Originally posted in নয়া দিগন্ত on 3 April 2026
বেসরকারি খাতে ঋণ সঙ্কোচন
দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে সঙ্কোচন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত ধীরগতিতে চলছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ল্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। নভেম্বরেও এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ, অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে ঋণপ্রবাহ নি¤œমুখী।
তথ্যে দেখা যায়, ঋণের পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে এক লাখ দুই হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা, কিন্তু প্রবৃদ্ধির হার রেকর্ড নি¤েœ নেমে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ সুদহার ঋণ সঙ্কোচনের অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে অনেক েেত্র ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়েছে ঋণের খরচে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের তারল্য সঙ্কট এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ঋণ বিতরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত করছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, বর্তমানে ঋণের সুদহার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, উচ্চ সুদহারে ব্যাংকঋণ নিয়ে কোনো শিল্প প্রকল্প লাভজনক করা কঠিন। এতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না, বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সঙ্কট ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পাচ্ছেন না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ঝুঁকি নিতে চাইছে না ব্যাংকগুলো। তিনি বলেন, ডলার সঙ্কট ঋণ সঙ্কোচনের অন্যতম বড় কারণ। ডলারের দাম ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন বলে তিনি মনে করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সঙ্কটও ঋণচাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ কমে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান সমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। জ্বালানি সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ফলে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গ্যাসসঙ্কটের কারণে উৎপাদনশীলতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তাও ঋণ সঙ্কোচনের বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে অনেকেই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছেন। ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেয়ার েেত্র সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, ঋণ সঙ্কোচনের প্রভাব ইতোমধ্যে কর্মসংস্থানে পড়তে শুরু করেছে। দেশে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে আসে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় এক লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ জন শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে বিনিয়োগও কমে যায়, যা সরাসরি প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে। ইতোমধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে এসেছে প্রায় ২২ শতাংশে, যা এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, ঋণ সঙ্কোচনের এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতি ভোগনির্ভর হয়ে পড়বে এবং উৎপাদনশীল খাত তিগ্রস্ত হবে। এতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দ্রুত কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ সঙ্কোচন আরো গভীর হতে পারে, যা দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে তিনি মনে করেন।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা সরকারের কাছে সুদহার কমানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।


