Friday, March 13, 2026
spot_img

ব্যতিক্রমী আলোর দিশারি – মোহাম্মদ কবীর আহমদ

Originally posted in যুগান্তর on 12 March 2026

১ নভেম্বর ২০২৫ একটি দৈনিকে প্রকাশিত ‘রেহমান সোবহান : ইতিহাসে দায়বদ্ধ বুদ্ধিজীবী’ শীর্ষক নিবন্ধে অর্থনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবী রেহমান সোবহান সম্পর্কে আরেক খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘বিরল কিছু মানুষের জীবন দেশের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে ধারণ করে গড়ে ওঠে। অধ্যাপক রেহমান সোবহান এমনই একজন মানুষ। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও জাতীয় বিকাশের ধারার সঙ্গে তার জীবনের সিঁড়ি-ভাঙা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’ অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে একজন রেনেসাঁ ব্যক্তিত্ব আখ্যা দিয়ে তিনি প্রবন্ধের শেষে বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তির জীবন ও জগৎ থেকে উপলব্ধি সঞ্চয় করে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম আরও আলোকিত ও অনুপ্রাণিত হবে।’ কত অল্প কথায় একজন গুণিজনের আলোকিত জীবনকে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করা যায়, এ নিবন্ধ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মেধা, সাহস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সততা তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জন-বুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিতি দান করেছে। তিনি সারাজীবন ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। এডওয়ার্ড সাইদের ভাষায়, ‘বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো-ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলা, সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং জনপরিসরে যুক্তি ও নৈতিকতার চর্চা করা।’ অধ্যাপক সোবহান পাকিস্তান আমলে ‘দুই অর্থনীতি’র তত্ত্ব দিয়ে এ সত্যই উচ্চারণ করেছিলেন। অমর্ত্য সেনের মতে, ‘উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপি বৃদ্ধি নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের সক্ষমতার বিস্তার।’ অধ্যাপক সোবহানের গবেষণা-বিবৃতি-আলোচনার সঙ্গে অমর্ত্য সেনের এ মতবাদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নোয়াম চমস্কি তার এক প্রবন্ধে বলেছেন, বুদ্ধিজীবীদের প্রধান দায়িত্ব হলো, ‘সত্য বলা এবং মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করা।’ চমস্কির মতে, বুদ্ধিজীবীরা যদি ক্ষমতার সঙ্গে আপস না করে সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, তবেই সমাজ-প্রগতি নিশ্চিত হয়।

যখন আইয়ুব খানের শাসনকালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমতার ‘মিথ্যা’ প্রচার করছিল, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক রেহমান সোবহান সেই প্রচারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে কীভাবে এ দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

বস্তুত অধ্যাপক রেহমান সোবহান একজন অর্গানিক ইনটেলেকচুয়াল। অর্গানিক ইনটেলেকচুয়াল সম্পর্কে চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি বলেছেন, ‘তারা একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণির মধ্য থেকে উঠে আসেন এবং সেই শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থ ও সংগ্রামকে তাত্ত্বিক রূপ দেন। তারা শুধু জ্ঞানচর্চার ভেতরেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন না, বরং সমাজ পরিবর্তনের কারিগর হিসাবেও কাজ করেন।’ রেহমান সোবহান বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে যুক্ত থেকে স্পষ্ট করেছেন, বুদ্ধিজীবীদের কীভাবে দায়িত্ব পালনে অব্যাহত সোচ্চার থাকতে হয়।

আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা যে সময়ের কত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে, অধ্যাপক রেহমান সোবহানের আত্মজীবনী পাঠ করলে তা বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। তার আত্মজীবনী পাঠ করলে এ দেশের সমাজ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। আজ অধ্যাপক রেহমান সোবহান ৯১ বছর পূর্ণ করলেন। তার জন্ম ১৯৩৫ সালের ১২ মার্চ কলকাতায়। তার বাবা খন্দকার ফজলে সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের আইসিএস কর্মকর্তা, পরে পাকিস্তান আমলে পুলিশের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মা হাশমত আরা ঢাকার নবাব পরিবারের উত্তরাধিকারী।

২.

