বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে – ড. ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in কালের কণ্ঠ on 23 September 2026

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানিসংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, নীতির অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল বাজার চাহিদা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অথচ অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করতে হলে অভ্যন্তরীণ বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকেও আকৃষ্ট করতে হবে। কারণ বিনিয়োগ ছাড়া উৎপাদন বাড়বে না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে না এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিও টেকসই হবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—ব্যাংক খাতে তারল্য থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। এর কারণ অর্থের অভাব নয়।

বরং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ঘাটতি। একজন উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে শুধু ঋণের সুদহার বিবেচনা করেন না। তিনি দেখেন বাজারে চাহিদা কেমন, উৎপাদন ব্যয় কত, গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, কর ও নিয়ন্ত্রক নীতি কতটা স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিবেশ কেমন থাকবে। এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যাংকে অর্থ পড়ে থাকলেও উদ্যোক্তা ঋণ নিতে আগ্রহী হন না।

উচ্চ সুদহার অবশ্যই বিনিয়োগের পথে একটি বড় বাধা। তবে শুধু সুদহার কমিয়ে সমস্যার সমাধান হবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ঋণের ব্যয় কমলেও যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা না থাকে, বাজার দুর্বল থাকে, করব্যবস্থা জটিল হয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থাকে, তাহলে উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। তাই বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।

জ্বালানিসংকট এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, সক্ষমতার ব্যবহার কমে এবং বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়লেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সঞ্চালন অবকাঠামোয় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। ফলে উৎপাদনক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। স্বল্প মেয়াদে শিল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে সরবরাহের উৎস বহুমুখী করতে হবে। জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোর ব্যবস্থাও জরুরি।

ব্যাংক খাতের সংস্কার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের আরেকটি পূর্বশর্ত। দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক। প্রকৃত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ, সম্পদের গুণগত মান যাচাই, দুর্বল ব্যাংকের সময়বদ্ধ পুনর্গঠন এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভালো ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিকে এককভাবে বিবেচনা করা যাবে না। উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ে। জামানতের সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয়, জটিল কাগজপত্র এবং ব্যাংকের ঝুঁকি-অনাগ্রহ তাদের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী খাত, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন বাড়াতে হবে।

অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগ মূলধনের পাশাপাশি প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা এখনো যথেষ্ট কাজে লাগানো যায়নি। এর কারণ শুধু প্রণোদনার ঘাটতি নয়; বরং জমি পাওয়া, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, করব্যবস্থার জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং নীতির অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী দেখতে চান, তিনি যে দেশে বিনিয়োগ করছেন সেখানে নিয়মকানুন কতটা পূর্বানুমানযোগ্য এবং বিরোধ দেখা দিলে তার ন্যায়সংগত সমাধান পাওয়া যাবে কি না। বিদ্যুৎ-গ্যাস, কর, মুনাফা প্রত্যাবাসন, অনুমোদন এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা থাকলে অতিরিক্ত প্রণোদনাও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে না।

এখানে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। যে দেশে স্থানীয় উদ্যোক্তারাই নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করাও কঠিন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর অন্যতম শর্ত হলো দেশীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারিত হবে, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকারের জন্য এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগের পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। করনীতি, জ্বালানি, ব্যাংকিং, অবকাঠামো ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। বিনিয়োগকারীর জন্য সবচেয়ে বড় প্রণোদনা হলো একটি স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিপরিবেশ।

বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কর ও অন্যান্য প্রণোদনার ঘোষণা থাকলেই হবে না, এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। কোন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে, কোথায় বাধা রয়ে গেছে এবং কোন সরকারি সংস্থার কারণে প্রকল্প আটকে আছে—এসব বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

যেসব অবকাঠামো সরাসরি উৎপাদন, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সীমিত রাজস্ব দিয়ে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করতে হলে ব্যয়ের প্রতিটি টাকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি আস্থার ওপরও নির্ভর করে। উদ্যোক্তা যদি মনে করেন তাঁর বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকবে, জ্বালানি পাওয়া যাবে, ঋণ পাওয়া সহজ হবে, করনীতি পূর্বানুমানযোগ্য থাকবে এবং নীতি হঠাৎ বদলাবে না, তাহলে তিনি ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন। একই নিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীকেও দিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করতে হলে শুধু বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা নয়, বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য আরো আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ—সিপিডি

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.