Monday, February 23, 2026
spot_img

৬ কোটি নারী ভোটারের দেশে তিন জন নারী মন্ত্রী কেন? – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in বাংলা স্ট্রিম on 21 February 2026

এবারের নির্বাচন ও পরবর্তী মন্ত্রিপরিষদ গঠনের পর নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। আমরা যখন পরিবর্তনের কথা বলছি, নতুন করে রাষ্ট্র সাজানোর স্বপ্ন দেখছি, তখন নারীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—তা বিশ্লেষণ করা জরুরি মনে করি।

যেখানে দেশের মোট ভোটারের ৫১ শতাংশই নারী এবং ভোটকেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি পুরুষের প্রায় সমান, সেখানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি অনেক কম। মাত্র ৮৬ জন নারী প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন মাত্র ৭ জন।

অতীতের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই নিম্ন গতি আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৯৬ সালে নারী এমপি ছিলেন ৮ জন, ২০০৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ জনে, ২০১৪ সালে ১৮ জন এবং ২০১৮ সালে ২২ জনের মতো ছিল। এমনকি ২০২৪ সালেও এই সংখ্যা ছিল ১৯। অথচ এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ৭ জনে। এটি কেবল সংখ্যার পতন নয়, এটি নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি বড় ধাক্কা।

অন্যদিকে মাত্র ৩ জন নারী মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও কেবিনেটে তাদের এই নগণ্য উপস্থিতি প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অনেক দল তাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বা প্রতিশ্রুত কোটা পূরণ করেনি। এমনকি একটি দল কোনো নারী প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেয়নি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পরিবর্তে আমরা পেছনের দিকে হাঁটছি।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে কি রাজনীতিতে নারীদের আগ্রহ কমে গেছে? মাঠপর্যায়ের চিত্র কিন্তু তা বলে না। দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের মেম্বারশিপ এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কমেনি। সমস্যাটি মূলত দলের উচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে।

রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ‘উইনিং সিট’ বা নিশ্চিত বিজয়ের আসনগুলোতে মনোনয়ন দিতে চায় না। পুরুষশাসিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই আসনগুলো পুরুষদের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়। এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ‘মানি পাওয়ার’ বা অর্থবিত্ত। নির্বাচন এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। অধিকাংশ নারীর পক্ষে নির্বাচনের এই বিশাল খরচ বহন করা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে পুরুষ প্রার্থীদের নেটওয়ার্কিং এবং লবিং করার যে সুযোগ থাকে, নারীরা সামাজিকভাবে সেই সুবিধাও পান না। ফলে যোগ্য ও ত্যাগী নারী কর্মীরাও মনোনয়ন বঞ্চিত হন।

জুলাই সনদে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতির উত্তরণে কেবল আইন বা চাপ প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার। দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা না থাকলে এবং নীতিনির্ধারকরা যদি প্রো-অ্যাক্টিভ না হন, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে। দলগুলোকে বুঝতে হবে, দেশের ৫০ শতাংশ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে এবং তাদের সমস্যা বুঝতে হলে নারী নেতৃত্ব অপরিহার্য।

রাজনীতির বাইরে নারীর ক্ষমতায়নের আরেকটি মূল স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। আমাদের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, বর্তমানে তা প্রায় ৪০ শতাংশ। এটি ইতিবাচক। কিন্তু এই অংশগ্রহণের গভীরতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ নারীই কাজ করছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজের কোনো নিরাপত্তা নেই, আয় কম এবং জব সিকিউরিটি বা নিশ্চয়তা বলতে কিছু থাকে না। নারী শ্রমিকদের বড় অংশই এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন।

প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন নারীদের উচ্চ আয়ের ও আনুষ্ঠানিক খাতের চাকরিতে প্রবেশ করানো। এর জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। কিন্তু আমাদের দেশে নারীদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট বা প্রশিক্ষণের সুযোগ, বিশেষ করে মফস্বল বা গ্রামের নারীদের জন্য, খুবই অপ্রতুল।

নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হলো নিরাপত্তা এবং অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাব। ৫২ শতাংশ নারী জনসংখ্যার দেশে নারীদের জন্য ডেডিকেটেড পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বা বাসের ব্যবস্থা নগণ্য। পাশাপাশি কর্মজীবী নারীদের জন্য নিরাপদ আবাসন বা হোস্টেলের তীব্র সংকট রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে, রাস্তায় এবং ঘরে—সবখানেই নারীর প্রতি সহিংসতা একটি বড় ভয়ের কারণ। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সামাজিকভাবে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

সবাই চাকরি করবে না, অনেকেই উদ্যোক্তা হতে চান। কিন্তু নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূলধনের অভাব বা ‘অ্যাক্সেস টু ফাইনান্স’। ব্যাংকগুলোতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ স্কিম বা এসএমই ঋণের ব্যবস্থা থাকলেও, বাস্তবতা ভিন্ন। ঋণের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টেশন এবং ফরমালিটি এত জটিল যে, অনেক নারী এই প্রক্রিয়ায় যেতেই ভয় পান। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের নারীরা এই সুযোগগুলো সম্পর্কে জানেনও না, বা পেলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা কাজে লাগাতে পারেন না।

নারীর ক্ষমতায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া। রাজনীতিতে নারীদের যোগ্য আসন দেওয়া, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের যুক্ত করা, এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—সবই একে অপরের পরিপূরক।

জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে চাই, তবে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। কোটা বা আইন দিয়ে হয়তো কিছুটা সংখ্যা বাড়ানো যায়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন এবং কাঠামোগত সংস্কার। রাজনীতি ও অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান ও সুযোগ বুঝিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক