Tuesday, March 3, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

কার্যকর প্রশাসনে রূপান্তর ও সংসদীয় নজরদারি জোরদারের তাগিদ – ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in খোলা কাগজ on 2 March 2026

কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাঁধা সুবিধাভোগী আমলারা

জনগণের স্বার্থ সুরক্ষা ও নাগরিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছে নতুন নির্বাচিত সরকার। নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। কর্মপরিকল্পনায় চাঁদাবাজি, দুর্নীতি দমন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ-জ্বালানি, কৃষি ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রথম ছয় মাসেই দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য সরকারের। তবে বাংলাদেশে সরকারি সেবা কার্যক্রমে গতি আনতে হলে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনার পাশাপাশি কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসন পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আগে আওয়ামী লীগ শাসনামলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দলীয় বিবেচনায় পূরণ করা হয়েছিল, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। একাধিক মহল দাবি করছে, অতীতে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শঘনিষ্ঠ বা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের একটি অংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

সরকার প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল শুরু করেছে এবং তা চলমান রয়েছে। চলতি সপ্তাহে একাধিক সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের বদলি ও দায়িত্ব পরিবর্তন হতে পারে বলে জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

গতকাল রোববার (১ মার্চ) দেশের পাঁচ জেলার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া সম্প্রতি তিনজন সচিবকে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাঁচ জেলা ডেপুটি কমিশনারকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সরকার ইতোমধ্যে কিছু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল, কয়েকজন সচিবকে বদলি এবং শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবুও একাধিক মন্ত্রণালয়ে সচিব পদ শূন্য থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণেও নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।

এদিকে প্রশাসনের ভেতরে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সচিবালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অতীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূর্বের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার পোস্ট মুছে ফেলেছেন এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মন্তব্য বা ছবি প্রকাশ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রশাসনিক কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয় ঘিরে আলোচনায় উঠে এসেছে, অতীতে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। এতে সহকর্মীদের একাংশের মধ্যে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক অবস্থান বদলের এই প্রবণতা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নীতিনিষ্ঠতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, যে কোনো সময় তারা রূপ পরিবর্তন করতে পারে। সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা ঘুরে ফিরে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে।

একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গোপনে সুবিধাভোগী এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা প্রশাসনের শীর্ষ পদ দখল করে দেশ পরিচালনা করেছেন। তারা অনেক সময় গোপনে কাজ করেন, যা প্রশাসন পুনর্গঠনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্মকর্তা অতীতে প্রকাশ্যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং নতুন সরকার গঠনের পর তারা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। সহকর্মীদের কাছেও তারা নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে তুলে ধরছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব কর্মকর্তার তালিকা তৈরি ও সংরক্ষণ জরুরি। দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ এবং অতীতের সুবিধাভোগীদের শনাক্তকরণ প্রয়োজন, যাতে প্রশাসন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের সেবায় আরও কার্যকর হতে পারে। তাদের মতে, প্রশাসনের মূল শক্তি তার নিরপেক্ষতা ও পেশাদারি। যদি কর্মকর্তারা রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে তা প্রশাসনিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। প্রশাসন গতিশীল করতে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে পদায়ন জরুরি। একইসঙ্গে অতীতের অভিযোগগুলো তদন্ত এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সংস্কার কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাভোগী একটি অংশ। বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই জটিলতা, বিলম্ব ও সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগে সমালোচিত। নতুন সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে রয়েছে— দুর্নীতি দমন, সেবা ডিজিটালাইজেশন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আমলাতান্ত্রিক জট কমানো। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসনের ভেতরের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতেই মাস কেটে যায়। এ সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে নির্দিষ্ট সময়সীমার কর্মসূচি সফল করা কঠিন।

১৮০ দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা, সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সেক্টরে যেন কোনো সমস্যা না হয়— এগুলো আমাদের অগ্রাধিকার।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেছেন, ‘বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাঙামাটির সব প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি পাহাড়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎসহ মৌলিক সেবাগুলো মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশিত ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে শতভাগ সম্পন্নযোগ্য প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক, তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’

পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি বলেছেন, ‘বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় পুনঃখননের এক মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ মহাযজ্ঞের প্রথম ধাপে পাইলটিং কর্মসূচির আওতায় ১৮০ দিনের মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার খালের খনন কাজ সম্পন্ন হবে।’

নতুন সরকারের জন্য প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। তবে এ পরিকল্পনা শুধু মন্ত্রণালয়েই সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিস্তৃত করা জরুরি বলে মনে করছে সংস্থাটি।

গবেষকদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্তরে অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্থানীয় নির্বাচন দ্রুত আয়োজন করা প্রয়োজন, যাতে বিকেন্দ্রীকরণ ও কার্যকর সেবা নিশ্চিত হয়।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘দীর্ঘ ২০ বছর পর ক্ষমতায় এসে খুব দ্রুত এসব সমস্যার অন্তর্নিহিত দিক ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বোঝা বা সামাল দেওয়া সহজ নয়। প্রশাসনকে শুধু আইন ও নীতিনির্ধারণকারী কাঠামো থেকে কার্যকর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর— ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত— সমন্বিত সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্বাহী বিভাগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। তাই জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংসদীয় নজরদারি সক্রিয় হলে মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।’

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.