Wednesday, February 4, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

জনপ্রশাসন সংস্কার না হওয়ায় আমলাতন্ত্রের প্রভাব অটুট – ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in দেশ রূপান্তর on 2 February 2026

আমলাদের চিন্তায় দপ্তর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দপ্তরভিত্তিক আগাম সমীকরণ মেলাতে শুরু করেছেন প্রভাবশালী আমলারা। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলার দায়িত্বে থাকা আমলার গোপনে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সেরে রাখছেন। নির্বাচনের পর আসন্ন নতুন সরকারে পছন্দসই দপ্তর লাভই এখন তাদের প্রধান চিন্তা। এ বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানলেও প্রকাশ্যে কথা বলছেন না।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর প্রশাসনে নতুন নতুন ‘স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী’ বা প্রেশার গ্রুপের উত্থান ঘটেছে, যারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট। কেউ কেউ মনে করছেন, আমলাদের এই অতি-সক্রিয়তা বা দৌড়ঝাঁপ মূলত ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণে নিজেদের টিকিয়ে রাখার কৌশল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রশাসনের মধ্যে দুটি ধারা বিরাজ করছে। বিগত আওয়ামী নেতৃত্বধীন সরকারের সুবিধাভোগীরা নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরিতে এগিয়ে আসছে। অন্যপক্ষ নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। সচেতন মহল এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহলে দীর্ঘদিন থেকে সচিবালয়সহ সরকারি দপ্তরগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্রের কারণে সক্ষমতা থাকার পরও দেশের অর্থনীতি পিছিয়ে আছে। ফলে যারাই নতুন সরকার গঠন করবে, তাদেরকে আমলাদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সরকারে আমলাতন্ত্রের প্রভাব সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত সময়ে বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের যে কাঠামো গড়ে উঠেছে, তা ইস্পাতকঠিন কাঠামো। এ কাঠামো ভাঙার মতো কারও অবস্থা দেখছি না। এটা নিয়ে সবাই অস্বস্তিতে আছে। তাদের দৌরাত্ম্য সবসময় ছিল। নতুন সরকারের জন্য এটা একটা পুরনো চ্যালেঞ্জ। তবে নতুন সরকার আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্য কমাতে কী করবে বা কী করতে পারবে, তা এখন বলা সম্ভব নয়। সরকার গঠনের পর তাদের (সরকারের) কার্যক্রম এবং উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা (আমলাতন্ত্রের) খবরদারি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জনমনে আশা ছিল দুর্নীতিবাজ আমলারা বিচারের মুখমুখি হবে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়েছে সাধারণ মানুষ। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের নীরবতার সুযোগে দপ্তরে দপ্তরে দাবি আদায় আন্দোলন শুরু হয়। সরকারি কর্মচারীদের প্রধান দপ্তর বাংলাদেশ সচিবালয় আন্দোলনকারীদের দ্বারা কয়েক দফায় হামলা-ভাঙচুরের শিকার হয়।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এখন ব্যবসায়ী মহল ও সাবেক আমলারা দাবি তুলছে, রাজনৈতিক দলগুলো যাতে তাদের ইশতেহারে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করে। বিশেষ করে সচিব ও সংস্থাপ্রধান নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে মেধা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বারবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জনপ্রশাসনের দুর্নীতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি করছে।

জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে একে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ করার উদ্যোগের ফলে এনবিআরে নজিরবিহীন আন্দোলন শুরু হয়। বিভক্তির ফলে সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন ক্যাডারের হাতে থাকার বা প্রশাসন ক্যাডারদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আন্দোলন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকে। একপর্যায়ে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেয় এনবিআর কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সংস্থাটির নতুন দুই বিভাগে কে কোন দপ্তর পাবেন, সে নিয়ে হিসাব বা রূপরেখা তৈরি শুরু হয়ে গেছে।

এনবিআরে আন্দোলন চলাকালে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৪টি ব্যবসায়ী সংগঠন। সেই সময় যৌথভাবে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘অ্যাকচুয়ালি ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে, টাকা-পয়সার বণ্টন নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে। মাঝপথে আমরা হচ্ছি বিপদগ্রস্ত। এরা সারা জীবন আমাদের জ্বালিয়েছে। এখন সরকারকে জ্বালাচ্ছে। ভবিষ্যতে এখন পুরো জাতিকে জ্বালাবে।’

এখন নতুন বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসূচি চলমান রয়েছে। বলা হচ্ছে, বর্তমান সরকার শেষ সময়ে প্রভাবশালী আমলাদের চাপে বেতন কাঠামো তৈরিতে বাধ্য হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন বিষয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার ও সরকারি সেবায় কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া নতুন পে-স্কেল ঘুষ দুর্নীতির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার শঙ্কা করছে টিআইবি।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয় অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সম্প্রতি বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএসএ) নতুন কমিটি গঠন নিয়ে। সমিতি দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি পাল্টাপাল্টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছেন সংগঠনের বর্তমান সভাপতি নজরুল ইসলাম এবং নতুন কমিটির সভাপতি কানিজ মওলা ও মহাসচিব বাবুল মিঞা। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, প্রশাসন ক্যাডারের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের চিত্র। একই অবস্থা বিরাজ করছে পুলিশ, চিকিৎসক, কৃষিসহ অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে। ফলে আগামীতেও সরকার আমলাতন্ত্রের কবলে আটকা পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সচিবালয়সহ সরকারি দপ্তরগুলোর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। সম্প্রতি নিজ দপ্তরে তিনি বলেন, ‘আমলাতন্ত্র দেশকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এটি প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে যে বিমান দুর্ঘটনা (২১ জুলাই, ২০২৫) হয়েছে, সেই বিমানটির মাইলস্টোনে নয়, সচিবালয়ে পড়া উচিত ছিল। সচিবালয়ের প্রতি মানুষ ব্যাপক ক্ষুব্ধ। শুধু সচিবালয় নয়, সরকারি প্রতিটি দপ্তরের ওপর জনগণ ক্ষুব্ধ।’ তিনি আমলাতন্ত্রকে ‘জগদ্দল পাথর’ অভিহিত করেন।

অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা ও জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের ওপর পর্যবেক্ষণ হাজির করেছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, আমলাদের প্রভাবশালী একটি অংশের কাছে ‘নতিস্বীকার’ করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ‘লক্ষ্যভ্রষ্ট’ হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সংস্কারের প্রশ্নে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অপশক্তির কাছে সরকার নতিস্বীকার করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে সংস্কার-প্রতিরোধক মহলকে প্রতিহত করতে।’

ভোটের আগে আমলাদের তৎপরতা সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার যেসব সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, দপ্তরভিত্তিক যেসব সংস্কার কারার দরকার ছিল, তা করতে পারেনি। বিশেষ করে জনপ্রশাসন সংস্কারের বিষয়ে কিছুই হয়নি। ফলে তাদের (আমলাদের) প্রভাব রয়ে গেছে। সেখানে একটা পরিবর্তন আসা দরকার ছিল। কিন্তু আমলাদের আগের কাঠামোই রয়ে গেছে। যারা নতুন সরকারে যাচ্ছেন, তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমলাদের চাপ মোকাবিলা করতে হবে। এর ব্যতিক্রম করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে আমলাতন্ত্রের বিষয়ে বিশেষ কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপের ঘোষণা আসছে না। ফলে আগামীতে যারাই ক্ষমতায় আসবে, তাদের লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।’