Originally posted in কালবেলা on 18 October 2026
অর্থনীতি এবং দেশকে বাঁচাতে সর্বস্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়তে হবে

অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান অর্থনীতিবিদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং উন্নয়ন নীতি নির্ধারণে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। অধ্যাপনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে। দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট ও তা উত্তরণে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।
প্রশ্ন: অনেকেই বলছেন বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি কি কেবলই একটি সংকট, নাকি অর্থনীতি কোনো কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কারণেই আজকের এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে? আপনি কী মনে করছেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: কাঠামোগত রূপান্তর এবং সংকটকালীন সময়—এই দুটোর মধ্যে খুব পার্থক্য করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে আমরা যেসব সমস্যা দেখছি, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাশাপাশি, আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বহু বছর ধরে পুঞ্জীভূত হওয়া সমস্যাগুলোও এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। সুতরাং, এ বিষয়গুলো একে অন্যের পরিপূরক। আমরা অর্থনীতির যে উত্তরণ ঘটাতে চাইছি, তা কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমেই করতে হবে। একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।
প্রশ্ন: সংকটের গভীরতা কেমন দেখছেন? আমরা দেখেছি শ্রীলঙ্কা বা পার্শ্ববর্তী কিছু দেশে এমন সংকট তৈরি হলেও তারা এক-দুই বছরের মধ্যে সেটি সামলে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় পার হয়ে গেলেও অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না কেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: সাম্প্রতিক অতীতে শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে এবং এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণও ছিল—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সেসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সমস্যার ধরন, গভীরতা এবং সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে এর বিস্তৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রথমত, একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো ব্যাংকিং খাত। এর সঙ্গে উৎপাদন, ব্যক্তি খাতের উদ্যোগ, সরবরাহ সক্ষমতা, রপ্তানি এবং মূল্যস্ফীতি—সবকিছু গভীরভাবে জড়িত থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত যে ধরনের নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আশপাশের কোনো দেশে এমন উদাহরণ নেই। এমনকি খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে আমরা বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছি। এটি অত্যন্ত বড় একটি সংকট, যা কাটিয়ে উঠতে যথেষ্ট সময় লাগবে। তাই আমাদের সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের বিষয়টি। রাজস্ব আহরণ বেশি হলে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থসামাজিক কার্যক্রম চালাতে পারত, যার ফলে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমত। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের সংকটও কিছুটা লাঘব করা সম্ভব হতো। কিন্তু শতাংশের হিসেবে বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে রাজস্ব আহরণের হার সবচেয়ে কম, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম।
এ দ্বিমুখী সমস্যা আমাদের দেশে বহু বছর ধরে পুঞ্জীভূত হয়েছে। ফলে এ চ্যালেঞ্জের মাত্রাও অনেক বেশি এবং তা থেকে উত্তরণের পথও ততটাই কঠিন। এটি এক-দুই মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান হওয়ার মতো বিষয় নয়। তবে আমরা যদি সঠিক পথে এগোতে পারি, সময়মতো ও সঠিক মাত্রায় পদক্ষেপ নিই এবং সুশাসন, আইনের শাসন ও সাশ্রয়ী নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি, তবেই এ সংকট কাটানো সম্ভব হবে।
প্রশ্ন: সংকট উত্তরণে এখনই কোন পদক্ষেপগেুলো নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: সংকট উত্তরণে বেশ কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমাদের কাজ করতে হবে:
প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: আগেই বলেছি, আমাদের অনেক সমস্যার মূল ব্যাংকিং খাতে নিহিত। বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে; ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করার জন্য কিছু ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যা সাময়িক সময়ের জন্য ঠিক আছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংকিং আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো যাতে সুশাসনের সঙ্গে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে কারা থাকবেন, একই পরিবারের কতজন কতদিন থাকতে পারবেন—এসব বিষয়ে কঠোর হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি: প্রত্যক্ষ করের (কোম্পানি ও ব্যক্তি কর) পরিধি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অপ্রত্যক্ষ কর বা ভ্যাটের ক্ষেত্রে জনগণ যা দিচ্ছে, সরকার যেন তার পুরোটা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি বা লিকেজের কারণে এখানে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের প্রত্যক্ষ কর আদায়ের হার অর্ধেকেরও কম। এ হার বাড়াতে পারলে ঘাটতি বাজেটও নিজস্ব অর্থায়ন থেকে মেটানো সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্রকে (এনআইডি) কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত সিস্টেম বা ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’ তৈরি করতে হবে। যেমনটি ভারতে ‘প্যান’ ও ‘আধার’ কার্ডের সমন্বয়ের মাধ্যমে করা হয়। আয়-ব্যয়, আমদানি-রপ্তানি এবং ব্যাংক হিসাবের সমন্বিত তথ্যের ভিত্তিতে করফাঁকি রোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদেরও নিজেদের জীবনাচরণের মাধ্যমে জনগণের সামনে সঠিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনা: উৎপাদক বা আমদানিকারক পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পণ্যের দামে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়। পরিবহন বা বাজারে চাঁদাবাজি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব উৎপাদকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং ভোক্তার পকেটের ওপর পড়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং প্রতিযোগিতা কমিশনকে বাজার নিয়ন্ত্রণের বদলে বাজার যাতে সুষ্ঠুভাবে চলে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
