Originally posted in কালেরকন্ঠ on 14 June 2026
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে যখন অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির, সৃষ্টির গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম, ব্যাংকিং খাত এখনো দুর্বল এবং জ্বালানি খাত নানা অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না, বৈদেশিক সহায়তা ছাড়ে বিলম্ব হচ্ছে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিয়ে জনসাধারণ, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ও আগ্রহ ছিল অনেক।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে এর আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ও ব্যয়ের লক্ষ্য, করনীতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।
রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামো: এবারের বাজেটে রাজস্ব আহরণের জন্য একটি উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কয়েক বছর ধরেই রাজস্ব বোর্ড ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের কম ছিল।
অন্যদিকে ব্যয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজনীয়। তবে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হলো, বরাদ্দ বৃদ্ধি সব সময় উন্নত ফল নিশ্চিত করে না। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল তদারকি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা প্রায়ই উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
তাই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা।
ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা: বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার আবারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করছে। এটি স্বল্প মেয়াদে সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন মেটাতে সহায়ক হলেও এর অর্থনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, সরকার ব্যাংক থেকে এত পরিমাণ ঋণ নিয়ে নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সুদের হারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তৃতীয়ত, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে ব্যাংকের অর্থ সরকারি ঋণে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যখন সরকার নিজেই বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে, তখন ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সেই লক্ষ্য অর্জনকে কঠিন করে তুলতে পারে।
বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্য: এবারের বাজেটে বৈদেশিক ঋণ আহরণের লক্ষ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, বাজেটে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই অর্থ পাওয়া যায় না। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত পূরণে ধীরগতির কারণে গত কয়েক বছরে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের হার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম ছিল। ফলে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন দক্ষতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অর্থ পাওয়া দিনে দিনে কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণ প্রদানকারী দেশগুলো অনেক বেশি কঠোর শর্ত জুড়ে দিতে পারে, যদি আমাদের ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাকে তারা সন্দেহ করে।
কর প্রস্তাব: বাজেটে কর প্রশাসনের ডিজিটাইজেশন, কর ফাঁকি রোধ এবং করকাঠামো সরলীকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনার কিছু জটিলতা কমানোর উদ্যোগও রয়েছে। উৎপাদনমুখী ও বিনিয়োগমুখী খাতগুলোকে সহায়তা দেওয়ার কিছু পদক্ষেপ দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। বিশেষ করে কর প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং করদাতা সেবার উন্নয়ন রাজস্ব সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
বাজেটের একটি আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎস কর বৃদ্ধি, যা মধ্যবিত্তের জন্য একটি নতুন চাপ হতে পারে। বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, পেনশনভোগী, বিধবা নারী এবং স্থায়ী আয়ের মানুষ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করেন। গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংক আমানতের প্রকৃত রিটার্ন কমে যাওয়ায় অনেকেই সঞ্চয়পত্রকে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এ অবস্থায় সঞ্চয়পত্রের ওপর কর বৃদ্ধি তাঁদের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেবে। ফলে মধ্যবিত্তের ওপর আর্থিক চাপ আরো বাড়তে পারে। রাজস্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা পৃথক করহার বিবেচনা করা যেত।
অন্যদিকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা আরো কিছুটা বাড়ানো হলে তা নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তিদায়ক হতে পারত। গত কয়েক বছরে খাদ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাস্তব অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে করমুক্ত আয়সীমা আরো কিছুটা বৃদ্ধি পেলে তা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা হতো।
বেসরকারি বিনিয়োগ: বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য শুধু কর সুবিধা বা প্রণোদনা যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্বেগ এখন জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, উচ্চ সুদের হার, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ভূমিপ্রাপ্তি, বন্দর দক্ষতা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২-২৩ শতাংশে আটকে আছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে বাস্তব সংস্কার, সুশাসন এবং নীতির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন আস্থা, যাতে টাকা খাটিয়ে তাঁরা তা লাভসহ ফেরত পান। দেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আস্থা পাবেন।
ব্লক বরাদ্দ বৃদ্ধি: এবারের বাজেটে ব্লক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলা বা বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ব্লক বরাদ্দ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ ধরনের বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্লক বরাদ্দের অর্থ কোথায়, কিভাবে এবং কোন মানদণ্ডে ব্যয় করা হবে সে বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, সংসদীয় নজরদারি এবং শক্তিশালী নিরীক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। অন্যথায় জনগণের মধ্যে জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষা ও পরিবার কার্ড : বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পরিবার কার্ড কর্মসূচি অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ।
সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পরিবার কার্ড নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দারিদ্র্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন এবং সুশাসনের ওপর। এর জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ডিজিটাল ডেটা বেইস, নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানো ও প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা কতটা সম্ভব? : বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় লক্ষ্যই অর্থনীতির জন্য কাম্য, কিন্তু অর্জন সহজ হবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে নির্ভর করবে খাদ্য সরবরাহ, আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য, বিনিময় হার এবং মুদ্রানীতির ওপর। একইভাবে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রয়োজন। যদি জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হয়, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরে আসে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এগিয়ে যায়, তাহলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোতে পারে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় উভয় লক্ষ্যই কিছুটা উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং প্রবৃদ্ধি পুনর্জাগরণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে লক্ষ্য ঘোষণার ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের ওপর। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অর্থের অভাব নয়; বরং কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব হলে বাজেটের লক্ষ্যগুলো অর্জনের সম্ভাবনাও অনেক বেশি হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ


