Sunday, May 3, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Khondaker Golam Moazzem

জ্বালানিবিষয়ক সংসদীয় কমিটির জন্য বিবেচ্য প্রস্তাব – খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

Originally posted in Samakal on 3 May 2026

জ্বালানি সংকট নিরসনে গঠিত সংসদীয় কমিটির প্রথম বৈঠক আজ রোববার (৩ মে) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ উদ্যোগ গ্রহণ এবং সমর্থনের জন্য সরকারি দল ও বিরোধী দলকে বিশেষ ধন্যবাদ। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে জ্বালানি সংকট আপাতত প্রশমিত হলেও তা নিরসন বহু দূরের পথ। আশা করছি, সংসদীয় বিশেষ কমিটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য শুধু জরুরি বা স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নয়; মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও সুপারিশ করবে। পরবর্তীকালে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পর্যবেক্ষণ করবে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের মূল কারণ আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং জ্বালানি বহুমুখীকরণের ব্যর্থতা। দেখা গেছে, জ্বালানি বহুমুখীকরণ করা উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশগুলোই এ সংকট ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পেরেছে।

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর অর্থনীতিতে ফাটল ধরিয়েছে এবং যুদ্ধের এক অমীমাংসিত বাস্তবতায় পড়েছে পৃথিবী। যার ফলে এ যুদ্ধ সাময়িক থামলেও আগামী দশকগুলোতে এ যুদ্ধ ফিরে ফিরে আসবে। এর অর্থ হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা এক ধরনের স্থায়ী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

দেশে বিভিন্ন লবিস্ট গ্রুপ নিজেদের ব্যবসা ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সরকারকে নানা ধরনের চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থের কারণে দেশে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি রূপান্তরের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কমে যেতে পারে। যে কোনো সুপারিশ করার ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটির এ বিষয়ে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।

সুপারিশমালা

১. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা: বর্তমানে জ্বালানি আমদানি থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত পাঁচ-সাত ধাপে জ্বালানি বিতরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি বেরিয়ে এসেছে। প্রতিটি ধাপে সার্বক্ষণিক ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভারত ও পাকিস্তান ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহারে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

২. জ্বালানি আমদানিতে বর্ধিত ব্যয়ের বরাদ্দ রাখা: বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল হয়ে ইরান যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থায় যেতে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে, যদি এখনই যুদ্ধ থামে। সে জন্য আগামী অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে অন্তত ৫০ শতাংশ বেশি বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। এই বর্ধিত অর্থ পেতে উচ্চ সুদে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ না নিয়ে স্বল্প সুদে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ঋণ নেওয়া যেতে পারে।

৩. জরুরি ভিত্তিতে অনুসন্ধানে পাওয়া গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা: ভোলার গ্যাস জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হবে। সেখানে নতুন অনুসন্ধানকে বেগবান করে গ্যাস কূপ খননকে অগ্রাধিকার দিয়ে পেট্রোবাংলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা প্রয়োজন।
নাইকো মামলার সমাপ্তির কারণে টেংরাটিলা ক্ষেত্র থেকে নতুন করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নিতে বঙ্গোপসাগরের ২৩টি গ্যাস ব্লকের জন্য সংশোধিত নতুন টেন্ডার আহ্বান করা যেতে পারে।

৪. এলএনজিভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ স্থগিত রাখা: সরকারের বর্তমান জ্বালানি ব্যয় মেটানোর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি। এতে সরকারের স্থায়ী উচ্চ ব্যয় হচ্ছে। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো দীর্ঘ মেয়াদে দায় সৃষ্টি করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এর চেয়ে সহজপ্রাপ্য ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। সে জন্য সংসদীয় কমিটি এলএনজি আমদানি ও এলএনজি প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামো নির্মাণে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

৫. ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণের প্রয়োজন নেই: ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান অবকাঠামোর আধুনিকায়নই ভবিষ্যতের জন্য যথেষ্ট। এটি সম্প্রসারণ করে কৌশলগত রিজার্ভ বৃদ্ধির যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তা দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা বাড়াবে।

৬. ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে কৃষিতে সৌর পাম্প বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া: ডিজেলচালিত সেচ পাম্পগুলোকে সহজেই সৌরচালিত সেচ পাম্পে রূপান্তর করা সম্ভব। এভাবে ১২-১৩ শতাংশ ডিজেল সাশ্রয় করে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানি কমানো সম্ভব।

৭. ডিজেলের পরিবর্তে ইভিচালিত যানবাহন চালু করা: দেশে ব্যবহৃত ডিজেলের ৬৬ শতাংশ যানবাহনে ব্যবহৃত হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ যানবাহন ইলেকট্রিক বাহনে রূপান্তর করতে পারলে সরকারের আট লাখ ৩০ হাজার টন ডিজেল সাশ্রয় হবে। ইভিচালিত সব যানের ওপর শুল্ক কমানো দরকার।

৮. ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা জরুরি: সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এ লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন তিন হাজার মেগাওয়াটের জাতীয় রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা; পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের টেন্ডার কাজ শেষ করে বেসরকারি খাতকে দ্রুত তা বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার সুপারিশ করা যেতে পারে। আগামী বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট সকল যন্ত্রপাতি, কাঁচামালের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা দরকার। ৩১টি লেটার অব ইনটেন্ট (ইচ্ছাপত্র) পুনর্বিবেচনার সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে এ ক্ষেত্রে নতুন ঘোষিত পাওয়ার পার্চেজ এগ্রিমেন্টের (পিপিএ) ‘গ্যারান্টি ক্লজ’-এর বিকল্প হিসেবে অন্য গ্রহণযোগ্য শর্ত যুক্ত করা যায়।

৯. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে নিষ্কণ্টক জমির প্রাপ্ততা, নেট মিটারিং নিশ্চিত করা: পিপিপির (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) আওতায় জমির সরবরাহ এবং নেট মিটারিংয়ে দুর্নীতি কমিয়ে দ্রুত ও সহজ পারমিশন নিশ্চিতের পাশাপাশি সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি-স্রেডাকে শক্তিশালী করা।

১০. বিদেশি বিনিয়োগ নবায়নযোগ্য খাতে ত্বরান্বিত করা: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত এবং সকল সেবা অনলাইনভিত্তিক করার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা যায়। এ জন্য বিডা, বিপিডিবি, বেজা, বেপজা, রাজউক, পেট্রোবাংলা, পরিবেশ অধিদপ্তর, এফএসআরইউ, সিটি করপোরেশন ইত্যাদি অফিসকে নির্দেশনা দেওয়া যায়। বায়ুবিদ্যুতে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে স্রেডায় আলাদা উইং চালুর সঙ্গে আলাদা নীতি কাঠামো প্রস্তুত করা প্রয়োজন।

১১. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জ্বালানি রূপান্তরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া: নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌর, বায়ু, জল, বর্জ্যের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও বিদ্যুতায়নকে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। আঞ্চলিক বাজার বিশেষ করে নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আমদানি করা যেতে পারে। কয়লা উত্তোলন এবং নতুন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন না করা বাঞ্ছনীয়।
পরিশেষে সরকারের কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারকের জন্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের স্থায়ী কমিটি শক্তিশালী করা দরকার। এ কমিটিতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিজস্ব ব্যয় থেকে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার সুপারিশ আসতে পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করার ওপর কমিটি গুরুত্ব দিতে পারে।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষণা পরিচালক, সিপিডি

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.