Wednesday, February 4, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

রাজস্ব ঘাটতিতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়ের ঋণঝুঁকি – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in বণিকবার্তা on 3 February 2026

অন্তর্বর্তী সরকারের ঋণগ্রহণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও তাদের ১৮ মাসে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঋণগ্রহণ বেড়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও তাদের ১৮ মাসে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঋণগ্রহণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে এ সময়ে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে (আগস্ট-জুন) ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। ঋণ গ্রহণের এ ধারা অব্যাহত থাকলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে নেয়া ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

ক্ষমতায় বসার পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও অতীতের সরকারের সময়ের লুটপাট ও অর্থ পাচারের বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। এ কমিটির প্রতিবেদনে সরকারি বিনিয়োগকে ঘিরে ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে সরকারি কর্মকাণ্ডের জন্য ক্রয়কৃত পণ্য ও সেবায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে ঘুস হিসেবেই চলে গেছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার মতো। এ ঘুস নিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও তাদের সহযোগী ব্যক্তিরা। এ সময় সরকারি তহবিল থেকে দেশে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন হয়েছে। এর সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ঋণও ছিল।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও ঋণের ফাঁদে পড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের ফলে বিদেশী ঋণের সুদহার বেড়ে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণকে আরো ব্যয়বহুল করে তুলবে। তাই যতটা সম্ভব নিজস্ব সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে চায় সরকার। অপ্রয়োজনীয় বড় প্রকল্পের জন্য আমরা আর ঋণ নিতে চাই না। অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল বয়ে আনে না।’

গত বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন আয়োজিত এক সেমিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছি; এ সত্য স্বীকার না করলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়।’

ঋণের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্কবাণী সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণগ্রহণের প্রবণতা কমার পরিবর্তে বরং আরো বেড়েছে। এ সময়ে অতীতের সরকারের নেয়া অনেক প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। পাশাপাশি সরকার বড় ব্যয়ের মেগা প্রকল্পও অনুমোদন করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০টি একনেক সভায় সংশোধিতসহ মোট প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় ২৫১টি। এসব প্রকল্পের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয় ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পগুলোর ৯৮টি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া হয়েছিল। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও পুনর্মূল্যায়নের পর এসব প্রকল্পে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। বাকি ১৫৩টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবে। এ প্রকল্পগুলোর জন্য ২ লাখ ১২ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল। সে বছর আগস্টে দায়িত্বগ্রহণের পর আলোচ্য অর্থবছরের বাকি ১১ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৫৭ কোটি ও বিদেশী উৎস থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৪০ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশীয় উৎস থেকে ৫১ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এসেছে ১০৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারের নিট বৈদেশিক ঋণ। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১০৩ কোটি টাকায়। এসব হিসেবে সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের মেয়াদে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এত কম সময়ে এত বেশি পরিমাণ ঋণ সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুস্থতার লক্ষণ নয়। সার্বিকভাবে সরকারের ঋণ এতটা বাড়ার পেছনে আমি যুক্তিসংগত কারণ দেখছি না, কারণ উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে তো কাটছাঁট করা হয়েছে। সরকারের আয় কম হওয়ায় অন্যদের চেয়ে আমাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কম। সরকারের আয় বাড়ানোই হচ্ছে ঋণ শোধের সক্ষমতা বাড়ানোর একমাত্র উপায়। ফলে আমাদের চিন্তিত হওয়ার, সাবধান হওয়ার কারণ আছে। পরিচালন খাতেই যদি রাজস্ব আয়ের অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন খাতে কীভাবে ব্যয় করব! যেকোনো অজনপ্রিয় বা কঠিন সিদ্ধান্ত অরাজনৈতিক সরকারের সময়ে নেয়া সহজ। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই সরকারি ব্যয় সাশ্রয় করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটি না হওয়ায় সামনে নতুন যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।’

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশীয় উৎস থেকে প্রতি মাসে গড়ে ১২ হাজার ৯৫২ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। ঋণ নেয়ার এ ধারা অব্যাহত থাকলে আলোচ্য অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সরকারের নেয়া দেশীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯০ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকায়। আর চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকার বিদেশী ঋণ এসেছে। সে হিসেবে আলোচ্য অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ হাজার ২৮৮ কোটি টাকায়। এ প্রক্ষেপণ ধরে বলা যায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে সরকারের নেয়া মোট ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫ হাজার ৯৫২ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে নেয়া ঋণের সঙ্গে চলতি অর্থবছরের সাত মাসে ঋণ নেয়ার এ সম্ভাব্য হিসাব যোগ করা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে নেয়া মোট ঋণ দাঁড়াবে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকায়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময় অর্থনীতি যে অবস্থায় ছিল, তাতে সরকার চালানোর জন্য ঋণ নেয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। সরকারকে বাধ্য হয়েই ঋণ নিতে হয়েছে। এছাড়া সংস্কারের শর্তে বেশকিছু বিদেশী ঋণও এসেছে। এসব সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে, আবার কিছু মাঝপথে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত যদি এসব সংস্কার বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে যে উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়া হয়েছে, সেটি অর্জন হবে না। অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটি সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে, সে দাবি সরকার করতে পারে। কিন্তু উদযাপন করার মতো বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে, তা বলা যাবে না।’

এ সরকারের নেয়া ঋণের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে, যার বেশির ভাগ খরচ হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকির পেছনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আগস্ট-জুন সময়ে ১১ মাসে ৬ লাখ ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১ লাখ ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪ মাসে শুধু পরিচালন খাতে ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এর বিপরীতে উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে প্রতি মাসে গড়ে ৫০ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সে হিসেবে ১৮ মাসে সরকারের ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৯ লাখ ৬ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকায়।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) চেয়েও বেশি পরিমাণে ঋণ নেয়ার মানে হচ্ছে যে উন্নয়ন খাতের বাইরেও পরিচালন ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হচ্ছে। কারণ সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না। আবার পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন, ঋণের সুদ এবং ভর্তুকি বাবদই রাজস্ব ব্যয়ের ৮০ শতাংশ চলে যায় এবং এগুলো তো কমানো সম্ভব নয়। ফলে ব্যয় কমিয়ে যে সামাল দেয়া হবে, সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং রাজস্ব আয় যদি বাড়ানো না যায়, তাহলে ঋণ নিতে হবে। আবার সেটি যদি সামাল দেয়া না যায়, তাহলে পরিচালন ব্যয়ও ঋণ নিয়ে মেটাতে হবে।’

এভাবে ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে সেটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এক্ষেত্রে যদি কঠোরভাবে ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেয়া যেত, তাহলে হয়তো ঋণ কম লাগত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু এটি করতে পারেনি, সেহেতু রাজনৈতিক সরকারের সময় এটি করা আরো কঠিন হবে। বড় অংকের এ ঋণ উন্নয়ন খাতে নাকি পরিচালন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, সেটি সরকারের দিক থেকে স্বচ্ছতার স্বার্থে স্পষ্ট করা উচিত। যদি পরিচালন খাতের ব্যয়ের জন্য এ ঋণ নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তো সেটি মারাত্মক হবে!’

সরকারের ঋণ ও ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সেই হারে রাজস্ব আহরণ বাড়েনি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১১ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ৪ লাখ ১০ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে। আর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৭ মাসে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ হয়েছে।