এলএনজি ভর্তুকিতে বাড়ছে বড় ঝুঁকি: নাজনীন আহমেদ

Originally posted in রুপালী বাংলাদেশ on 1 October 2026

অর্থবছরের তিন মাসেই বরাদ্দের বড় অংশ শেষ

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই অর্থ গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এলএনজি আমদানির ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় হওয়া ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ। আর গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর জন্য প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও শেষ পর্যন্ত এর ব্যয় প্রায় আড়াই গুণ বেশি হয়।

কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এলএনজি আমদানিতে ভর্তুকিতে সরকারের কোষাগারে চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও এলএনজির জন্য ভর্তুকির মোট ৪২ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে প্রথম তিন মাসেই প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড় করেছে জ্বালানি বিভাগ; অর্থাৎ পুরো বছরের বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থবছরের এক-চতুর্থাংশ সময়ের মধ্যেই ছাড় করতে হয়েছে সরকারকে। তাই জ্বালানি তেল, গ্যাস বা বিদ্যুতের বাড়তি দামের বোঝা গ্রাহকদের জন্য চাপের হলেও চাহিদা অনুযায়ী সরকারকে সরবরাহ ঠিক রাখতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরবরাহ সংকট ও স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতার কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক দায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি করা এলএনজির গড় ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রতি ঘনমিটারে ৪৬ টাকা ৪০ পয়সা। বিপরীতে একই সময়ে দেশে গ্যাস বিক্রির গড় মূল্য ছিল ২৩ টাকা ৮০ পয়সা; অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটার এলএনজিভিত্তিক গ্যাসে গড়ে ২২ টাকা ৫০ পয়সার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে; যা শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির মাধ্যমে সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা এই খাতটাকে পেয়েছি তলাবিহীন ঝুঁড়ি অবস্থায়। যতই ভর্তুকি দিচ্ছি, কুলাতে পারছি না। সরকার গ্রাহক ভোগান্তি মেটাতে যা যা করণীয় সব করছে, কিন্তু গ্যাস বা তেলের খুচরা দাম নিয়ে সবাই পড়ে আছে। এটা কেউ দেখছে না যে এই দামের নিচে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে রাষ্ট্রকে কত টাকা দিতে হচ্ছে এবং এই ভর্তুকির বোঝা সরকারের পক্ষে কত দিন বহন করা সম্ভব।’

পেট্রোবাংলার গত কয়েক অর্থবছরের এলএনজি আমদানির ভর্তুকির হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ২ হাজার ৫০০ কোটি, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ হাজার ৬০০ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৬৫ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৯০০ কোটি ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

কিন্তু চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৩ মাসেই এ ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে মোট ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বরে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়; অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি গেছে শুধু এলএনজি আমদানিতে; অর্থাৎ ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৫-২৬— মাত্র দুই অর্থবছরের ব্যবধানে এলএনজিতে ভর্তুকি প্রায় ১৪৩ শতাংশ বেড়েছে। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের ব্যয় গত অর্থবছরের পুরো এলএনজিতে ভর্তুকির ৭০ শতাংশের বেশি।

এর অন্যতম কারণ হিসেবে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এর মূল কারণ আমদানি ব্যয় ও দেশে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান। দেশের গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় এলএনজি এখন গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এলএনজি আমদানি করে তা এফএসআরইউ বা টার্মিনালের মাধ্যমে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়। কিন্তু এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজারদর যখন বেড়ে যায়, তখন আমদানির ব্যয়ও দ্রুত বাড়ে। একই সঙ্গে দেশে গ্যাসের বিক্রয়মূল্য সেই হারে সমন্বয় না হলে তৈরি হয় বিশাল মূল্য ব্যবধান। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এই ব্যবধানই ছিল প্রতি ঘনমিটারে গড়ে ২২ টাকা ৫০ পয়সা; অর্থাৎ ভোক্তা যে দামে গ্যাস পাচ্ছেন, এলএনজি আমদানির প্রকৃত ব্যয় তার তুলনায় অনেক বেশি। এই পার্থক্য সরাসরি ভোক্তার বিলের মধ্যে প্রতিফলিত না হয়ে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে এর খেসারত দিতে হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় পেট্রোবাংলাকে বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কার্গো কিনতে হয়েছে উল্লেখ করে পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় স্পট মার্কেটের মূল্য পরিস্থিতি বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিলে দ্রুত বাড়ে এলএনজির দাম। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় কিছু স্পট কার্গোর দাম ২১-২২ ডলার ছাড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি কার্গোর অনুমোদিত মূল্য ২৪ ডলারের বেশি এবং কিছু জরুরি ক্রয়ের মূল্য ২৬-২৮ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ অবস্থায় গ্যাসের সরবরাহ সচল রাখতে গিয়ে সরকারের সামনে তৈরি হয়েছে কঠিন সমীকরণ। সরকার জনগণের স্বার্থে বাড়তি দাম দিয়েই সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ঘাটতি তৈরি হবে— এটা স্বাভাবিক। তবে এর বিকল্প আপাতত নেই।’

একদিকে এলএনজির আমদানির প্রকৃত ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের দাম হঠাৎ সমন্বয় করলে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অন্যান্য খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাজারে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। আর এটা স্বাভাবিক উল্লেখ করে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এতে সরকারকে একসঙ্গে দুটি চাপ সামলাতে হচ্ছে। প্রথমত এলএনজি আমদানির ব্যয়, দ্বিতীয় সেই ব্যয় ভোক্তার ওপর কতটা স্থানান্তর করা যাবে। গ্যাসের দাম না বাড়ালে ভর্তুকি বাড়ে। আবার দাম বাড়ালে জনজীবনের ব্যয় বাড়ে। সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়; অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু গ্যাসের দামের নয়। এটি একই সঙ্গে রাজস্ব, শিল্প, বিদ্যুৎ ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক সমস্যা। এলএনজির বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়। ফলে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে তার প্রভাব শুধু গ্যাস খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সার্বিক জনজীবনেও চাপ পড়ে।’

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবর ও আগামী নভেম্বরের জন্য এখন পর্যন্ত ১৯টি এলএনজি কার্গো নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরে ১০টি এবং নভেম্বরে ৯টি কার্গো আসার কথা। অক্টোবরে নির্ধারিত ১০টি কার্গোর মধ্যে তিনটি স্পট মার্কেট, দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং পাঁচটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আসবে। নভেম্বরে ছয়টি দীর্ঘমেয়াদি ও তিনটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির কার্গো রয়েছে। এ অবস্থায় আগামী দুই মাস এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির আশঙ্কা না থাকলেও সরকারের কোষাগার থেকে কত বাড়তি অর্থ বেরিয়ে যাবে, তা নিয়ে শঙ্কিত অর্থনীতিবিদেরা।

অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটি আমাদের সামনে আরও বড় ভর্তুকির ঝুঁকি তৈরির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মাত্র তিন মাসে যদি ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হয়, তাহলে একই গতিতে ব্যয় চললে পুরো অর্থবছরে এর পরিমাণ অনেক বড় হতে পারে। তবে সরলভাবে তিন মাসের ব্যয়কে চার গুণ করে পুরো বছরের ব্যয় হিসাবে ধরা যাবে না— কারণ এলএনজির আন্তর্জাতিক মূল্য, চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ, স্পট মার্কেটের দাম এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন মাসভেদে পরিবর্তিত হয়। এরপরও বর্তমান প্রবণতা সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত; বিশেষ করে গত অর্থবছরেই যখন এলএনজি ভর্তুকি ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, তখন চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হওয়া রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে এটি সহজ হিসাব। তাই দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার জরুরি বলে আমি মনে করি।’

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.