Originally posted in প্রথম আলো on 30 September 2026
খরচের চাপে বাড়ছে ভোগ ব্যয়, কমছে জাতীয় সঞ্চয়, অর্থনীতিতে কী প্রভাব

দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চলতি মূল্যে দেশজ ও জাতীয় উভয় ধরনের সঞ্চয়ের পরিমাণও বেড়েছে। তবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের হার সেভাবে বাড়েনি, উল্টো ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তিন অর্থবছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বাড়লেও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঞ্চয়ের হার বাড়েনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপিতে বিনিয়োগের হারও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তার বিপরীতে বেড়েছে ভোগ ব্যয়।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে সেই হার কমে নেমে এসেছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয় প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে গেছে। অন্যদিকে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে দেশজ সঞ্চয়ের হার ছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমেছে। সেই হিসাবে তিন বছরের ব্যবধানে দেশজ সঞ্চয় কমেছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ার মানে হলো বিনিয়োগের জন্য মূলধনও কমে যাওয়া। আর বিনিয়োগ কম হলে তার প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। আবার জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে তাতে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির বিপরীতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের একটি তুলনামূলক উচ্চ হার রক্ষা করা আবশ্যক। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের চাপ বেড়েছে। ফলে আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ ছাড়া প্রবাসী আয়ের গতি কম থাকা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত নানা প্রতিষ্ঠানের লোকসানও জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সীমানার ভেতর পণ্য ও সেবা খাত থেকে যে পরিমাণ আয় হয়, সেখান থেকে দেশের ভেতরের জনগণ ও সরকারের মোট ভোগ ব্যয়ের অংশ বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তা-ই দেশজ সঞ্চয়। আর দেশজ সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) এবং বিদেশি কোনো খাতের আয় মিলিয়ে হয় জাতীয় সঞ্চয়।
ধারাবাহিকভাবে কমছে সঞ্চয়ের হার
মূলত করোনা মহামারির সময় অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছর থেকেই সঞ্চয়ের হার কমতে শুরু করে। এর মধ্যে শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছরে সঞ্চয়ের হার সামান্য বেড়েছিল। এরপর গত তিন অর্থবছরে সেটি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। করোনার আগে ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে দেশজ সঞ্চয়ের হার ছিল ২৭ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ৩১ দশমিক ৪২ শতাংশ। সর্বশেষ গত অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে জিডিপির তুলনায় দেশজ সঞ্চয়ের হার কমে ২১ শতাংশে নেমেছে। আর জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমে নেমে এসেছে প্রায় ২৭ শতাংশে।
অবশ্য চলতি মূল্যে সঞ্চয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চলতি মূল্যে জাতীয় সঞ্চয় ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৪৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকায়।
তবে অর্থনীতিবিদেরা অর্থনীতির প্রকৃত সঞ্চয়ের প্রবণতা এবং মূলধন গঠনের সক্ষমতা পরিমাপে জিডিপির অনুপাতকে বিবেচনায় নেন বেশি। কারণ, চলতি মূল্যে টাকার অঙ্কে সঞ্চয় বৃদ্ধি পাওয়া মানেই মানুষের প্রকৃত সঞ্চয় ক্ষমতা বেড়েছে—এমনটি না–ও হতে পারে। আবার জিডিপির অনুপাত হিসাব করার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনীতির আকারের তুলনায় সঞ্চয় ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল, তা বোঝা যায়।
সঞ্চয়ে মূল্যস্ফীতির ধাক্কা
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমার অন্যতম প্রধান কারণ দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয়ের বড় অংশই ভোগে (পণ্য ও সেবার পেছনে ব্যয়) ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার খরচ মিটিয়ে সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে গেছে।
বিবিএসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে জিডিপিতে মোট ভোগ ব্যয়ের হার ৭৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ভোগ ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। টানা চার বছর ধরে বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সর্বশেষ আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে ছিল।
নেতিবাচক প্রভাব বিনিয়োগে
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছর আগে জিডিপিতে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ৩১ শতাংশের ওপরে। বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ সময় বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ উভয়ই কমেছে।
গবেষণা সংস্থা র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে তা বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। কারণ, সঞ্চয় কমে যাওয়ার ফলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল কমে আসে। এটি দেশের সার্বিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সঞ্চয়-জিডিপির অনুপাত কমে যাওয়ার মানে হলো দেশের ভেতরের জমা হওয়া মূলধন দিয়ে নিজস্ব বিনিয়োগের চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় বিনিয়োগ ধরে রাখতে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। সে ক্ষেত্রে ঋণ পাওয়া, সেটি ব্যবস্থাপনা ও ঋণের অর্থ ফেরতের চাপও বাড়ে।
করণীয় কী
বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ধারা ফেরাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বা বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এর সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।