‘উতল রোমন্থন’ গ্রন্থে রেহমান সোবহান ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং তার চারপাশের নিখুঁত বিবরণ দিয়েছেন; এমন সমৃদ্ধ গ্রন্থ আমাদের দেশে আর কতজন লিখেছেন, এটাও হতে পারে গবেষণার বিষয়। এটি রেহমান সোবহানের মূল গ্রন্থ ‘UNTRANQUIL RECOLLECTIONS: The Years of Fulfilment’-এর বাংলা অনুবাদ। নিজের পরিবারের পরিচয় দিতে গিয়ে অধ্যাপক রেহমান সোবহান লিখেছেন, ‘সমাজের সুবিধাভোগী অংশে আমার জন্ম।’ এভাবে নিজের পরিচয় প্রদানের মাধ্যমে তার মননের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

১৯৪২ সালে দার্জিলিংয়ের সেন্ট পল্স স্কুলে ভর্তির মধ্য দিয়েই রেহমান সোবহানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু। ১৯৫০ সালে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষা পর্যন্ত তিনি এ প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। ঢাকার সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় ১৯৪৮ সালে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন রেহমান সোবহানের নানা (মায়ের মামা)। সেই সূত্রে এক মাসের জন্য নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন।

রেহমান সোবহান ১৯৫৩ সালের অক্টোবরে অর্থনীতিতে পড়ার জন্য ক্যামব্রিজে ভর্তি হন। ক্যামব্রিজের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছেন, ‘ক্যামব্রিজ মজলিশ থেকে আমার নিজের সরাসরি ক্যামব্রিজের জনজীবন ও রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে যাওয়া শুরু। ভারত ও সিংহল নিয়ে গঠিত তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের ছাত্রদের ফোরাম হিসাবে ঊনবিংশ শতকের শেষভাগে এ পুরোনো সংস্থাটির জন্ম। এখানে উপমহাদেশীয় ছাত্ররা সামাজিকতা বিনিময়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে পারত।’

ক্যামব্রিজের পড়াশোনা শেষ করে দুমাস করাচিতে থেকে ১৯৫৭ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের লক্ষ্যে ঢাকায় আসেন। ওই বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পৃথিবীর যে কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি ঢাকায় ফিরে এসেছেন। ক্যামব্রিজে অধ্যয়নকালেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটি ছিল তার পলিটিক্যাল ও আইডিওলজিক্যাল সিদ্ধান্ত।

৩.

১৯৭২ সালে প্ল্যানিং কমিশনে যোগ দেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। ১৯৯১ সালে অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনি বিআইডিএসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রায় দুই দশক; ওই প্রতিষ্ঠানে তিনি মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ছয় বছর। ১৯৯৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। বিগত তিন দশকের বেশি সময়ে রেহমান সোবহানের নেতৃত্ব ও প্রেরণায় সিপিডি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পেয়েছে। আলোকিত সমাজ গড়তে হলে অব্যাহত জ্ঞানচর্চার বিকল্প নেই। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জ্ঞানমুখী সমাজ নির্মাণে আমাদের চারপাশে জোরালো তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণদের একটি উল্লখযোগ্য অংশ গুণিজনের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে তেমন আগ্রহী হয়। এমন দৃশ্য দেখে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মতো যারা আলোর দিশারি, তারা ব্যথিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

অধ্যাপক রেহমান সোবহানের লেখা ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়ে নতুন প্রজন্মকে আলোকিত জীবনচর্চায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। তা না হলে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা পিছিয়ে পড়বে। তরুণরা যাতে গুণিজনের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়, এজন্য যা যা করা দরকার, সবই করতে হবে। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের জন্মদিনে আমরা তার সুস্থ জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.