Originally posted in দৈনিক ইত্তেফাক on 17 April 2026
অর্থনীতির চাপ সামলাতে চাই অগ্রাধিকার নির্ধারণ
বিএনপির নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপে রয়েছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই কর্মসংস্থানে ধীরগতি, বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানির সংকট পুরো অর্থনৈতিক কার্যক্রকমে স্থবিরতায় ফেলেছে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বৈশ্বিকসংকট এই স্থবিরতাকে সংকটে রূপান্তর করছে। বিগত করোনা মহামারির পরে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ছিল, প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
তবে প্রথমে কোভিড এবং পরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি শুরুতে বিপাকে পড়লেও পরে বেশির ভাগ দেশই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এগিয়েছে খুবই ধীরে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বের সব অঞ্চলেই পড়েছে। বাংলাদেশেও এর বাইরে নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো একসঙ্গে চলা একাধিক সমস্যার মধ্যে কোনটিকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নাকি জ্বালানি খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা। প্রতিটি সমস্যাই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার সময়। তবে সংকট উত্তরণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।
অবশ্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে অর্থনীতির গভীর ক্ষতগুলো তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক। সুশাসন, সংস্কার ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
চলমান বৈশ্বিকসংকটের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হওয়ার বিকল্প নেই। এই সংকটটি নতুন সরকারের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি জিনিস সরকারকে অতিরিক্ত অর্থে ক্রয় করতে হচ্ছে। আগে যে জ্বালানি তেল ৭০ ডলার ছিল সেটি এখন ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের চেষ্টার ত্রুটি নেই। কিছু ভালো পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে; যেমন রিজার্ভে হাত না দিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহিবল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে চাপ সামলানোর চেষ্টা করছে। তবে এটি আবার লম্বা সময়ের জন্য ভালো না। সেজন্য সরকারকে মধ্যে মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারকে আরো সতর্ক হতে হবে যেন বাড়তি ব্যয় না হয়।
আইসিবির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের প্রভাব এখন সারা বিশ্বে। জ্বালানির প্রভাবে বিভিন্ন খাতের যে সংকট চলছে তা থেকে উত্তরণে কোনো ম্যাজিক ফর্মূলা নেই। যা দরকার তা হলো জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় সাশ্রয় করা। সরকারি ইতিমধ্যে ব্যয় কমানো চেষ্টা করছে। একইভাবে যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হবে সেগুলো থেকেও বাড়তি ব্যয় না করে সাশ্রয়ী হতে হবে। তা নাহলে সামনে চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে :এক সময় দ্রুত দারিদ্র্য হার কমানোয় বাংলাদেশকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত উল্লেখ করলেও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো এখন দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছে। চলমান পরিস্থিতিতে দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ করেছিল ২০২২ সালে, তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এখন ২১.২ শতাংশ, এই হিসাবে এখন দেশে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫ সালে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবেন। তবে যুদ্ধের কারণে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৫ লাখে নেমে আসতে পারে। ফলে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে না পেরে দরিদ্র হিসেবেই থেকে যাবেন।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে: মূল্যস্ফীতির ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে গত মার্চে দেশে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৯ শতাংশ। অন্যদিকে, ঐ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ। অর্থাত্, মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার পিছিয়ে রয়েছে। মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলে সাধারণত তারা কম খরচ করে এবং সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে ব্যবসা ও শিল্পে এর প্রভাব পড়ে। এতে উত্পাদন হ্রাস পায়, নতুন বিনিয়োগও শ্লথ হয়।
টানা আট মাস ধরে সুখবর নেই রপ্তানি আয়ে: দেশের পণ্য রপ্তানি টানা অষ্টম মাসের মতো নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪.৮৫ শতাংশ কমে ৩৫.৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৩৭.১৯ বিলিয়ন ডলার। এ নিয়ে টানা আট মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। এদিকে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। রপ্তানিকারকেরা জানান, দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা, ক্রেতাদের কম অর্ডার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি কমছে। তবে রেমিট্যান্স আশা জাগালেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। গেল মাসে প্রায় পৌণে ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। তবে রেমিট্যান্সের মূল উত্স মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে এই রেমিট্যান্স ধরে রাখা যাবে কি না সে সংশয় রয়েগেছে।
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জ্বালানিসংকট: ইরান যুদ্ধ সারা বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। যত দিন যাচ্ছে, বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তত তীব্র হচ্ছে। আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ একে আরো জটিল করে তুলছে। জ্বালানিসংকটে তৈরি পোশাকশিল্পের উত্পাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উত্পাদন। অন্যদিকে, সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ায় ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য জাহাজিকরণ সম্ভব হচ্ছে না। আবার জ্বালানিসংকটের কারণে কাঁচামালের দাম ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উত্পাদন ব্যয় বাড়ছে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসেবে শুধু তৈরি পোশাক শিল্প খাতে গড়ে উত্পাদন সক্ষমতা কমেছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। তাদের হিসেবে চাহিদামতো গ্যাস ও বিদ্যুত্ না পাওয়ার কারণে বর্তমানে কারখানাগুলোতে উত্পাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে। লোডশেডিংয়ের বিপরীতে জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উত্পাদন ও পণ্য শিপমেন্ট ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচামালের দাম ও পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উত্পাদন ব্যয়ও বেড়ে সংকটকে আরো প্রকট করে তুলেছে।
অর্থনীতির অগ্রাধিকার কোন পথে: জাতীয় সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতার বাইরে নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে, সরকারকে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেট ও রিজার্ভ—দুটির ওপরই চাপ তৈরি করবে। সরকার এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুত্ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে পরামর্শ দেওয়াসহ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে অর্থনীতিবদরা এই সংকট মোকাবিলায় অগ্রাধিকার নির্ধারণের পরামর্শ দিচ্ছেন। মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা গ্রহণ করে এই পরিস্থিতি উত্তরণের পরামর্শ দিচ্ছেন।


