Wednesday, April 8, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

জ্বালানি সংকট তীব্র হলে থমকে যেতে পারে শিল্প ও অর্থনীতি – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in রুপালী বাংলাদেশ on 8 April 2026

জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে দেশ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে তেল-গ্যাসের দাম। এর প্রভাবে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশও পড়েছে তীব্র চাপে। সরকার ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় স্পট মার্কেটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর সব চেষ্টাই করেছে। তার পরও সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। গত মার্চ মাসে শুধু জ্বালানি তেল আমদানিতেই সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি মাসেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এবার ভর্তুকি কমাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি ও পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এই মুহূর্তে জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনগণকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার মতো হবে বলেও মত তাদের।

সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট কৃষি, শিল্প, যানবাহনসহ বিদ্যুৎ খাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেচ মৌসুম চললেও তেলের অভাবে চলছে না পাম্প। ঘুরছে না শিল্পকারখানার কোনো চাকা। দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে বিমানে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম। ফলে দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে বিমানের টিকিট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমায় দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের তীব্রতাও। ইরান সরকার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের কোনো জাহাজ পার হতে পারেনি। ফলে কাঁচামালের সংকটে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিও বন্ধের পথে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে প্রথমেই পরিবহন খরচ বেড়ে যায়। এরপর শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ এবং সরবরাহব্যবস্থায় ব্যয় বাড়ে। ফলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে শুরু করে। এর প্রভাব সরাসরি খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়ে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়ে। মোটাদাগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। পরিবহন ভাড়া বাড়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, বাসাভাড়া ও অন্যান্য সেবার খরচও বাড়ে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে আসে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তাদের আয় স্থির থাকলেও ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রদূত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জন্য খুলছে হরমুজ প্রণালি। এর ফলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেছিলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাটতে যাচ্ছে দেশের জ্বালানির সংকট। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের কোনো তেলবাহী বা তেলের সরঞ্জামবাহী জাহাজ পার হয়নি। কবে নাগাদ পারাপার চালু হবে, তা-ও জানেন না কেউ। এমন পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকে কিনে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে সরকার, যা কিনতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। ফলে সরকারের কাছে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই আপাতত। আর তা স্পষ্ট হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্যে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার কাজ করছে। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আমাদের একটি আইন রয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী প্রতি মাসে দামের সমন্বয় করা হয়। গত মাসে সমন্বয় করা হলেও আমরা দাম বাড়াইনি। আগামী মাসের দাম নির্ধারণ নিয়ে কাজ চলছে। সমন্বয়ের পর যদি দেখা যায় দাম বাড়ানো প্রয়োজন, তাহলে তা আলোচনা করে কেবিনেটে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তার এই বক্তব্যের পরপরই জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে নাভিশ্বাস উঠেছে জনজীবনে। এমন পরিস্থিতিতে যদি জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়, তাহলে পণ্য পরিবহন ব্যয় হু হু করে করে বেড়ে যাবে। ফলে বাড়বে সব ধরনের পণ্যের দাম। তবে দেশের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ সচল রাখতে হলে সরকারকে গত মাসের মতোই ভর্তুকি বজায় রেখে হলেও স্পট মার্কেট থেকে তেল কিনতে হবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে, বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। কারণ এটি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক বা গণপরিবহনে বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে পেট্রোল-অকটেনের দাম বাড়লেও এর মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। তাই আমি মনে করি, অন্তত আরও এক মাস জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো উচিত হবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোষাগার থেকে বাড়তি অর্থ ব্যয় হলে পরবর্তীতে কীভাবে তা পোষাবে জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রিজার্ভে তো একটা প্রভাব পড়বেই। গত মাসে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। এ মাসেও এমন পরিমাণ ভর্তুকিই দিতে হবে। তবু দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের কাছে আপাতত কোনো বিকল্প নেই বলে আমি মনে করি।’

এদিকে জ্বালানির সংকটে দেশের সব শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কারখানা। বিশেষ করে ডিজেলচালিত কারখানাগুলো একেবারেই বন্ধ রয়েছে জানিয়ে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে আমাদের এখন বিদেশি অনেক ক্রেতার ক্রয়াদেশ বাতিল করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, যেসব ক্রয়াদেশ আগে নেওয়া ছিল, সেগুলোও শিপমেন্ট করতে পারছি না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে রেশনিং করে আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের কারখানা মালিকদের পথে বসতে হবে।’ একই কথা বলেন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিগত কয়েক বছর যাবৎই নানা ইস্যুতে ধুঁকছে পোশাক খাত। এভাবে আর এক মাস চললে অনেক কারখানা মালিককেই চরম খেসারত দিতে হবে।

