Originally posted in খবরের কাগজ on 11 October 2026
দেশের বাজেট ঘাটতি পূরণ, সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী জোরদার এবং অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের গুরুত্ব এবং সার্বিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ।
খবরের কাগজ: আইএমএফ থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিয়েছে?
নাজনীন আহমেদ: আইএমএফের ঋণ কোনো বাধ্যতামূলক বিষয় নয়; বরং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারলে নিজস্ব অর্থায়নেই চলা সম্ভব। তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট ও রাজস্ব ঘাটতির এই সময়ে আইএমএফের সংস্কার এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে সঠিক দর-কষাকষির মাধ্যমে এগোলে অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি পাবে।
নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের বাজেটে যে ব্যয়ের হিসাব আছে, সেখানে একটি বড় গ্যাপ বা ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় করতে হবে যেমন নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা, উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য অর্থের জোগান দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা। এই বাজেট ঘাটতি মেটাতেই মূলত ঋণের কথা আসছে। আমরা যদি নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারি, অর্থাৎ আমাদের কাছে যদি পর্যাপ্ত টাকা থাকে, তবে তো আর ঋণের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আদায় করতে পারছি না।
খবরের কাগজ: আমাদের ব্যাংকিং খাত থেকে কি সরকার প্রয়োজনীয় ঋণ নিতে পারছে না?
নাজনীন আহমেদ: ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার সুযোগ এখন বেশ সীমিত। কারণ অনেক ব্যাংকেই নন-পারফর্মিং লোন (খেলাপি ঋণ) অনেক বেশি। ফলে ব্যাংকগুলোর নতুন করে ঋণ দেওয়ার যে ‘স্পেস’ বা সক্ষমতা, তা অনেকটা কমে গেছে।
খবরের কাগজ: তাহলে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এখন বিকল্প সুযোগ বা পথগুলো কী?
নাজনীন আহমেদ: অর্থমন্ত্রী যদি মনে করেন যে অভ্যন্তরীণ উৎস বা রাজস্ব দিয়ে আমরা আমাদের খরচ চালাতে পারব, তবে আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণের প্রয়োজন নেই। কিন্তু তেমন বিকল্প না থাকলে আমাদের নিজস্ব অর্থায়ন বা অন্য উৎস থেকে ব্যবস্থা করতে হবে। একটি বিষয় লক্ষণীয়, আইএমএফ যখন ঋণ অনুমোদন করে বা ফাইনাল করে, তখন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ অন্য ঋণদাতারাও ঋণ দিতে এগিয়ে আসে। আইএমএফের ঋণ না থাকলে অন্যদের কাছ থেকে ঋণ পাওয়া কিছুটা জটিল হয় বা পারসেপশনের সমস্যা তৈরি হয়।
খবরের কাগজ: তবে আইএমএফ তো কিছু শর্তও আরোপ করে। আর সাম্প্রতিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
নাজনীন আহমেদ: সংস্কারের কারণে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে না। সরকার সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তবে সেই গতি এখনো এমন জায়গায় পৌঁছায়নি, যাতে আমরা স্বস্তিতে থাকতে পারি। যেমন এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের দক্ষতা এখনো আমরা ওই পর্যায়ে পৌঁছাতে দেখিনি।
এখানে বড় বিষয় হলো, আইএমএফ যে শর্তগুলোর কথা বলছে, সেগুলোর বেশির ভাগই আমাদের নিজেদের রিফর্ম এজেন্ডার (সংস্কার প্রস্তাবনার) অংশ। এনবিআরকে ঢেলে সাজানো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরানো—এগুলো কিন্তু আমাদের সরকারেরই অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা ছিল।
খবরের কাগজ: তাহলে এই পরিস্থিতিতে সরকারের নীতি কী হওয়া উচিত?
নাজনীন আহমেদ: এটি এমন নয় যে আইএমএফ জোর করে শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে, কারণ এগুলো আমরা নিজেরাই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারের উচিত আলোচনার টেবিলে আইএমএফের সাথে নেগোশিয়েট (আলাপ-আলোচনা) করা, যেন আমাদের নিজেদের সংস্কার এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে আমাদের সুবিধা অনুযায়ী শর্ত নির্ধারণ করা যায়।
আইএমএফের ঋণ ছাড়াও আমরা চলতে পারবো, যদি আমাদের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের এবং দ্রুত পরিবর্তন আনা যায়। দিনের শেষে সবকিছু নির্ভর করছে আমাদের পরিকল্পনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান আছে কি না তার ওপর।


