Thursday, February 26, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

দীর্ঘমেয়াদি গম আমদানি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in দেশ রূপান্তর on 26 February 2026

চুক্তির জালে আমদানি

পাল্টা শুল্কে ছাড় পেতে চূড়ান্ত চুক্তির আগেই ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। ফলে সেই পাল্টা শুল্ক বাতিলের পরও বেশি দাম দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গম কিনছে সরকার। বছরে সাত লাখ টন করে আগামী পাঁচ বছর ধরেই ৩৫ লাখ টন গম যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমদানিতে সম্মতি দিয়েছে বাংলাদেশ, যা সরকারের গম কেনাকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের চুক্তির কার্যকারিতা অবৈধ ঘোষণার পরও সরকার বেশি দামে গম সংগ্রহ করবে কি না তা নিয়ে এখন সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমঝোতার কারণে আগামী পাঁচ বছর কার্যত শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকেই গম আমদানি করবে সরকার। অন্য কোনো দেশ থেকে আমদানিতে বাধা না থাকলেও সে সুযোগ সীমিত। আগে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী রাশিয়া, ইউক্রেন, আর্জেন্টিনা, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, উরুগুয়েসহ বিভিন্ন দেশের গম আমদানি করত। জিটুজি এবং উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দামে গম কেনা হতো। বাধাহীনভাবে আমদানির এবং তুলনামূলক কম দামে গম কেনার এই প্রক্রিয়াটা আদতে বন্ধ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মধ্য দিয়ে।

সরকার প্রতিবছর গড়ে পাঁচ থেকে সাত লাখ টন গম আমদানি করে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গত তিন বছরের আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৬ লাখ ৬০ হাজার টন গম আমদানির জিটুজি চুক্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ৪ লাখ ৪০ হাজার টন গম আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ২ লাখ ২০ হাজার টন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

গত বছরের ১ আগস্ট বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা পাল্টা শুল্কের হার ৩৫ থেকে কমে ২০ শতাংশ নির্ধারিত হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিটুজি ভিত্তিতে সরাসরি গম আমদানির জন্য চুক্তি করে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটস এবং খাদ্য অধিদপ্তর। এরপর গত ২৪ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটিতে নীতিগতভাবে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। তখন থেকেই দেশটি থেকে সরাসরি গম আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী, গমের ক্রেতা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য অধিদপ্তর। বিক্রেতা সিঙ্গাপুরে অবস্থিত এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড। বিক্রেতাকে মনোনীত করেছে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটস।

গত বছরের জুলাই মাসে খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরপরই প্রথম ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় টনপ্রতি ৩০২ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার (পরিবহন খরচসহ)। একই মাসে চুক্তির আগে রাশিয়া থেকে ৫০ হাজার টন গম কেনা হয় ২৭৫ মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ সব খরচসহ প্রথম চালানে যুক্তরাষ্ট্রের গমের দাম ২৭ দশমিক ৭৫ ডলার বেশি পড়ে।

তবে অক্টোবর মাসে আরও ২ লাখ ২০ হাজার টনের যে চালানে যুক্তরাষ্ট্রের গম আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়, এর প্রতি টনের দাম পড়ে ৩০৮ ডলার, যা রাশিয়ান গমের তুলনায় ৩৩ ডলার বেশি। একইভাবে সবশেষ গত ডিসেম্বরে বাকি ২ লাখ ২০ হাজার টনের চালানে টনপ্রতি গমের দাম পড়ে ৩১২ দশমিক ৭৫ ডলার, যেখানে রাশিয়ান গমের তুলনায় দাম ৩৭ দশমিক ৭৫ ডলার বেশি।

এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে টনপ্রতি ২৭৯ দশমিক ৯৫ ডলার, ইউক্রেন থেকে ৩০১ দশমিক ৩৮, আর্জেন্টিনা থেকে ২৮৬ দশমিক শূন্য ৮ এবং বুলগেরিয়া থেকে ২৯৫ দশমিক ২১ ডলার দামে ৫০ হাজার টন করে গম আমদানি করেছিল।

খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের চলতি মাসের ২২ তারিখের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গমের এফওবি মূল্যের মধ্যে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র গমের বর্তমান দামে পার্থক্য ১০ থেকে ১১ ডলার। তবে খরচের পার্থক্য বেশি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে ফ্রেইট চার্জ (পরিবহন খরচ)। ফলে দামটা টনপ্রতি প্রায় ৩৮ ডলারের পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে পাল্টা শুল্কে সুবিধা নিতে সরকার তড়িঘড়ি করে বেশি দামে গম কেনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা নতুন করে পর্যালোচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত ৯ ফেব্রুয়ারি করা চুক্তির মধ্য দিয়ে পাল্টা শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ শতাংশ। চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) থেকে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে, প্রতিবছর সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের গম, সয়া, তুলা এবং ভুট্টা রপ্তানি করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মূল চুক্তি অকার্যকর হওয়ার পর গম কেনার এই চুক্তি বহাল থাকবে কি না সে বিষয়ে এখনো সরকার কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সময় সরকারের উচিত নতুন করে দরকষাকষি করা। যাতে করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে গম কেনার সুযোগ তৈরি হয়। কারণ একদিকে বাংলাদেশকে বৈশি^ক বাজার থেকে দরকষাকষি করে যে গম সংগ্রহ করার কথা, সেই সুযোগটা আপাতত নেই। এই সুবিধাটা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আদায় করা যায় কি না সেটি বিবেচনা করতে হবে। এ ছাড়া পুরোপুরি একটি দেশের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে অন্যান্য দেশ থেকেও আমদানির সুযোগ তৈরি করা উচিত।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাল্টা শুল্কে সুবিধা পাওয়ার জন্য সরকার যদি লম্বা সময় ধরে একটি দেশ থেকে গম আমদানির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। কারণ ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের হার ইতিমধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের গমের দাম তুলনামূলক কম। সেই কম দামের সুবিধাটা নেওয়ার জন্য সমঝোতাটা নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত।’

এদিকে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তর যেহেতু পাঁচ বছরের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে তবে চাইলে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দরপত্র বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে খাদ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন দেশ থেকে গম সংগ্রহ করত, যা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচও করতে হচ্ছে। এটা এক ধরনের সংকট।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর হয়েছে ১০ শতাংশ হারে। এর আগে গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করেন। গত সপ্তাহের রায় প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশ দেন। পরে তিনি তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করার হুমকি দিলেও সেই শুল্ক এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেননি। মার্কিন প্রশাসন ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ১২২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এই শুল্ক আরোপ করছে। এই আইনে ১৫০ দিন পর্যন্ত কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা আছে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই শুল্ক এবং দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সই করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পরবর্তী করণীয় কী হবে, তা নির্ধারণে সরকার কাজ শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে এখতিয়ার বলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক চুক্তি করেছেন, সেটি ওই দেশের আদালত বাতিল করেছে। পরে তারা দুদফা শুল্ক আরোপের কথা বলছে। যদিও সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। যে কারণে আমরা চূড়ান্ত কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। অপেক্ষা করছি। তবে এখন পর্যন্ত যে বিষয়গুলো আমাদের সামনে এসেছে, সেটা মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে আমরা কাজ শুরু করেছি।’

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.