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু কার্যত তা বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ পাচ্ছেন না তারা। আর পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি আনতেও অনেক সময় লাগছে। শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে তাই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর, বিশেষ করে এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলের ওপর বাংলাদেশের উচ্চ নির্ভরতা অর্থনীতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে ইরানকে ঘিরে সংঘাত দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বর্তমানে ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এখন যদি জ্বালানির সংকটে পোশাক কারখানার চাকা থেমে যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতির চাকাও স্থবির হয়ে যাবে। তাই সরকারকে এ বিষয়ে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন ডিজেল মজুত আছে। আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে। অকটেন মজুত আছে ১০ হাজার ৫০০ টন। ৭১ হাজার ৫৪৩ টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে। পেট্রোল ১৬ হাজার টন মজুত আছে। আরও ৩৬ হাজার টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টন। সেই হিসাবে দেশে অকটেনের মজুত রয়েছে ৭ থেকে ৮ দিনের। আর পেট্রোল মজুতের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিদিন গড় বিক্রি প্রায় দেড় হাজার টন। বিক্রি বিবেচনায় দেশে পেট্রোলের মজুত রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিনের। আর ডিজেলের চাহিদা দৈনিক গড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার মেট্রিক টন, যা মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ। সেই হিসাবে মজুত ডিজেল দিয়ে বড়জোর ১৫ থেকে ২০ দিন চালানো সম্ভব হবে। এমন পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকে আমদানি বাড়ানোর বিকল্প দেখছে না সরকার। আর বাড়তি দাম দিয়ে কিনে দেশের অভ্যন্তরে কম দামে বিক্রি করলে সরকারের কোষাগারে আর কিছুই থাকবে না দাবি করে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা গত মাসে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছি। চলতি এপ্রিল মাস এবং আগামী মে মাসের আমদানির জন্য আমরা বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছি। পরিকল্পনা অনুযায়ী এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। আর মে মাসে ১৭টি জাহাজে সাড়ে ৩ লাখ টন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি আসার সূচি ঠিক করা হয়েছে। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চূড়ান্ত মত দেয়নি। এগুলো কিনতে তো দ্বিগুণ অর্থ খরচ হবে, তাই দাম বাড়ানোর একটা পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, জনদুর্ভোগ যাতে না বাড়ে তা মাথায় রেখেই করা হবে।’

তবে এই মুহূর্তে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানো মানে জনগণকে ক্রসফায়ারে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত হবে উল্লেখ করে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তরিতরকারি, ফলমূল কিনতে গেলে এখনই হাত পুড়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে যদি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়, তাহলে পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে, যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। এ সিদ্ধান্ত এখন নেওয়া মানে জনগণকে ক্রসফায়ারে দেওয়া।

এদিকে জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে কৃষি খাতও। এখন ভরা সেচ মৌসুম। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সেচ মৌসুমে কৃষকদের ডিজেল পাওয়া নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা এখনো কৃষকদের হাতে গিয়ে পৌঁছায়নি। আর কার্ড পেলেই কী? যদি ডিজেলের সরবরাহই না থাকে, তাহলে কার্ড দিয়ে কী করব জানতে চেয়ে হবিগঞ্জের বাহুবল এলাকার কৃষক প্রদীপ দাস বলেন, ‘চৈত্রের খাঁ-খাঁ রোদে মাঠ ফেটে চৌচির। কিন্তু ডিজেলের অভাবে পাম্প চালিয়ে জমিতে পানি দিতে পারছি না। আমার এলাকার সব কৃষকের একই অবস্থা। শুধু হবিগঞ্জ নয়; উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ, পূর্ববঙ্গসহ সব প্রান্তিক এলাকার কৃষকদের অবস্থা একই রকম। ডিজেলের অভাবে কেউই জমিতে একফোঁটা পানি দিতে পারছেন না। ফলে সামনের দিনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী কৃষিপণ্য সরবরাহও বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ইতোমধ্যে কয়েক দফায় বিমানে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এপ্রিল মাসের জন্য নতুন করে জেট ফুয়েলের দাম আবারও বাড়ায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এপ্রিল মাসের জন্য প্রতি লিটার তেলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার তেলের দাম ১ দশমিক ৩২১৬ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৪৮০৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়। এর আগে গত মার্চ মাসে এক ধাপে জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশ বাড়ানো হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি লিটার তেলের দাম ছিল ১১২ টাকা ৪১ পয়সা, যা মার্চ মাসে ২০২ টাকা ২৯ পয়সায় নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ফুয়েলের দাম শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়। এতে করে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিমানেও চলাচল করছেন না কেউ। জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীর সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে দাবি করে ইউএস-বাংলার জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলে বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের দাম কয়েক দফায় বাড়িয়েছে সরকার। ফলে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটে তীব্র প্রভাব পড়েছে। একটি এয়ারলাইন্সের যেকোনো রুটের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় জেট ফুয়েলে। এই বাড়তি ব্যয় এখন অ্যাভিয়েশন ব্যবসায় চরম সংকট তৈরি করেছে।

এত সব কিছুর মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি তীব্র হচ্ছে, তা হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি। সরবরাহ কমে যাওয়ায় তেল-গ্যাসভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এদিকে চৈত্রের দাবদাহে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে বিতরণ সংস্থাগুলো। ফলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। বিশেষ করে পল্লি অঞ্চলে ঘণ্টায় ঘণ্টায় হচ্ছে লোডশেডিং। তবে পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এখনো আমরা সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারছি। কদিন পর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা বলতে পারছি না।’

এদিকে এক লিটার তেল পেতে রাজধানীসহ সারা দেশের পাম্পগুলোতে যানবাহন মালিকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুর্ভোগ পোহানো তো অব্যাহতই রয়েছে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.