চতুর্থত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যবসা সহজীকরণ: সামনে আমাদের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হতে যাচ্ছে। তখন আমরা অনেক শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাব। তাই বাজার সুবিধার ওপর নির্ভর না করে আমাদের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এজন্য লজিস্টিক পলিসির বাস্তবায়ন, সিঙ্গেল উইন্ডো বা এক ছাতার নিচে সেবা প্রদান, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন এবং বন্দরে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় কমানোর মতো বিষয়গুলোতে জোর দিতে হবে। এগুলো করতে পারলে শুল্ক সুবিধা হারানোর পরও আমাদের উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন।
পঞ্চমত, সুশাসন ও জবাবদিহি: সব ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী মানসিকতা ও সুশাসনের সঙ্গে সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এর জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা এবং নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা গেলে বর্তমানের এ কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রশ্ন: দেশে কর্মসংস্থানের বড় সংকট রয়েছে, তবে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে ওঠানামা করছে। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা বা নেপালে মূল্যস্ফীতি এখন ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: মূল্যস্ফীতির দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি। আমাদের রিজার্ভ এখন তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকায় এবং টাকার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে পারায় আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি আমরা অনেকটা সামাল দিতে পেরেছি। এটি একটি বড় অর্জন। তবে আমাদের মূল সমস্যাটি রয়ে গেছে দেশীয় উৎপাদন, সরবরাহ এবং চাহিদার সমন্বয়ে।
এখানে বড় একটি ঘাটতি হলো সঠিক তথ্য-উপাত্তের অভাব। এক প্রতিষ্ঠান যে তথ্য দেয়, অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্যের সঙ্গে তার মিল থাকে না। আমাদের প্রকৃত জনসংখ্যা কত, খাদ্যের চাহিদা কত, কতটা উৎপাদন হলো, কতটা আমদানি করতে হবে এবং ঠিক কখন মজুত পণ্য বাজারে ছাড়লে দাম স্থিতিশীল থাকবে—এ বিষয়গুলোতে সমন্বিত উদ্যোগের বড় অভাব রয়েছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা চাঙ্গা করতে না পারলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো যাবে না।
দ্বিতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। অনেক সময় নীতিনির্ধারকরা বলেন যে, পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও দাম বাড়ার মানে হলো, সরবরাহ ব্যবস্থায় কারসাজি বা ম্যানিপুলেশন হচ্ছে। অবৈধ মজুতদারি বা গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং এখানেই নজরদারি বাড়াতে হবে।
প্রশ্ন: অনেক সময় সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও, সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে এর কোনো সুফল বা স্বস্তি পান না। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমলেই সাধারণ মানুষ স্বস্তি পায় না, যদি না তাদের আয় বা ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। ধরুন, কোনো পণ্যের দাম ১০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ টাকা, এরপর ২৮ টাকা হলো। এখন দাম বাড়ার হার বা মূল্যস্ফীতি হয়তো কিছুটা কমলো; কিন্তু মূল্যস্তর তো সেই ২৮ টাকাতেই রয়ে গেল! তাই সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে ভাবে না; তারা দেখে বাজারের বর্তমান মূল্যস্তর কত এবং তাদের আয় দিয়ে সেটি সামাল দেওয়া যাচ্ছে কি না। শূন্য মূল্যস্ফীতি বলে কিছু নেই, মূল্যস্তর ধীরে ধীরে বাড়বে—এটাই অর্থনীতির নিয়ম। কিন্তু এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানও বাড়তে হবে।
প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগাতে হলে শুধু সাধারণ কাজ নয়, তাদের জন্য শোভন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। ইন্টারনেটের গতি বাড়িয়ে ফ্রিল্যান্সিং বা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক শ্রমবাজারের সুযোগও পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।
প্রশ্ন: সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে, যেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে নীতি সুদহার ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। উচ্চ সুদহারের কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন। আমরা কি তবে একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে গেছি?
মোস্তাফিজুর রহমান: হ্যাঁ, এটি আসলেই একটি দুষ্টচক্র। নীতি সুদহারের সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার সরাসরি সম্পর্কিত। তবে একজন উদ্যোক্তার জন্য শুধু সুদের হারই শেষ কথা নয়; তার সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ কত দাঁড়াচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমি যদি নীতি সুদহার কমিয়েও দিই; কিন্তু উদ্যোক্তারা যদি কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বা গ্যাস না পান, তবে তো বিনিয়োগ হবে না। কিছুদিন আগেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, নতুন কোনো কারখানায় গ্যাস দেওয়া হবে না। জ্বালানির মতো এ ধরনের মৌলিক চাহিদা সমাধান না করে শুধু মুদ্রানীতি বা রাজস্ব নীতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যাবে না।
প্রশ্ন: দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও তো আমরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো কীভাবে সফল হচ্ছে?
