরকারের সঙ্গে নাগরিকের দেয়া-নেয়ার সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি নিরাপত্তা, গণপরিবহন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা এসব সামাজিক সেবা নিশ্চিত না করে, তবে কর ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে না। আমরা অনেক সময় করকে শুধু রাজস্ব হিসেবে দেখি, কিন্তু নাগরিকের স্বার্থের সঙ্গে এটা জড়িত। পাশাপাশি কালো টাকা সাদা করার মতো সুযোগগুলো চলতে থাকলে কর ব্যবস্থা কখনই মজবুত হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সিপিডি থেকে বলা হয়েছে যে আমাদের দারিদ্র্য বেড়ে গেছে এবং আমরা নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারিনি। সরকার যেভাবে শুরু করেছে, প্রায় ৩০ দিন হয়ে গেছে। নতুন বাজেটে বৈষম্য কমানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে গেলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়?
এখনো এক কোয়ার্টার বাকি আছে। এ কোয়ার্টারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী কয়েক মাস এ সরকার কীভাবে নিজেকে সংহত করে সামষ্টিক অর্থনীতি সামলায়, তার ওপরই পরবর্তী বাজেট অনেকখানি নির্ভর করবে। বিশেষ করে বাজেটের আগের শেষ তিন মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ সময় আয় ও ব্যয় দুই-ই বাড়ে এবং এবার জ্বালানিসহ বিদেশী চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজেট যদি গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক ধারায় হয়, তবে তা আগের মতোই থেকে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারও এ গতানুগতিক বাজেট থেকে বের হতে পারেনি। এ বাজেটের আসল ‘লিটমাস টেস্ট’ হবে কর আদায় ও ব্যবস্থাপনায়। নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দেয়া কর ছাড় কমানো এবং ভর্তুকি ঠিকমতো সমন্বয় করা হয়েছে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
নতুন কর আদায়ের ক্ষেত্রে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি সরকারের হাতে থাকা বহুজাতিক ও লাভজনক কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে ছাড়া। এটি বাস্তবায়িত হলে একদিকে সরকার অর্থ পাবে, অন্যদিকে পুঁজিবাজারও চাঙ্গা হবে। আরেকটি বিষয় হলো বন্ধ কলকারখানা। যেসব কারখানার বাস্তব কোনো সম্ভাবনা নেই, সেগুলো কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার কোনো অর্থ হয় না। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করার চেয়ে ‘এক্সিট পলিসি’ বা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া বেশি কার্যকর। যেমন আদমজী মিল বন্ধ হওয়ার পর সেখানে অনেক নতুন শিল্প গড়ে উঠেছে। তাই আমাদের ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’ বা সৃজনশীল ধ্বংসের ধারণাটি গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের বিদ্যুৎ খাতের মতো অনেক খাতে সরকার ক্রেতা, বেসরকারি বিক্রেতা। আবার অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন। এ অদক্ষতা ও ভর্তুকির চাপ থেকে সরকার কীভাবে বের হবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—প্রথমদিকে আমরা অনেক উৎসাহ নিয়ে যুক্ত হলেও পরে তা ধরে রাখা যায়নি। এর প্রধান কারণ ছিল আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা। অনেক সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের সুবিধাগুলো ছাড়তে চান না। এ বাধাগুলো মূলত ভেতর থেকেই আসে। অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত হওয়ায় তাদের রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। কিন্তু বর্তমান সরকার নির্বাচিত, আর এটাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। নাগরিকদের কাছে জবাবদিহিতার জন্য এসেছে। সেহেতু এ সংস্কারগুলো করতে হলে আমলাতান্ত্রিক বাধা দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করতে হবে। সংস্কারের চিন্তার কোনো অভাব নেই এবং কাঠামোও তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন, যার জন্য উচ্চতর কারিগরি ও প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন।
বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তো অনেক ক্ষেত্রে ফরেনসিক অডিটও হয়নি…
অনেক ক্ষেত্রেই কোনো অডিটই হয়নি; অভ্যন্তরীণ অডিট যেমন দুর্বল, বাইরের অডিটও তেমনি কার্যকর নয়। সংসদে বছরের পর বছর পুরনো অডিট রিপোর্ট পড়ে থাকে, যা ঠিকভাবে প্রকাশও হয় না। অনেক সময় অডিটকে বেছে বেছে স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়। আমি মনে করি, বর্তমান সরকারের যেহেতু এখন বড় কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেই, তাই সংস্কার করার এটাই উপযুক্ত সময়, যা দিয়ে নির্বিচারে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো তাদের সেই স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে মোকাবেলা করতে হবে। এ কারিগরি সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলকে তাদের রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে হবে। আমি ‘ইকোনমিক রিফর্ম কমিশন’ গঠনের মতো কিছু লিটমাস টেস্টের কথা বলেছি। আমি অপেক্ষা করছি, তারা কত দ্রুত এটা করে। কারণ কিছু সংস্কার আগের সময় থেকে বাকি আছে, কিছু নতুন প্রতিশ্রুতি আছে, সেই সঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতিও পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কার করতে হবে। মানুষকে সম্পৃক্ত করে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ছাড়া আমি আর কোনো কার্যকর পথ দেখি না।
বাংলাদেশকে আমরা আগে কোরিয়ার সঙ্গে তুলনা করতাম, ২০০০ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করতাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। নতুন সরকার এসেছে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আপনি কি মনে করেন, এ নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ এমন কোনো প্রজেকশন করতে পারবে? কী কী করতে হবে বাংলাদেশের এ উল্লম্ফনের জন্য?
দেখুন, আপনি যদি মনে করেন কোরিয়া, চীন, জাপান বা ভিয়েতনাম, এমনকি ভারতের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে। কিন্তু প্রত্যেকটা দেশ নিজের মতো করে এগিয়েছে। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কার সঙ্গে তুলনা করব তবে আমি বলব, আমার অতীতের সঙ্গে তুলনা করব। আমি কী কী ভুল করেছি, সেগুলো দেখব এবং সেই শিক্ষা নিয়ে এগোব।
জুলাই অভ্যুত্থান থেকেও অনেক শিক্ষা নেয়ার আছে। আপনি অনবরত তথাকথিত প্রবৃদ্ধির বয়ান দিয়ে যেতে পারবেন না, যদি মানুষের জীবনে দারিদ্র্য থেকে যায়, বৈষম্য বেড়ে যায় এবং সেই বৈষম্য প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। একইভাবে যদি সামাজিক সেবা না দেন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করেন, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির কোনো অর্থ থাকে না। এ উপলব্ধিটা বাংলাদেশ থেকে নিতে হবে।
এটার জন্য গণতন্ত্র দরকার, জবাবদিহিতা দরকার, মানুষের অংশগ্রহণ দরকার। মানুষের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছেন, সেটা রাখতে হবে। যদি সেই প্রতিশ্রুতি না রাখেন তাহলে নাগরিক সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে, মিডিয়াকে ভূমিকা রাখতে হবে এবং উদ্যোক্তা শ্রেণীকেও ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা শুধু সরকার নির্বাচন করে ছেড়ে দেব, এটা হতে পারে না। নাগরিক হিসেবে এগুলো আমরা এ ইতিহাস থেকে শিখেছি। প্রথম দিন থেকেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
আপনারা লক্ষ্য করবেন, আমরা প্রথম দিন থেকেই গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যে আছি। আমি প্রত্যাশা করি, সরকারেরও সেই উপলব্ধি হয়েছে। বাংলাদেশের অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে, যেন সেগুলো আবার না হয়। তরুণ নেতৃত্বের জন্য এটিই সুযোগ। যদি তারা ইতিহাসের দায়ভার না নিয়ে এবং ইতিহাসের অংশ না হয়ে শুধু নতুন সমাজ বিনির্মাণে যে আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছে তার অংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশ সামনে এগোবে। আমি সেই ভরসা রাখি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বণিক বার্তায় আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।


