Saturday, February 28, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসার করতে হবে – মোস্তাফিজুর রহমান

Published in পরিবর্তন on Wednesday, 25 July 2018

নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারে পিছিয়ে বাংলাদেশ

শাহাদৎ স্বপন

দেশের সার্বিক জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি এখন বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব দেশই এখন নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে মোট জ্বালানি মিশ্রণে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি যেমন সৌর, বায়ু, মিশ্র ইত্যাদির অংশগ্রহণ ৩ শতাংশের নিচে। যেখানে ডেনমার্ক বর্তমানে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৩০ শতাংশ জোগান দেয় নবায়ণযোগ্য সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে।

গেল দুই বছর আগে রাজধানী ঢাকায় ঢাকা চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রি জ্বালানি বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে ডেনমার্কের গবেষক এন্ডার্স হেসেলার্জার তার উত্থাপিত প্রবন্ধে বাংলাদেশে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ডেনমার্কে বর্তমানে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৩০ শতাংশ জোগান দেয় নবায়ণযোগ্য সৌর ও বায়ুশক্তি। সেই সময় বাংলাদেশের জোগানের পরিমাণ ছিল মোট জ্বালানির মাত্র ৩ শতাংশ বা তারও কম।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নবায়ণযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বাংলাদেশে বড় সমস্যা জায়গার অভাব। বাংলাদেশ কৃষি নির্ভর দেশ। এখানে কৃষি জমি নষ্ট করে সোলার সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা কিছুটা কঠিন। সোলার বসাতে অনেক জায়গার প্রয়োজন হয়। কৃষি জমি নষ্ট করে সোলার বসানোর কোনো নিয়ম নেই। তাছাড়া সরকারের এ কাজে নিয়োজিত যে উইংগুলো কাজ করছে তাদেরও কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। তারা যে প্রোগ্রামগুলো হাতে নেয় তারও কোনো অগ্রগতি নেই।

ড. বদরুল বলেন, এই সিস্টেমকে প্রণোদনা দিতে সাবসিডারি বাড়াতে হবে। সোলারের দাম কমে দিতে হবে। যখন এর চাহিদা বেড়ে যাবে তখন দাম বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে এর দাম খুবই বেশি। দামের কারণে বেশকিছু কোম্পানি সোলার সিস্টেমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে সোলার হোম সিস্টেমে বাংলাদেশ অনেক ভাল করেছে। কিন্তু তাতে লাভ নেই। সোলার হোস সিস্টেম যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তার পরিমাণ খুবই কম। যেমন- সারাদেশে সোলার হোম সিস্টেম মাত্র ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। অথচ মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। সেখানে ২০০ মেগাওয়াট কিছুই নয়।

জ্বালানি গবেষকরা মনে করেন, নবায়ণযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ বাড়াতে হলে সরকারের ভর্তুকি বাড়াতে হবে। গ্রীড সোলার সিস্টেমের উৎকর্ষে সাধনে প্রণোদনার দিকে নজর দিতে হবে সরকারকে। গ্রীণ পাওয়ার চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে সরকারের মাথা থেকে দ্রুত রেজাল্ট পাওয়ার প্রবণতা ঝেড়ে ফেলে এ সেক্টর নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে ডেনমার্কসহ বিশ্বের যে দেশগুলো নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বেশ এগিয়ে তাদের অনুসরণ করা যেতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গেল ৭ বছরে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি যোগ হয়েছে মাত্র ১ শতাংশ। অর্থ্যাৎ যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট। সেখানে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ মাত্র ২০০ মেগাওয়াট। অথচ বাংলাদেশে ২০২১ সালের মধ্যে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব ১০ শতাংশ হবে বলে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসার কম কেন এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা ও নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নবায়ণযোগ্য জ্বালানির সিস্টেম বেশি দিনের নয়। বলতে গেলে এটি অনেকটা নতুন। বিশ্বব্যাপী এ সেক্টরের উন্নয়নের কাজ চলছে। নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারের ক্ষেত্র বেসরকারি পর্যায়ে বেশি। সময়ের ব্যবধানে হয়তো এর প্রসার কাঙ্খিত মানে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে এটা নিয়ে সরকার আন্তরিক। কাজ করছি আমরা।

সরকারের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, দেখুন বড় ধরনের পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সাঙ্গুতে ১৪০ মেগাওয়াট এবং মাতামুহুরীতে ৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুইটি স্থান সনাক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সমতল ভূমির জন্য পানি বিদ্যুতের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়েছে। কয়েকটি সমীক্ষার মাধ্যমে আমরা কয়েকটি স্থান সনাক্ত করেছি। যার সম্ভাবনা ১০ কিলোওয়াট থেকে ৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার নবায়ণযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০০৮ প্রণয়ন করেছে। নীতিমালায় নবায়ণযোগ্য জ্বালানির মূল উৎস হিসেবে সৌর শক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োমাস, হাইড্রো, বায়ো ফুয়েল, জিও থার্মাল, নদীর শ্রোত, সমুদ্রের ঢেউ ইত্যাদিকে শনাক্ত করা হয়েছে। নবায়ণযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০২০ সাল এবং তার পরবর্তী বছরগুলোতে নবায়ণযোগ্য শক্তি হতে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার নবায়ণযোগ্য শক্তি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৩১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে যার মধ্যে পাবলিক সেক্টর ১১০০ মেগাওয়াট এবং বাকী অংশ বেসরকারি উদ্যোগে বাস্তবায়ন করবে সরকার।

এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, বিদ্যুৎ সুবিধা বঞ্চিতদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। তাই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শক্তিশালীর পাশাপাশি নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসার গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। গ্রামীণ পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সচেতনা সৃষ্টির মাধ্যমে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি প্রসারে নতুন নতুন প্রকল্প সরকারকে হাতে নিতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা এর আগেও বলেছি নবায়ণযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির প্রবণতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ ঋণের দায়ভার কমাতে হবে। জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে সরকার বর্তমান, নিকট ও দূরবর্তী ভবিষ্যতের সমাধান খুঁজতে আমদানি করা জ্বালানি যেমন, আমদানি করা কয়লা, এলএনজি ও তেলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৯০ শতাংশ হবে আমদানি করা। আর এর জন্য বাংলাদেশকে মোটা অঙ্কের অর্থ জোগান দিতে হবে। এর ফলে বড় ধরনের চাপ পড়বে রাজস্বের উপর। এটা সামলাতে সরকারকে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.