প্রবৃদ্ধির ধীরগতি কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ সংকুচিত করবে – ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in বাংলা ট্রিবিউন on 13 October 2026

আইএমএফের পূর্বাভাসে বড় ধাক্কা, জীবনযাত্রার চাপ আরও বাড়ার শঙ্কা

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে ওঠার আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির নতুন এই পূর্বাভাস দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে এই পূর্বাভাস এসেছে। অর্থনীতির গতি কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন ও মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ ও কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন তরুণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা। একইসঙ্গে রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যয় নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার মধ্যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমালো আইএমএফ

আইএমএফ গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। নতুন পূর্বাভাসে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে সংস্থাটি। গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে থাকার কথা বলেছিল আইএমএফ। নতুন হিসাবে তা বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে।

আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমতে পারে।

প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তুলনায়ও কম। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস ৪ শতাংশ।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বাড়বে চাপ

আইএমএফের এই পূর্বাভাসকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের চাপ ও জ্বালানি সংকটের কারণে এমনিতেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধির গতি আরও কমে যাওয়ার পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘প্রবৃদ্ধি ধীর হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ কমে যায়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ ও কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারে। এতে তরুণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকেরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’

ফাহমিদা খাতুনের মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল থাকলে রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রবৃদ্ধি কমার প্রভাব আগেই পড়েছে

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার প্রভাব কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে পড়বে। তবে তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুর্বলতার প্রভাব অনেক আগ থেকেই দেখা যাচ্ছে।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘দেশের অর্থনীতিতে বেশ কিছু দিন ধরেই দুর্বল অবস্থা বিরাজ করছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থনীতি দুর্বল থাকলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানও বাধাগ্রস্ত হয়।’’

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, প্রবৃদ্ধির ধীরগতির নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের মজুরি, কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব আদায়ে পড়বে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রবৃদ্ধির প্রভাব তো অনেক আগ থেকেই পড়ছে।’

অর্থনীতির এই দুর্বল অবস্থা থেকে উত্তরণে কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাত, বন্দর ব্যবস্থাপনা, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো দূর করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন হবে।

মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

প্রবৃদ্ধির গতি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ। পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকলে আয় একই হারে না বাড়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় সামলাতে বেশি চাপের মুখে পড়তে হয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুত কমে আসার বিষয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদনেও দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটি ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কর্মসংস্থান, আয় ও জনসেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ।

আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথ আরও কঠিন হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং জ্বালানি সরবরাহের বাধা দূর করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে প্রবৃদ্ধির ধীরগতি মানুষের জীবনযাত্রা ও কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করতে পারে।

Get latest updates of CPD's research, policy discourse, publications, and events.