Monday, February 9, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Debapriya Bhattacharya

ভালো-মন্দ সবই অব্যাহত থাকবে – ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

Published in বাংলাদেশ প্রতিদিন on Friday, 8 June 2018

এই বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন করলে বলতে হবে যে, বিগত দশক ধরে আমরা যেসব আর্থিক ব্যবস্থাপনাগত প্রবণতাগুলো দেখি, ভালো এবং মন্দ মিশিয়ে— সেগুলোরই একটি স্থিতাবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে মনে হয়। সেভাবে এক কথায় এটা স্থিতাবস্থার বাজেট। কিন্তু ধারাবাহিকতার সমস্যা হলো, যেসব নতুন অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকাশ পাচ্ছে বা অর্থনীতিতে যে ধরনের নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলো সম্বন্ধে আমরা খুব বেশি সংবেদনশীলতা দেখি না। যেমন সাম্প্রতিককালে আমরা সিপিডির পক্ষ থেকে বলেছি আমাদের বৈদেশিক লেনদেনের হিসাবে একটা বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ১১ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে এখানে ঘাটতির দিকে গেছে, এই ঘাটতির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তেলের দাম বাড়ছে পৃথিবীতে, খাদ্যশস্য এবং সারের দাম বাড়ছে। এর ফলে আমাদের রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ যদি ঠিক না থাকে তাহলে কী ধরনের চাপ পড়বে টাকার মূল্যমানেরর ওপর, সুদের ওপর এবং মূল্যস্ফীতির ওপর। সেসব বিষয়ে আমরা কোনো ধরনের সংবেদনশীলতা দেখিনি। একই রকমভাবে আমরা মনে করি, বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা একটা বড় সমস্যা। অর্থমন্ত্রী সঠিকভাবে উল্লেখ করেছেন, এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক চাপ খুব বেশি না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে চাপ বাড়তে পারে। দুটো মূল্যায়নই ঠিক। কিন্তু উনি একবারও রোহিঙ্গাদের বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণ-পোষণের জন্য কী পরিমাণ অর্থ দেশে খরচ করতে হচ্ছে, যেসব সেবা দেওয়া হচ্ছে, অর্থাৎ প্রশাসন কাজ করছে, সেনাবাহিনী কাজ করছে এদের যদি আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করি তাহলে কত পড়ে সে রকম কিন্তু বাজেটে কোনো আর্থিক মূল্যায়ন দেখলাম না। তাই কোনো সংস্কারের কথা নেই, এমনকি একক পূর্ণাঙ্গ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনার কথা। আরও যেমন ব্যাংকিং খাত যে বড় ধরনের জটিল সমস্যার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, সে সমস্যাটা পুরো পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। উপরন্তু ব্যাংকিং খাতে যেসব নতুন কর রেয়াত দেওয়া হয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

আমরা যেটা বেশি দেখলাম যেহেতু ১০ বছরের একটি মূল্যায়ন করার চেষ্টা অর্থমন্ত্রী করেছেন, তাই অনেক ক্ষেত্রে রোমন্থনমূলক বক্তৃতা হয়েছে, পশ্চাত্মুখী বক্তৃতা হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে হয়তো এটাই স্বাভাবিক। এটাও তো ঠিক নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি উদ্দীপনাময় কিন্তু বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পথরেখা তুলে ধরা যেত।

পুরনো প্রবণতা অব্যাহত থাকেল অত বড় রাজস্ব আদায় হবে না, অত ব্যয় আমরা করতে পারব না। বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পুরনো কাঠামো, পুরনো চিন্তা এবং সেটার ভিতরেই স্থিতাবস্থা।

আজকে একই সঙ্গে সম্পূরক বাজেট দেওয়া হয়েছে এবং সংশোধিত বাজেট প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সম্পূরক বাজেটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। আমরা দেখতে পারছি বিদ্যুৎ সম্পূরক বাজেটের চাহিদার ২১ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। এটা যে বাড়তি খরচের অনুমতি চাওয়া হয়েছে তার ২৬ শতাংশ। ২২ শতাংশের মতো যাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৃদ্ধির পরিমাণ হলো ২৩০ শতাংশের মতো। এই দুটো মিলিয়ে বর্ধিত টাকা চাওয়ার প্রায় ৫০ শতাংশ যাবে।

সামগ্রিক সামষ্টিক আর্থিক কাঠামো কী এবং কিছু আর্থিক পদক্ষেপের ব্যাপারে আমার মতামত দিতে পারি।

আর্থিক কাঠামো সম্বন্ধে সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো অনুন্নয়ন রাজস্ব ব্যয় বেড়েই চলেছে। অপরদিকে আগের বছরগুলোতে যতখানি অভিলাষী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ছিল; এবার কিন্তু অতখানি অভিলাষী দেখতে পাচ্ছি না। এটা হতে পারে হয়তো মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়াতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বৃদ্ধির হার হয়তো কমে আসছে। যেহেতু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ নেই, শুধু রাষ্ট্রীয় খাতের বিনিয়োগ দিয়ে মোট বিনিয়োগকে বেশি দূর নেওয়াটা। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে স্থবিরতা অব্যাহত আছে। উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়ের বাইরে অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধি হচ্ছে। তবে রাজস্ব বৃদ্ধির হার, ব্যয় বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি আছে। সেহেতু আমাদের আর্থিক ঘাটতি বড়ভাবে বাড়ছে না। এটা ইতিবাচক ব্যাপার। প্রত্যক্ষ করের বৃদ্ধির গতি যেন শ্লথ হয়ে এসেছে। পরোক্ষ করে বিরাট ভার আয় নির্বিশেষে নাগরিকদের বহন করতে হবে। আপনারা জানেন দেশজ আয়ের ৪-৫ শতাংশের বাজেট ঘাটতি আমাদের থাকে— এটা বড় কিছু নয়। এই ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে ইদানীং ইতিবাচক একটা প্রবণতা আমরা দেখছি। বৈদেশিক অনুদান এবং ঋণ আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে ছাড় হচ্ছে। তার মানে দেশজ অর্থায়নের ওপর চাপ কমছে। আগামী বছরও এটা অব্যাহত থাকবে এটাই আমরা আশা করছি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থায়নে। আমরা বলেছি জাতীয় সঞ্চয়পত্রের ওপর চাপ কমিয়ে, ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়া ভালো হবে। কিন্তু সেই ব্যাংকিং খাত যদি সমস্যাসংকুল থাকে, সেখানে যদি তারল্য সংকট থাকে— তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ঋণ ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়াটা সমস্যাসংকুল রয়ে গেল। তাহলে শেষ পর্যন্ত তো সরকারকে আবার হয়তো জাতীয় সঞ্চয়পত্রের কাছেই ফিরে আসতে হবে এবং তার ফলে রাজস্ব ব্যয়ের বড় অংশ সুদ পরিশোধে চলে যাবে। তাই বাজেটের ঘাটতির পরিমাণ নয়, ঘাটতির অর্থায়নের ক্ষেত্রে যে কাঠামো দেওয়া হয়েছে আমরা সেটাকে সমস্যাসংকুল মনে করছি।

যেসব আর্থিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলোতে এখন যাই। সিপিডির আমাদের বহুদিনের দাবি ছিল চালের আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হোক। সরকার এবার চাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি এবং ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক মোট ২৮ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এতে আমরা খুব খুশি। যদিও এত দেরি করা উচিত হয়নি। এতে কৃষকরা উপকৃত হবে। আরও বেশ কিছু আর্থিক পদক্ষেপে আমরা একমত হয়েছি। যেমন সামাজিক খাতে যে সুবিধাভোগী মানুষের সংখ্যা বাড়ানো, ভাতার পরিমাণ বাড়ানো, এলাকা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। অনেকগুলো জায়গায় সম্পূরক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। যেমন পরিবেশের দিক থেকে পলিথিনের ওপর বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াতে যারা আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা করবে না তাদের ওপর ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিড়ি তৈরি, হেলিকপ্টার ব্যবহার, মোবাইল ফোন প্রস্তুত এর ওপর কর বাড়ানো হয়েছে। মোটরসাইকেলের ওপর কর কমানো হয়েছে। কারণ দেশে মোটরসাইকেল তৈরি হবে। এগুলো ঠিক আছে। একদিকে কর রেয়াত দেওয়াতে কর কম আসবে, আবার অন্য কিছুতে বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি দেশজ শিল্প এবং সামাজিক খাতে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিফলন আমরা দেখেছি।

তবে দু-একটা বিষয় আমাদের বিচলিত করেছে। যেসব নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানি আছে তাদের ওপর করপোরেট করের পরিমাপ ৪০-৩৭.৫ এবং অনিবন্ধিত ৪২.৫-৪০ শতাংশ করা হয়েছে। এই কর কমানোর আমরা কোনো অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা দেখি না। এই করের সুবিধা কোনো অবস্থাতেই ঋণ গ্রহীতারা সুদের কম হারের মাধ্যমে পাবে না। এটা থেকে আমানতকারীরাও কোনো সুবিধা পাবেন না। উপরন্তু যখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের নৈরাজ্য বিরাজমান, তখন তাদের প্রতি কোনো ধরনের আচরণগত সংস্কারমূলক শৃঙ্খলা না দিয়ে, এই সুবিধা দেওয়া আমাদের কাছে নৈতিকতা বিবর্জিত মনে হয়। দ্বিতীয় বিষয় হলো করযোগ্য আয়ের মাত্রা আছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য বিবেচনায় এটা বাড়ানো উচিত ছিল। যাতে করে করদাতার প্রকৃত আয় রক্ষা করা যায় কারণ মূল্যস্ফীতির কারণে সেটা তো ক্ষয় হয়ে গেছে। সরকার এটাতে কোনো পরিবর্তন আনেনি। অথচ উচ্চ আয়ের যারা আছেন তাদের আনুতোষিক ব্যয়ের মাত্রা ৭৫ হাজার টাকা আরও তাদের বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উচ্চবিত্ত মানুষের আনুতোষিক সুবিধা দেওয়া হলো, অথচ নিম্নবিত্ত মানুষের প্রকৃত আয় সংরক্ষণ দেওয়া হলো না। এটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।

আবাসন খাতে ১১শ বর্গফুট পর্যন্ত আগে ভ্যাট ছিল দেড় শতাংশ আর ১১শ-১৬শ পর্যন্ত ছিল আড়াই শতাংশ। এটাকে একত্রিত করে ১১শ-১৬শ এর ভিতরে সবার জন্য ২ শতাংশ করা হলো। আবারও নিম্ন আয়ের ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হলো, আয় সচ্ছলদের সুবিধা দেওয়া হলো। এগুলো কেমন আর্থিক পদক্ষেপ হলো সামাজিক সাম্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।

 

লেখক : ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিশেষ ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডি।