Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 26 September 2026

ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তিনি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশের ইউএসএআইডি মিশনের অর্থনীতিবিদ। সামষ্টিক অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, জ্বালানি, আর্থিক খাত, বাণিজ্য ও উন্নয়ননীতি নিয়ে তার দীর্ঘদিনের গবেষণা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট, নীতি প্রণয়ন ও সাধারণ মানুষের ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে তিনি নিয়মিতভাবে গবেষণা ও মতামত দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি মূল্য, ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ে তার বিশ্লেষণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিপিসির লোকসান, মূল্যস্ফীতির চাপ, পরিবহন ও কৃষি ব্যয়, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছে দৈনিক ‘জাতীয় অর্থনীতি’। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানজিদুল ইসলাম।
জাতীয় অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও বিপিসির লোকসানের প্রেক্ষাপটে সরকার লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়িয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মূল্য সমন্বয় কতটা যৌক্তিক এবং এর প্রয়োজনীয়তা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ড. ফাহমিদা খাতুন: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়ে গেলে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমলে বিপিসির আমদানি ব্যয় বাড়ে। দীর্ঘদিন দাম অপরিবর্তিত রাখলে বিপিসির লোকসান এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়তে পারে। ফলে মূল্য সমন্বয়ের কিছু অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। সরকারও স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের আওতায় নিয়মিত দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে বর্তমান উচ্চমূল্যস্ফীতি ও দুর্বল ক্রয়ক্ষমতার সময়ে একবারে ২০ টাকা বৃদ্ধি বড় ধাক্কা। তাই পুরো ব্যয় ভোক্তার ওপর চাপানোর পরিবর্তে সাময়িকভাবে আমদানি শুল্ক ও কর কমানো, বিপিসির পরিচালন ব্যয় পর্যালোচনা এবং ধাপে ধাপে সমন্বয় করা যেত। অর্থাৎ সমন্বয়ের প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু কীভাবে করা হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় অর্থনীতি: একসঙ্গে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক অভিঘাত কতটা হতে পারে? বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব কীভাবে দেখছেন?
ড. ফাহমিদা খাতুন: সব ধরনের জ্বালানির দাম একই অঙ্কে বাড়লেও অর্থনৈতিক প্রভাব এক নয়। ডিজেল কৃষি, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, নির্মাণ এবং কিছু শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কেরোসিন দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের জন্য তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বেশি বিস্তৃত।
প্রথমে বাস-ট্রাকের ভাড়া, সেচ ও যন্ত্রপাতি চালানোর ব্যয় বাড়বে। পরে চাল, সবজি, মাছ, মুরগি, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে এর প্রভাব পড়তে পারে। বস্তুত ইতোমধ্যেই এই পণ্যগুলোর দাম বেড়ে গিয়েছে। এই পরোক্ষ বা ‘সেকেন্ড-রাউন্ড’ প্রভাব কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। আসলে আমাদের দেশে পণ্যের দাম একবার বাড়লে তা আর কমতে চায় না। মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে বেশি দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ক্রয়ক্ষমতা ইতোমধ্যেই চাপে রয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর কী ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাবার, যাতায়াত ও বাসাভাড়ায় ব্যয় করেন। ফলে পরিবহন ও খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের প্রকৃত আয় কমে যায়। অনেক পরিবার মাছ-মাংস, ডিম, দুধ কিংবা চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে পারে।
মধ্যম আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রেও অফিস যাতায়াত, স্কুল পরিবহন, বিদ্যুৎ, নিত্যপণ্য এবং বিভিন্ন সেবার ব্যয় বাড়বে। কিন্তু বেতন বা আয় একই গতিতে বাড়ে না। ফলে সঞ্চয় কমবে, ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে এবং ভোগ কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও পড়তে পারে।
জাতীয় অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ও বিমা ব্যয়সহ নানা উপাদান দেশের জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের কাঠামোয় কোন কোন বিষয় সংস্কার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
ড. ফাহমিদা খাতুন: জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের সূত্র জনসমক্ষে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারদর, বিনিময় হার, পরিবহন ও বিমা ব্যয়, পরিশোধন ও বিতরণ ব্যয়, কর এবং বিপিসির মার্জিন— প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে জানানো উচিত।
মাসিক সমন্বয়ের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামা সামলাতে তিন মাসের গড় মূল্য ব্যবহার করা যেতে পারে। দাম খুব দ্রুত বাড়লে একটি স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করা উচিত এবং সেখান থেকে সাময়িক সহায়তা এবং দাম কমলে তহবিলে অর্থ জমা দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বিপিসির হিসাবের স্বাধীন নিরীক্ষা, জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় এবং করের হার নিয়মিত পর্যালোচনা দরকার। আন্তর্জাতিক দাম কমলে দেশেও দ্রুত ও আনুপাতিকভাবে দাম কমতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া, পণ্য পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার কীভাবে এই ‘সেকেন্ড-রাউন্ড’ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: প্রথম কাজ হলো গণপরিবহনের ভাড়া বৈজ্ঞানিকভাবে পুনর্নির্ধারণ করা। জ্বালানি ব্যয় মোট পরিচালন ব্যয়ের যতটুকু, ভাড়া শুধু সেই অনুপাতে বাড়তে পারে। পুরো ২০ টাকার বৃদ্ধি সরাসরি যাত্রীর ওপর চাপানো যৌক্তিক নয়। নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ ও দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করতে হবে।
পণ্য পরিবহনের ব্যয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বড় পাইকারি বাজারে মূল্যতথ্য প্রকাশ এবং অযৌক্তিক মজুদ বা কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন। একইসঙ্গে খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, আমদানি দ্রুত ছাড় করা এবং প্রয়োজন হলে খাদ্যপণ্যের শুল্ক সাময়িকভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে। মুদ্রানীতি দিয়ে এককভাবে এই ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপও জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব কৃষিতে বিশেষভাবে পড়বে— সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা ও কৃষিপণ্য পরিবহন সব ক্ষেত্রেই। কৃষকদের ওপর এই চাপ কমাতে কী ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন?
ড. ফাহমিদা খাতুন: সব কৃষককে একই হারে ভর্তুকি না দিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, ডিজেলচালিত সেচনির্ভর এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সেচ মৌসুমে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডিজেলে নগদ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া সেচের বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, কৃষিযন্ত্রের যৌথ ব্যবহার, কম খরচে ঋণ এবং ফসল পরিবহনে সহায়তা প্রয়োজন। সহায়তা যেন জমির মালিকের পরিবর্তে প্রকৃত চাষির কাছে পৌঁছায়, তা ডিজিটাল নিবন্ধন ও স্থানীয় যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের খরচ বাড়লে উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্যমূল্য আরও বাড়তে পারে। তাই এই সহায়তা শুধু কৃষকের জন্য নয়, খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় অর্থনীতি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে, আবার ভোক্তা ও ব্যবসার ব্যয়ও বাড়বে। সামগ্রিকভাবে রাজস্ব ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: উচ্চ মূল্যের ওপর কর আদায় হলে সরকারের রাজস্ব কিছুটা বাড়তে পারে। বিপিসির লোকসান ও ভর্তুকির চাপও কমতে পারে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ইতিবাচক ফল নয়। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবার ও ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, ভোগ ও বিনিয়োগ কমে এবং উৎপাদন ধীর হতে পারে।
পণ্য বিক্রি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে গেলে ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি শুল্ক থেকেও রাজস্ব কমতে পারে। তাই স্বল্পমেয়াদে সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমলেও প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক কর আদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। রাজস্বের হিসাবের সঙ্গে এই বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিবেচনা করা দরকার।
জাতীয় অর্থনীতি: জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য দেশের শিল্প ও রপ্তানিমুখী খাতের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমাতে পারে কি? বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি খাতের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি কতটা?
ড. ফাহমিদা খাতুন: জ্বালানির উচ্চমূল্য শিল্পকারখানার সরাসরি এবং পরোক্ষ— দুই ধরনের ব্যয় বাড়ায়। নিজস্ব জেনারেটর, পরিবহন, কাঁচামাল আনা এবং বন্দরে পণ্য পাঠানোর খরচ বাড়বে। তৈরি পোশাক খাতের মুনাফার হার তুলনামূলক কম এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সব সময় বাড়তি মূল্য দিতে চান না। ফলে উৎপাদকদেরই অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হতে পারে।
চামড়া, পাট, কৃষিপণ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। তবে নির্বিচারে ভর্তুকির বদলে জ্বালানি-দক্ষ যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি, স্বল্পসুদে সবুজ অর্থায়ন এবং দ্রুত বন্দর ও পরিবহনসেবা উন্নত করা বেশি টেকসই সমাধান।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের কৌশল নিতে হবে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: স্বল্পমেয়াদে বিভিন্ন দেশ ও উৎস থেকে তেল আমদানি, কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি, আগাম ক্রয় বা মূল্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ব্যবহারে জ্বালানি সাশ্রয় প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা মোকাবিলায় সহায়তার উদ্যোগও নিয়েছে।
মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়ানো, গ্যাসের অপচয় ও অবৈধ সংযোগ বন্ধ, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা উন্নয়ন এবং সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে গণপরিবহন, বিদ্যুৎচালিত যান, রেল ও নৌপথ উন্নয়ন, শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ তৈরি প্রয়োজন। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নেন অনেক ব্যবসায়ী। সরকার কীভাবে নিশ্চিত করতে পারে যে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে না?
ড. ফাহমিদা খাতুন: প্রতিটি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় জ্বালানি ব্যয়ের প্রকৃত অংশ হিসাব করে সম্ভাব্য যৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ করা যায়। সরকার নিয়মিতভাবে উৎপাদন, পাইকারি ও খুচরা বাজারের দাম প্রকাশ করলে ভোক্তা সহজে তুলনা করতে পারবেন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে তথ্য বিনিময় দরকার। তবে শুধু অভিযান ও জরিমানা যথেষ্ট নয়। পণ্যের ঘাটতি দূর করা, চাঁদাবাজি ও পথে অনানুষ্ঠানিক ব্যয় কমানো, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম কমানো বা ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ সীমিত হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে সরকার কোন কোন বিকল্প অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব না হলে নিম্ন আয়ের পরিবারকে সীমিত সময়ের জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা সাময়িকভাবে বাড়ানো, খোলা বাজারে বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় (ওএমএস) ও ন্যায্যমূল্যের খাদ্য কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শহরের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
গণপরিবহন ও কৃষিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে সাময়িক কর-শুল্ক সমন্বয়, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহজ ঋণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে। সহায়তা হতে হবে সময়সীমাবদ্ধ, স্বচ্ছ এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। জ্বালানি সংকটের সব ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে সরকার, জ্বালানি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও ভোক্তার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ভাগ করাই হবে সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ।


