Tuesday, March 3, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াতে জ্বালানি ও পণ্য বৈচিত্র্য জরুরি – ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in জাগো নিউজ ২৪ on 2 March 2026

যে সব কারণে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতন

গত আট মাস ধরে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতন দেখছে দেশ/এআই নির্মিত গ্রাফিক্স

দেশের রপ্তানির নেতিবাচক ধারা থামছেই না। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সামগ্রিক রপ্তানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ১৩ শতাংশ। এজন্য মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক চাহিদা কমাকে দায়ী করছেন রপ্তানিকারকেরা।

বর্তমানে রপ্তানি আয় ৩১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছর আগে একই সময়ে ছিল ৩২ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক খাতের আয় ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।

সোমবার (২ মার্চ) এ তথ্য প্রকাশ করেছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।

প্রধান প্রধান রপ্তানি খাতের আয়ের চিত্র

তৈরি পোশাক খাত
বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ২৬ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ভেতরে নিটওয়্যার পণ্য ১৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ হ্রাস। আর ওভেন পণ্য ১২ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে, হ্রাসের হার ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

তবে হোম টেক্সটাইল রপ্তানি বেড়েছে। ৫৭৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫৯৩ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

অন্য খাতের মধ্যে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছের রপ্তানি ৩১৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩২৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি অর্জন করেছে। চিংড়ির রপ্তানি ২১৬ মিলিয়ন ডলার থেকে ২২০ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফার্মাসিউটিক্যালস খাত ১৪৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ১৫৫ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭৫৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ৭৯১ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ২২৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৬২ মিলিয়ন ডলার হয়েছে। চামড়া রপ্তানি সামান্য হ্রাস পেয়েছে ৮৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ৮৪ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। চামড়ার জুতা রপ্তানি কমেছে এবং ৪৫১ মিলিয়ন ডলার থেকে ৪৪৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

পাটজাত পণ্য
পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ০ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে ৫৪৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশেষভাবে পাটের সুতা ও দড়ি রপ্তানি ৩০৮ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৫২ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

বিশেষায়িত বস্ত্র রপ্তানি ২৬৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ২৪৫ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে, যেখানে রপ্তানি আয় ৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

অন্য খাতের মধ্যে নন-লেদার জুতা রপ্তানি ৩ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ৩৬৩ মিলিয়ন ডলার থেকে ৩৫২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাইসাইকেল রপ্তানি ৭৩ মিলিয়ন ডলার থেকে ৯৩ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

কেন কমছে রপ্তানি
বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকদের মতে, প্রধান প্রধান রপ্তানি গন্তব্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশের রপ্তানি আয় হ্রাস পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই ধীরগতির প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে পড়েছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, নীতিগত ধারাবাহিকতার ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট উৎপাদন খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। যা শেষ পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাস পাওয়ার পেছনে বৈশ্বিক ও দেশীয় দুই ধরনের কারণই স্পষ্ট। বৈশ্বিকভাবে প্রধান বাজারে চাহিদার ধীরগতি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং চায়না ও ভিয়েতনামের শক্তিশালী অবস্থান রপ্তানি হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে চায়না থেকে অর্ডার রিলোকেশন ও ভিয়েতনামের পণ্যের বৈচিত্র্য আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশীয় কারণে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অনিয়ম, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জমির সংকট এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার জটিলতা রপ্তানিকে প্রভাবিত করেছে। ফলে নতুন অর্ডার আনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।’

মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘রপ্তানি বাড়াতে সবচেয়ে জরুরি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, লাইসেন্সিং ও রেজিস্ট্রেশন দ্রুত এবং ডিজিটাল করা, বিনিয়োগ ফ্যাসিলিটেশন, ব্যাংকের সুদের হার নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্য বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন।’

এসব উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হবে। ভিয়েতনাম ও চায়নার সঙ্গে সমপ্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যতে চায়না থেকে অর্ডার রিলোকেশন সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মোয়াজ্জেম।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নির্বাচনের সময় অনেক ক্রেতা কাজের আদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) স্থগিত রাখেন। এছাড়া বৈশ্বিক চাহিদার ধীরগতি ও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ কেন্দ্র করে সৃষ্ট বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি আদেশ কমেছে, যা রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতার কারণ।’

তিনি বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। এর মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এসব ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক চাহিদাকে আরও দুর্বল করতে পারে।’

বিকেএমইএ সভাপতি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগামী জুন পর্যন্ত রপ্তানি পরিস্থিতি আরও নিম্নমুখী থাকতে পারে। টানা নেতিবাচক প্রবণতা শিল্পখাতের কঠিন বাস্তবতাকেই তুলে ধরছে।’

তিনি ঈদের আগে রপ্তানি প্রণোদনার অর্থ দ্রুত ছাড় করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি, যারা নগদ প্রণোদনার আওতায় নেই তাদের জন্য সহজ শর্তে সফট লোন দেওয়ারও দাবি জানান, যাতে কারখানাগুলো শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব ভাতা সময়মতো পরিশোধ করতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো দাবি করেছে, বন্দর কার্যক্রমে সাময়িক বিঘ্ন, জাতীয় নির্বাচন ও বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে সামগ্রিক রপ্তানিতে সামান্য হ্রাস দেখা দিয়েছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.