Tuesday, May 5, 2026
spot_img
Home Op-eds and Interviews Mustafizur Rahman

নির্বাচনের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা যৌক্তিক ছিল না – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in Dhaka Stream on 5 May 2026

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে গতকাল (সোমবার) হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তিটি নিয়ে আগে থেকেই নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা চলছিল। প্রথমত, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী চুক্তি স্বাক্ষর করা কোনোভাবেই যৌক্তিক হয়নি। একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য অন্তত আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করাটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। বিশেষ করে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশের পর অন্য কোনো দেশ যখন এ ধরনের চুক্তিতে জড়ায়নি, তখন বাংলাদেশের এমন তাড়াহুড়ো প্রশ্নের জন্ম দেয়।

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো চুক্তির চরম অসম শর্তসমূহ। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ শুল্কের বোঝা চাপবে। বিপরীতে, আমরা মাত্র ৩২৬টি পণ্য বাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব পণ্যের ওপর ক্রমান্বয়ে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিতে বাধ্য থাকব। প্রথম ধাপে সাড়ে চার হাজার এবং আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাকি সব মার্কিন পণ্য বিনা শুল্কে আমাদের বাজারে প্রবেশ করবে। যে ৩২৬টি পণ্যের ওপর শুল্ক বহাল থাকবে, সেগুলো বাংলাদেশ কার্যত আমদানিই করে না। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা একচেটিয়া শূন্য শুল্কের সুবিধা দিচ্ছি।

এছাড়া মার্কিন তুলা আমদানির শর্ত এবং এর হিসাব-নিকাশের বিষয়টিও অস্পষ্ট। আমরা যুক্তরাষ্ট্রে যে পোশাক রপ্তানি করি, তার পুরোটাই মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি নয়। ফলে আমাদের প্রচলিত রপ্তানি পণ্যগুলোর ওপর তারা কোনো শূন্য শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে না, বরং উল্টো অতিরিক্ত শুল্ক বসাচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই চুক্তিতে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও শঙ্কার জায়গা রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই চুক্তিতে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও শঙ্কার জায়গা রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। যেমন— পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নতুন রিঅ্যাক্টর আনতে, এমনকি রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কিনতেও মার্কিন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে! এটি সরাসরি দেশের স্বাধীন বাণিজ্য নীতির ওপর হস্তক্ষেপ।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, দেশে এখন নির্বাচিত সরকার ও কার্যকর সংসদ থাকা সত্ত্বেও প্রথম অধিবেশনে এই চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনাই হলো না। বিরোধী দলও এ বিষয়ে একেবারে কোনো কথা বললো না।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার— এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে অসম চুক্তি মানতে হবে। চুক্তিতে উল্লেখ আছে, নোটিফিকেশন বিনিময়ের ৬০ দিনের মধ্যে এটি কার্যকর হবে। তবে নোটিশ দিয়ে এটি বাতিলের সুযোগও চুক্তিতে রয়েছে। বাংলাদেশ সেই কূটনৈতিক সাহস দেখাতে পারবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

যেহেতু চুক্তিটি এখনো চূড়ান্তভাবে অনুসমর্থন (র‍্যাটিফিকেশন ) হয়নি, তাই দেশের জন্য ক্ষতিকর শর্তগুলো নিয়ে পুনরায় দরকষাকষির সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সরকারের উচিত অবিলম্বে সংসদে বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা করা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শর্তগুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.