Tuesday, March 31, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে শুধু উৎপাদন নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছ ঋণব্যবস্থা ও জবাবদিহি – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in নয়া দিগন্ত on 31 March 2026

খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে বন্ধ শিল্প চালুর নতুন চিন্তা

দেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের চাপ এবং উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার উদ্যোগকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে খেলাপি ঋণে ডুবতে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমানোর কৌশল হিসেবে এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে রুগ্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। এতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি পুরনো শ্রমিকদের বহাল রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ পড়ে থাকা শিল্পগুলো চালু করা গেলে এক দিকে যেমন উৎপাদন বাড়বে, অন্য দিকে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়- এই ঋণের বড় একটি অংশ শিল্প খাতে বিতরণ করা হয়েছে, যার প্রায় ৩০ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ায় ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান আবার সচল না করলে খেলাপি ঋণ কমানো কঠিন হয়ে পড়বে। এই বাস্তবতায় বন্ধ শিল্প চালুর উদ্যোগকে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তারা।

এ দিকে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কমিটি বন্ধ শিল্পগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাই করছে। তবে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ, মালিকানা কাঠামো এবং বিনিয়োগের ধরন এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বাংলাদেশের নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএ-এর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে অনেক কারখানা শুধু আর্থিক সঙ্কটে নয়, বাজার সঙ্কট ও উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণেও বন্ধ হয়েছে। এগুলো সমাধান না করলে পুনরায় চালু করলেও টেকসই হবে না বলে তিনি মনে করেন।বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ

তিনি বলেন, করোনাকাল এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অনেক উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের জন্য সহজ শর্তে পুনঃতফসিল, স্বল্পসুদে ঋণ এবং নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। একই সাথে সরকার যদি বন্ধ শিল্পগুলো বেসরকারি খাতের হাতে তুলে দিতে চায়, তাহলে মালিকানা কাঠামো, দায়দেনা এবং ব্যাংকঋণের বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্ধ শিল্প চালু করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে ব্যবসায়ী মহল বলছে, বাস্তবসম্মত নীতি, আর্থিক সহায়তা এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ছাড়া এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

তিনি বলেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতিমালা ও প্রণোদনা। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সঙ্কট এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধান ছাড়া শিল্প চালু করা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে খেলাপি শিল্পঋণকে ‘অ্যাসেট রিকভারি’ বা সম্পদ পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে দেখা। অর্থাৎ যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে আছে, সেগুলো চালু করতে পারলে উৎপাদন ও আয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ তৈরি হবে। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রও উন্মুক্ত হবে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতির ঝুঁকিতে পড়ছে। ফলে কিছু ব্যাংক টিকে থাকতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু পুনরায় উৎপাদন শুরু করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনা এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে এক দিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে চাইছে, অন্য দিকে খেলাপি ঋণের চাপ কমিয়ে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। তবে এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন কৌশল এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের ওপর বলে তারা মনে করেন।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.