Originally posted in বণিকবার্তা on 23 September 2026
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত কীভাবে সামলাবে বাংলাদেশ

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাছ ধরা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ সরকার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সব ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের খুচরা মূল্য লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। এমন এক সময়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যখন সাধারণ মানুষ আগে থেকেই খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যের চাপে রয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল চাহিদা, জ্বালানির ঘাটতি, ঋণের উচ্চ সুদ এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি। তবে এ মূল্যবৃদ্ধি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা, জাহাজ ভাড়া ও বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং টাকার অবমূল্যায়ন—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশকে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ আমদানি করা জ্বালানি তেলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। তাই দেশের বাজারে জ্বালানির দাম শুধু আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দামের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে পরিশোধিত তেলের দাম, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ও বীমা ব্যয়, আমদানি অর্থায়নের খরচ, বন্দর ও সংরক্ষণ ব্যয়, কর এবং পরিবেশকদের মুনাফাও যুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক দাম ও ডলারের মূল্য দুটিই বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়।
সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। দেশের বাজারে দাম সমন্বয়ে বিলম্বের ফলে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। এছাড়া এলএনজিতে ভর্তুকি, সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি এবং জ্বালানি সরবরাহ ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় অব্যাহত রাখার প্রয়োজনকেও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের জন্য সরকার ২০২৪ সালে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে। নীতিগতভাবে এ ধরনের পদ্ধতি সরকারের ভর্তুকির দায় সীমিত করতে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমাতে এবং নিয়মিত জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম একই হারে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর বিষয়টি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এসব জ্বালানির আমদানি ব্যয়, ব্যবহারকারী এবং সামাজিক প্রভাব এক নয়। তাই নতুন মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সরকারকে তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
সাধারণ মানুষ প্রথমে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এর প্রভাব অনুভব করবে। বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, রাইডশেয়ারিং এবং নৌ-পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে। তবে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, পরিবহন ভাড়া একই হারে বাড়ানো যৌক্তিক নয়। কারণ জ্বালানি পরিবহন পরিচালনার মোট ব্যয়ের একটি অংশ মাত্র। গাড়ির কিস্তি, শ্রমিকের মজুরি, রক্ষণাবেক্ষণ, টোল ও অবচয়ও পরিবহন ব্যয়ের অংশ।
যেসব পরিবার সরাসরি জ্বালানি তেল কেনে না, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ধান-চাল, শাকসবজি, মাছ, ওষুধ, কাপড় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনস্থল বা বন্দর থেকে বাজারে আনতে জ্বালানি লাগে। ফলে মানুষকে একদিকে বেশি পরিবহন ভাড়া দিতে হবে, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যও বহন করতে হবে।
নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবারের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে। সচ্ছল পরিবারের তুলনায় দরিদ্র পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, পরিবহন ও জ্বালানিতে ব্যয় হয়। তাদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগও খুব সীমিত। ফলে অনেক পরিবার পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে পারে। যেসব দরিদ্র পরিবার এখনো আলো বা রান্নার জন্য কেরোসিন ব্যবহার করে, তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাছ ধরা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ক্ষুদ্র কৃষকরা উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সবসময় পাইকার বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে বেশি দাম পান না। ফলে কৃষকের লাভ কমতে পারে। অথচ পরিবহন ও বাজারজাত ব্যয় বাড়ার কারণে ভোক্তাকে খাদ্যের বেশি দাম দিতে হতে পারে। তাই সব ডিজেল ব্যবহারকারীর জন্য সাধারণ ভর্তুকি না দিয়ে ক্ষুদ্র কৃষকদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেয়া প্রয়োজন।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিবহন এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সহজে দাম বাড়াতে পারে না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি এবং অনেক পণ্যের দাম আগে থেকেই চুক্তিতে নির্ধারিত থাকে। ফলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্পের মুনাফা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রফতানি প্রতিযোগিতা কমাতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন কম, দরকষাকষির ক্ষমতা দুর্বল এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি প্রায়ই কম জ্বালানিসাশ্রয়ী। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বা কর্মঘণ্টা কমাতে পারে। অন্যরা বাড়তি ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে পারে।
সামগ্রিক অর্থনীতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়াবে। প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে জ্বালানি ও পরিবহন খরচে। পরোক্ষ প্রভাব পড়বে কৃষি, শিল্প ও পণ্য বিতরণে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকরা বেশি মজুরি দাবি করলে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সেই ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত করলে দ্বিতীয় দফায় মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বাণিজ্য ভারসাম্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং টাকার বিনিময় হারের ওপর চাপ পড়বে। আবার দীর্ঘ সময় দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখলে বিপিসির লোকসান এবং সরকারি ভর্তুকির দায় বাড়বে। অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দ কমে যেতে পারে। সাধারণ জ্বালানি ভর্তুকি দরিদ্র মানুষের তুলনায় বেশি গাড়ি ব্যবহারকারী সচ্ছল মানুষকে বেশি সুবিধা দেয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আন্তর্জাতিক বাজারের কোন দাম, কী বিনিময় হার, কত পরিবহন ও বীমা ব্যয়, কর, পরিবেশক মুনাফা এবং কত দিনের গড় আমদানি ব্যয় ব্যবহার করা হয়েছে তা প্রকাশ করতে হবে। প্রয়োজনে মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও আমদানি ব্যয় কমলে দেশের বাজারেও দ্রুত দাম কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিবহন ভাড়া স্বচ্ছ হিসাবের ভিত্তিতে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে যাতে ভাড়া না বাড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অযৌক্তিকভাবে দাম না বাড়ান।
তৃতীয়ত, সবার জন্য সাধারণ জ্বালানি ভর্তুকির পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য সাময়িক নগদ ও খাদ্যসহায়তা বাড়ানো যেতে পারে। সাশ্রয়ী ভাড়া বজায় রাখার শর্তে সরকারি ও বেসরকারি গণপরিবহনকে সীমিত সহায়তা দেয়া যেতে পারে। ডিজিটাল কৃষক নিবন্ধনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষকদের সেচ মৌসুমে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বা আর্থিক সহায়তা দেয়া যেতে পারে। প্রতিটি সহায়তার মেয়াদ, যোগ্যতা ও বাজেটের সীমা স্পষ্ট করতে হবে।
চতুর্থত, জ্বালানি আমদানি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। বিপিসিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও তাৎক্ষণিক বাজার থেকে কেনার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আমদানির উৎস বাড়াতে এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, সাময়িকভাবে জ্বালানির চাহিদা কমানোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন শেল্টারিং ফ্রম অয়েল শকসে উন্নত গণপরিবহন, গাড়ি ভাগাভাগি, দক্ষ পণ্য পরিবহন, প্রয়োজন অনুযায়ী ঘরে বসে কাজ এবং অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির তেল ব্যবহার কমানোর ১০ দফা পরিকল্পনা দেখিয়েছে, সমন্বিত ব্যবস্থা নিলে জরুরি অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ না করেও দ্রুত তেলের চাহিদা কমানো সম্ভব।
ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত উচ্চ করহার সাময়িকভাবে কিছুটা কমানো যেতে পারে। এতে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখা এবং পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে কর কমলে সরকারের রাজস্ব আয় কমবে, তাই বিকল্প উৎস থেকে ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিপিসির আমদানি ব্যয়, পরিচালন খরচ, কর ও প্রকৃত লোকসানের হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। বিশ্ববাজার স্বাভাবিক হলে কর পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, যাতে ভোক্তার স্বস্তি ও সরকারের আর্থিক প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
সবশেষে জ্বালানির দামের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তাই বাংলাদেশের বাজেট ও আমদানি পরিকল্পনায় তেলের উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন মূল্য—তিন ধরনের পরিস্থিতির প্রস্তুতি থাকা উচিত। তবে বারবার জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান করা যাবে না। বাংলাদেশকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সৌর সেচ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী শিল্প, উন্নত গণপরিবহন, রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক ব্যয়ের বাস্তব চাপ রয়েছে। তবে সেই ব্যয়ের অতিরিক্ত বোঝা যেন দরিদ্র পরিবার, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর না পড়ে, সে জন্য স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ, লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা এবং দ্রুত জ্বালানি বহুমুখীকরণ জরুরি।
ড. ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)


