নতুন সরকারের জবাবদিহি থাকতে হবে – ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

Originally posted in খবরের কাগজ on 4 December 2026

বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সাল অনেকভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের মধ্যদিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকারের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করবে। কাজেই বলা যায়, বাংলাদেশে একটা রাজনৈতিক উত্তরণ হতে যাচ্ছে। উত্তরণটি যতটা সহজ বা স্থিতিশীলভাবে হওয়ার কথা অতটা সহজ নাও হতে পারে। এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক যে দলাদলি চলছে, তাতে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ভোটের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। আগামী বছরটি অর্থনীতির জন্য কেমন যাবে বা অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে অর্থবছরটি শেষ করবে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়।

নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে নতুন অর্থবছর। অন্তর্বর্তী সরকার যে ধরনের ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে, তা যদি কিছুটা সংস্কার করে নির্বাচিত সরকারের হাতে তুলে দিত তাহলে নতুন সরকারের জন্য কাজ তুলনামূলকভাবে সহজ হতো। অন্তর্বর্তী সরকার বিগত দেড় বছরে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রে ঘুরে দাঁড়ালেও প্রত্যাশামাফিক যে স্থিতিশীল পরিবেশ আসার কথা ছিল তা পূর্ণমাত্রায় পাওয়া যায়নি। শুরুর দিকে কিছুটা এগিয়ে গেলেও মধ্যবর্তী পর্যায়ে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। শেষের দিকে এসে আবার এক ধরনের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে রূপান্তর হয়েছে।

এ সরকার সংস্কারের যে কাজগুলো করে যাচ্ছে, নতুন সরকার এসে সেগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে। এর ভেতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আর্থিক খাত বা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার। এখানে আমরা বেশ কিছু সংস্কার দেখেছি। এ সরকারের সময়কালে গভর্নর তার মতো করে কিছু কাজ এগিয়ে নিয়েছেন। নির্বাচনের পরও যদি এই গভর্নরই থাকেন অর্থাৎ তার মেয়াদ শেষ করতে পারেন তাহলে আশা করা যায়, এ কাজগুলো হয়তো তিনি অব্যাহত রাখবেন। নতুন রাজনৈতিক সরকার হয়তো সেগুলোতে সমর্থন দেবে। এর ভেতরে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে যে বড় রকমের একটা ধস নেমেছিল, এ সরকারের সময় বেশ কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেমন- ব্যাংকের বোর্ডগুলোয় বড় রকমের সংস্কার কার্যক্রম ও কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। বোর্ডে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নিযুক্ত করা হয়েছে। কোম্পানির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা হয়েছে। সবশেষে যেটা হলো- পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক হয়েছে, যেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট কেস হতে পারে। যদি এটা সাফল্যের সঙ্গে দাঁড়াতে পারে তাহলে আগামীতে অন্য যে দুর্বল ব্যাংকগুলো রয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রেও এরকম একটা মডেল হয়তো কাজে লাগানো যাবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারকে দায়িত্ব দিলে এ উদ্যোগগুলো থেকে তারা যেন পিছিয়ে না যায়। আবারও যেন ব্যাংকের বোর্ডে রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান নিযুক্ত না হন। সেখানে যেন নতুন করে রাজনৈতিক সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত না করা হয়। এ ধারাটি যেন অব্যাহত থাকে, সেটাই প্রত্যাশা। এক্সচেঞ্জ রেট বিনিময় পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ধরনের কন্ট্রোল রয়েছে। উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর আমরা দেখতে পেয়েছি যে, পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। আমরা মনে করি আগামী দিনগুলোতে এ উন্মুক্ত পরিস্থিতি থেকে নতুন সরকার যেন সরে না যায়।

রাজনৈতিক বিবেচনায় যেন ঋণ না দেওয়া হয়। নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনেই যেন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচিত হয়। রাজনৈতিক সরকার নতুন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় বোর্ডের মেম্বারদের বা তাদের পরিচিতদের অথবা সরকারের পরিচিতদের যেন ঋণ না দেয়, সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আগামী সরকারও যেন নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দেওয়ার উদ্যোগ রাখে। বাংলাদেশ ব্যাংকই বলবে নতুন ব্যাংক প্রয়োজন নাকি পুরোনো ব্যাংক কমানো প্রয়োজন। বর্তমানে এ বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এনবিআরের ক্ষেত্রে আমরা সংস্কারের কিছু উদ্যোগ দেখেছি। দুটো আলাদা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। একটি হচ্ছে রাজস্বনীতি বিভাগ এবং আরেকটি হলো রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ। রাজস্বনীতি বিভাগ কর আইন প্রয়োগ এবং কর আহরণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। অর্থাৎ ‘মূল্যায়ন’ শব্দের পরিবর্তে ‘পরিবীক্ষণ’ শব্দ যোগ করা হয়েছে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে প্রশাসনিক অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মচারীদের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। আমরা মনে করি, সরকার সে কাজগুলো সম্পন্ন করবে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ও দুর্বলতা দেখা গেছে, আবার এ সরকারের সময়ও সে ঘাটতি থেকে গেছে। বাংলাদেশে বিপুল রাজস্ব আদায়ের সুযোগ রয়েছে। রাজস্বগুলো আদায় করা যাচ্ছে না। কর ফাঁকি, কর এড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিতে অনেক রাজনৈতিক কারণও জড়িত, যা পূর্ববর্তী সময়কালে দেখেছি। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এশিয়ার ভেতরে সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে শক্তিশালী অবস্থানে আমাদের রাজস্ব আদায় যেন বৃদ্ধি করতে পারি। কেননা, আগামীতে আমাদের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির প্রয়োজন পড়বে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে গেলে আমাদের নিজস্ব আয় দিয়ে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাড়তি অর্থের দরকার পড়বে।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বড় ঘটনা এ অর্থবছরেই হতে পারে এবং তা নতুন রাজনৈতিক সরকারের শুরুতেই ঘটবে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ক্ষেত্রেও প্রস্তুতিগুলো দরকার হবে বলে আমি মনে করি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যারা সরকারে এবং সংসদে বিরোধী দলে থাকবেন কিংবা যারা বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের দায়িত্বে থাকবেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন যাতে কোনো বাধা বা সমস্যা ছাড়াই করা যায়, কোনো চ্যালেঞ্জ না হয়ে দাঁড়ায়, তারা সে বিষয়ে সজাগ ও সচেতন থাকবেন।

অর্থসংক্রান্ত, বাণিজ্যসংক্রান্ত দায়িত্বগুলোতে মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বিভিন্ন খাতে দক্ষ, যোগ্য ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। পূর্ববর্তী সরকার, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারও আমলাতন্ত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা দেখিয়েছে। আসলে এটা কেউই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আমলাতন্ত্রের কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত উপযুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের একটা প্রত্যাশা থাকবে, শুরু থেকেই যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা করতে পারে। সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে যাতে দক্ষতার বিচারে উপযুক্ত লোকবল নিয়োগ হয়। প্রশাসনিক ব্যবস্থার আকার ছোট করা দরকার। কেননা, এত বড় প্রশাসনিক জায়গায় অনেক বেশি দক্ষতা দিয়ে সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা জরুরি। বিশাল বড় প্রতিষ্ঠানের এমন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যাতে সরকারের দুশ্চিন্তার কারণ না হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যাতে বড় রকমের কোনো প্রভাব না ফেলে।

সরকার এখনো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। যা একটা বড় মাথাব্যথার কারণ। বড় বড় যেসব কোম্পানি রয়েছে, বাজারে তাদের এক ধরনের অলিখিত প্রভাব রয়েছে। যার কারণে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কষ্টসাধ্য। বাজার মনিটরিংয়ে দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের কাছে অসহায় থাকে সরকার। এগুলোর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা মনে করি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশন করে সরকার এ খাতগুলোকে স্বচ্ছ করতে পারে। জবাবদিহি বাধ্যতামূলক করতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় যাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে, সে ধরনের ডিজিটাল উত্তরণ দরকার। এ ছাড়া একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে বসে আছে। তার একটা বড় কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বহুলাংশে কমে যাবে। সুতরাং, ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন করে বিনিয়োগ করতে চাইবেন। বিনিয়োগকারীরা চাইবেন নতুন উদ্যমে বিনিয়োগ করতে। বিনিয়োগের জন্য যে পরিবেশ চাই, সরকার আজও সে পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনেক প্রতিষ্ঠান সার্ভিসগুলোতে ডিজিটালাইজ করতে চায় না, অনলাইন প্লাটফর্মে যেতে চায় না। এর প্রধান কারণ ঘুষ। ব্যবসায়ীদের সহায়ক এক ধরনের কর্মপরিবেশ শুরু থেকেই সিস্টেমগুলোকে ডিজিটালাইজ করা যায়।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আমাদের জন্য খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ যাতে বাংলাদেশে আসতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন- অবকাঠামো, গ্যাস, বিদ্যুতের লাইন, দক্ষ শ্রমিক ইত্যাদি। অনলাইন বা ডিজিটাল প্লাটফর্মের সব সার্ভিস সচল রাখতে হবে। সরকারের উচিত হবে খাদ্যভিত্তিক স্বনির্ভর হওয়া। টেকসই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর পাশাপাশি একটি দেশের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম, আইন ও নির্দেশিকা মেনে চললে সাপ্লাই চেইন-ভিত্তিক কাঠামো তৈরি করা সহজ হবে। চেইন-ভিত্তিক কাঠামো তৈরি করতে কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদন, মধ্যবর্তী পণ্য থেকে বিপণন- সেটা দেশে হোক কিংবা বিদেশে হোক সেগুলো পূর্ণাঙ্গ একক কাঠামোয় পরিণত করতে হবে। সুতরাং, এগুলো ‘ইনফোর্সমেন্ট’ অর্থাৎ আইন, নিয়ম বা আদেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকার যেন শুরু থেকেই নজরদারি রাখে।

সংসদ আগামীতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হওয়ার কথা। সংসদে বিরোধী দল থাকবে। তারা ছায়া সংসদ গঠন করবে। এজন্য প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ে তাদের ছায়ামন্ত্রী থাকবে। সবশেষে, বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা, সে সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই আমরা অর্জন করতে পারিনি। আগামী দিনে যে সরকার আসবে, সে সরকার দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি এবং দক্ষতার জায়গাগুলোকে উপযুক্তভাবে নিশ্চিত করার জন্য যেন শুরুর দিন থেকেই তাদের উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখে, সে প্রত্যাশা থাকবে।

লেখক: গবেষণা পরিচালক, সিপিডি