Tuesday, April 7, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

জ্বালানি সাশ্রয় ও ব্যবসার ভারসাম্য রক্ষায় পরীক্ষামূলক পদ্ধতি দেখা যেতে পারে – ড. মোয়াজ্জেম

Originally posted in প্রথম আলো on 6 April 2026

সন্ধ্যায় দোকান বন্ধে বিক্রি কমে গেছে, ব্যবসায়ীদের বিকল্প প্রস্তাব

দোকান, শপিং মল সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যবসায়ীরা চান বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় তিন দিন ধরে দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যায় বন্ধ হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় বেচাকেনার সময়সীমা দু-তিন ঘণ্টা পর্যন্ত কমেছে। এতে তৈরি পোশাক, জুতা, গৃহস্থালিসহ অন্যান্য পণ্যের বড় ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকে নেমেছে।

কয়েকটি তৈরি পোশাক, জুতা ও জুয়েলারি ব্র্যান্ডের স্বত্বাধিকারীরা প্রথম আলোকে বলেন, সাধারণত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যে বিক্রি হয়, তার প্রায় ৪০ শতাংশ হয় সন্ধ্যা পর্যন্ত। আর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত হয় বাকি ৬০ শতাংশ। ফলে সন্ধ্যায় দোকানপাট ও শপিং মল বন্ধ হওয়ায় বিক্রি স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসায়ীদের বড় অংশই কর্মীদের বেতন-ভাতা ও দোকান ভাড়াই দিতে হিমশিম খাবে। এ ছাড়া বিক্রি কমায় ভ্যাট বাবদ সরকারের রাজস্বও কমে যাবে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে এই ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সকালে দোকানপাট ও বিপণিবিতানে দু-তিন ঘণ্টা ক্রেতা সমাগম থাকে না। তাই দোকানপাট বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চালু থাকতে পারে। এতে দিনের একটা সময় বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, সরকারি রাজস্ব ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সীমা এক ঘণ্টা কমানো হয়। একই সঙ্গে দোকানপাট ও শপিং মল (বিপণিবিতান) সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়, যা শুক্রবার কার্যকর হয়। অবশ্য গতকাল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা ছয়টার পরিবর্তে সাতটা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।

দোকান খোলা রাখার সময় এক ঘণ্টা বাড়লেও খুব বেশি উপকার হবে না—এমনটাই বললেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদের বক্তব্য, ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অফিস শেষ করে কেনাকাটা করতে আসে। অফিস আর দোকানপাট বন্ধের সময়ের ব্যবধান এখন দুই ঘণ্টা থেকে বেড়ে তিন ঘণ্টা হওয়ায় খুব বেশি লাভ হবে না। সময় আরও দুই ঘণ্টা বাড়ানো উচিত।

জানতে চাইলে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা প্রয়োজন, যা একদিকে শক্তি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে না। এ ক্ষেত্রে ভালো বিকল্প হচ্ছে, বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিং মল খোলা রাখা। এ জন্য প্রয়োজনে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’

দোকান মালিক ব্যবসায়ী সমিতির তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৭০ লাখ দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও অনেক ছোট–বড় শিল্পকারখানা। সব মিলিয়ে কয়েক কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খুচরা বিক্রির খাতটির সঙ্গে জড়িত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপিতে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায় অবদান ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ।

দোকান বন্ধ হচ্ছে, খোলাও থাকছে

দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধের সিদ্ধান্তটি শুক্রবার কার্যকর হলেও সেদিন অনেকেই তা মানেননি। পৌনে সাতটার দিকে ঢাকার নিউমার্কেটের দোকানদারদের ব্যবসা করতে দেখা যায়। রাত প্রায় আটটায় নিউমার্কেট বন্ধ হয়।

জানতে চাইলে নিউমার্কেটে সিরাজ জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত শুক্র ও শনিবার আমাদের প্রতিষ্ঠানসহ আশপাশের ৮-১০টি জুয়েলারির বিক্রি ছিল প্রায় শূন্য। আসলে অফিস ছুটির পর কেনাকাটার জন্য চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগবে। না হলে বেচাবিক্রিতে গতি আসবে না।’

শনিবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির জিগাতলা এলাকায় দেখা যায়, সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। তখন বিভিন্ন দোকানে পণ্য কিনতে আসা অনেক ক্রেতা ফিরে যান। রাত নয়টার দিকে এলিফ্যান্টের রোডের কয়েকটি সিরামিক ও তৈরি পোশাকের দোকান খোলা দেখা যায়। যদিও ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল কম।

তৈরি পোশাকের ব্র্যান্ড সারা লাইফস্টাইল বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ১৭। গত শুক্র ও শনিবার তাদের বিক্রি কমেছে প্রায় অর্ধেক। বিষয়টি নিশ্চিত করে সারা লাইফস্টাইলের মূল প্রতিষ্ঠান স্নোটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, অফিস থেকে ফেরার পথে কিংবা বাড়ি ফিরে পরিবার নিয়ে অনেকে কেনাকাটায় বের হন। বিধিনিষেধের কারণে সেই সুযোগ সীমিত হয়েছে। বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকলে খুব সুবিধা হয়।

বিক্রির সঙ্গে যুক্ত অনেক কিছু

দেশের অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি পোশাক, জুতা, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যে ব্র্যান্ড গড়ে উঠছে। সেসব ব্র্যান্ডের ব্যবসাও বাড়ছে। বর্তমানে ৮৪ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। ব্র্যান্ডের বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সরকার ভ্যাটের একটি বড় অংশ পায় বলে জানালেন একাধিক ব্যবসায়ী।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, জাতীয় গ্রিডের মাত্র ৮-১০ শতাংশ বিদ্যুৎ অফিস, হাসপাতাল ও খুচরা বিক্রির মতো বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহার হয়। তার মধ্যে খুচরা পণ্য বিক্রির দোকানে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় মাত্র ২–৩ শতাংশ। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের এই সীমিত সুবিধা নিতে গিয়ে দোকানপাট সন্ধ্যায় বন্ধ করলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস ও সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়ার পাশাপাশি খুচরা বিক্রির পুরো সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে লিফট ব্যবহার সীমিত করা, অপ্রয়োজনীয় বাতি অর্ধেক কমানো, বিদ্যুৎ–সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

ফ্যাশন হাউসমালিকদের সংগঠন ফ্যাশন উদ্যোগের সভাপতি আজহারুল হক আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, অফিস সময়ে দোকানপাট চালু রাখলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে না। গরমে দিনের বেলা ক্রেতারা সাধারণত বের হন না। সব মিলিয়ে বিক্রি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বেতন–ভাতা, দোকানভাড়ার মতো খরচ মেটানো সম্ভব হবে না। তাই ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রেখে অর্থনীতি সচল রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞের মতামত

জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য দোকানপাট খোলার রাখার সময় কমানোর কারণে ব্যবসায় চাপ বাড়বে। তবে ব্যবসার চাপ ন্যূনতম রেখে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বসতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে এক সপ্তাহ দেখা যেতে পারে, বর্তমান সময়সীমায় কতটুকু বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। পরের সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী বেলা ১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিং মল খোলা রেখে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। তারপর যেটি কার্যকর, সেটি সরকার চূড়ান্ত করতে পারে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.