Monday, March 30, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Debapriya Bhattacharya

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভবিষ্যৎ কী – দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও শৌর্য তালুকদার

Originally posted in প্রথম আলো on 29 March 2026

গত দেড় দশকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ বারবার এসেছে | ফাইল ছবি

জাতিসংঘের ১৯৯৩ সালের প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন একটি স্বাধীন নজরদারি ও অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান। এর কাজ রাষ্ট্রের ক্ষমতার ওপর নজর রাখা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করা ও সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো। অর্থাৎ এটি রাষ্ট্রের ভেতরে একটি নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন প্রশ্ন তোলে।

গত দেড় দশকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা খুব কমই দৃশ্যমান হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থেকেছে; তদন্ত বা অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম ছিল নগণ্য। তা ছাড়া এসব প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে মানবাধিকার কমিশন ‘নখদন্তহীন’ বা ‘কাগুজে’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, যার নেতৃত্ব ছিল মেরুদণ্ডহীন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ থেকেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য জোর আলোচনা শুরু হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রক্রিয়া গতি পায়। সেই সরকারের অধীন ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০০৭’ জারি করা হয়। এর মাধ্যমে কমিশনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় এবং চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালের ৪ জুলাই নবম জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ পাস হয়, যা পূর্ববর্তী অধ্যাদেশকে আইনি রূপ দেয়। এই আইনের অধীনেই ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কমিশন কাজ করে। যদিও এর সীমাবদ্ধতা ও অকার্যকারিতা নিয়ে প্রচুর কথা রয়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ওই বছরের ৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন অবলুপ্ত করে। এরপর ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রকাশ করা হয়। ৯ নভেম্বর তা গেজেট আকারে জারি হয় এবং ৮ ডিসেম্বর সংশোধিত অধ্যাদেশ প্রকাশিত হয়। এই পুরো সময়জুড়ে কোনো কমিশন ছিল না।

নতুন অধ্যাদেশে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। তদন্তের সময়সীমা কমিয়ে তিন মাস করা হয়েছে, কমিশনের সব সদস্যকে পূর্ণকালীন কাঠামোয় আনা হয়েছে, বাজেট ব্যবস্থাপনায় কিছু স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিশু অধিকার সম্পর্কেও কিছু সংযোজন রয়েছে।

এর একটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতাও রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ব্যবস্থা ‘ক্যাটাগরি বি’ মর্যাদায় রয়েছে, অর্থাৎ এটি প্যারিস নীতিমালার পূর্ণ মানদণ্ড এখনো অর্জন করতে পারেনি। এর ফলে কমিশন জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে স্বাধীনভাবে বক্তব্য দেওয়ার পূর্ণ অধিকার পায় না এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বা ভোটাধিকার থেকেও বঞ্চিত থাকে। একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের দাঁড়াতে হলে ‘ক্যাটাগরি এ’ মর্যাদায় উন্নীত হওয়া জরুরি। এই উন্নয়ন কেবল প্রতীকী নয়—এটি কমিশনের স্বাধীনতা, কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

নাগরিক উদ্যোগ

বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রশ্নে নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। বিশেষ করে ২০০৭-০৯ সালে মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী এক দশকে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে মতামত দিয়ে এসেছে।

এরপর ২০১০-এর দশকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই দাবি আরও জোরালো হয়। একই ধারাবাহিকতায় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠালগ্ন (২০১৬ সাল) থেকেই নিয়মিত সংলাপ, কর্মশালা ও পরামর্শ সভার মাধ্যমে মানবাধিকার, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে প্রস্তাবিত খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে বহুপক্ষীয় সংলাপ ও ২০২৬ সালে নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে আয়োজিত আলোচনাগুলো এই ধারাবাহিকতার সাম্প্রতিক উদাহরণ। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই দীর্ঘ নাগরিক উদ্যোগ বাস্তব নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলতে পেরেছে?

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, খুব বেশি নয়। কারণ, মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রায়ই রাজনৈতিক বিবেচনা বা প্রশাসনিক পটভূমির ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে কাজ করার বদলে অনেক সময় নির্বাহী ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বারবার বলেছেন, মানবাধিকার কমিশনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার কাঠামোগত স্বাধীনতার অভাব। কমিশনের নিজস্ব জনবল নিয়োগ, বাজেট ব্যবস্থাপনা বা তদন্তপ্রক্রিয়ার ওপরও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল। এর ফলে কমিশনের কার্যক্রম প্রায়ই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে আটকে গেছে। আর অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে খসড়া মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ প্রণয়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতার অভিযোগ উঠেছিল। অনেক মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সংগঠনের মতে, খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। ফলে নাগরিক পর্যায়ের বহু সুপারিশ বর্তমান ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’–এর কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়নি। এই বাস্তবতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে, মানবাধিকার কমিশন কি সত্যিই নাগরিকদের প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর আরেকটি সম্প্রসারণ?

সামনে কী হতে পারে

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানবাধিকার প্রশ্নটি এক নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে বিটিভিতে দেওয়া বক্তব্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কেউ যেন কখনো মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়, এটি নিশ্চিত করতে হবে।’ এমনকি বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতারাও ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের কথা বলেছেন। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো একটি কার্যকর, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।

১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, বিগত সময়কালে জারি হওয়া প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশ ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উত্থাপন ও অনুমোদন করতে হবে। অন্যথায় সেগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে অধ্যাদেশগুলো যাচাই–বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে এবং কমিটিকে ২ এপ্রিল ২০২৬–এর মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ফলে সময় অত্যন্ত সীমিত। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি এখন কেবল আইনটি কতটা নিখুঁত—সেটি নয়; বরং এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না। এই বাস্তবতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি সম্ভাবনা সামনে আসে।

এক. সংসদ অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থাতেই অনুমোদন দিতে পারে। এতে আইনটির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে ও বিদ্যমান কমিশনের আইনি ভিত্তি অক্ষুণ্ন থাকবে। তবে এর সঙ্গে খসড়ায় থাকা কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও বহাল থাকার ঝুঁকি থাকবে, যা পরে সংশোধনের প্রয়োজন হবে।

দুই. বাছাই কমিটির মতামতের ভিত্তিতে সংশোধনসহ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করা হতে পারে। এতে কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করার সুযোগ তৈরি হবে, যদিও সব গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রতিফলিত না–ও হতে পারে।

তিন. অধ্যাদেশটি অনুমোদন না দিয়ে এর কার্যকারিতা শেষ হয়ে যেতে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন করে আইন প্রণয়নের সুযোগ তৈরি হলেও মানবাধিকার কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা আবারও অনিশ্চয়তায় পড়বে।

এই তিনটি পথের মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে—মানবাধিকার প্রশ্নে সরকার কেবল প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব পরিবর্তনের পথে এগোবে? সংসদ কি সত্যিই অধ্যাদেশটি অনুমোদন দিয়ে মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ওপর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হবে? তবে অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত হলেও একে কার্যকর করার জন্য নাগরিক আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে।

  • দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
  • শৌর্য তালুকদার জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী, সিপিডি

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.