মোস্তাফিজুর রহমান: এখানে উদাহরণস্বরূপ ভিয়েতনামের কথা বলা যায়। তাদের জিডিপি আমাদের চেয়ে কিছুটা কম হওয়া সত্ত্বেও তাদের রপ্তানি প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে বিশাল বাণিজ্য তারা পরিচালনা করছে। এত বড় কর্মযজ্ঞ তারা সামলাচ্ছে তাদের উন্নত বন্দর, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো দিয়ে।
আমাদের এখন এ বড় প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করায় নজর দিতে হবে। জ্বালানি খাতে যে স্থবিরতা ছিল, তা কাটাতে এখন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনাও হচ্ছে। এগুলো যদি সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা দূর হবে।
পরিশেষে বলব, এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের ত্রিমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রথমত, জ্বালানি ও অবকাঠামো সমস্যার সমাধান; দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং তৃতীয়ত, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ঋণের সুদের হার সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
সঠিক পদক্ষেপগুলো নিলেও এ গভীর সংকট কাটিয়ে উঠে অর্থনীতিকে ফের একটি টেকসই ও গতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমাদের অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। আর আমাদের এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে হলে এ গতিশীলতা অর্জন আমাদের দরকার হবে।
প্রশ্ন: গ্যাস বা অন্যান্য সংকটের কারণে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো তাদের অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে বলে দেখা গেছে। মেঘনা গ্রুপ ইপিজেডে ১৪টি কারখানা স্থাপন করেও গ্যাস পাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনের দিনে কি এ সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে মনে করেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: সরকার এ সংকট উত্তরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এ পদক্ষেপগুলো আরও দ্রুত ও সময়মতো কার্যকর করা সম্ভব কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমাদের একটি আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করতে হবে, তা সৌরবিদ্যুতের প্রসারণ হোক বা গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন জোরদার করাই হোক।
সমস্যা হলো, এ সমাধানগুলো আরও আগে হওয়া প্রয়োজন ছিল। আগের সরকারের ভুলের দায়ভার বর্তমান সরকার নেবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেখানে যেন কোনো ধরনের বিচ্যুতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে। কোনো উদ্যোক্তা হয়তো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা করেছেন, কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছেন না। অথচ তাকে ঠিকই ব্যাংকের সুদ গুনতে হচ্ছে। এ সংকট শুধু বিদ্যুৎ-জ্বালানি বা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি ব্যাংকিং খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে এবং সরকারের রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো এ দুষ্টচক্র যেন দীর্ঘায়িত না হয়, তা নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন: সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে, সেখানেও তো প্রশ্ন উঠছে। যেমন—পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই একটি প্রতিষ্ঠানকে এফএসআরইউ বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়া হয়েছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে…
মোস্তাফিজুর রহমান: কিছু সিদ্ধান্ত অবশ্যই আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে না। দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া ঠিকমতো হচ্ছে কি না, ক্রয় প্রক্রিয়া বা নেগোসিয়েশন স্বচ্ছতার সঙ্গে হচ্ছে কি না এবং সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে কি না—এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। আগের শাসনামলে এসব জায়গায় যে ধরনের ব্যত্যয় আমরা দেখেছি, তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।
আমাদের বুঝতে হবে যে, ভালো অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত রাজনীতির জন্যই মঙ্গলজনক। এ উপলব্ধি যদি নীতিনির্ধারকদের না আসে, তবে আমরা এ দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারব না। নির্মোহভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ছোটখাটো ভুল হয়তো শুধরে নেওয়া যায়; কিন্তু বড় ভুলের মাশুল গোনা অত্যন্ত কঠিন।
প্রশ্ন: আমাদের অর্থনীতির প্রধান দুটি স্তম্ভ হলো প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাক খাত। এ দুটি খাতের ওপর ভর করে টিকে থাকা অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারের কী করা উচিত বলে মনে করেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: বৈদেশিক খাতকে অবশ্যই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, এর ওপরই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা, আমদানি সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ভর করছে।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর সময় তাদের যথাযথ দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শ্রমবাজারে কারা কাজ পাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। নেপালের তুলনায় আমাদের কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ দুই থেকে তিন গুণ বেশি। বিবিএসের পরিসংখ্যানেই দেখা যায়, একজন দরিদ্র কর্মীর বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতেই প্রায় দুই বছর লেগে যায়। এ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন না আনলে দেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারকদের জন্য তা বুমেরাং হবে। আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় এখন আর আগের মতো ১ শতাংশেরও কম সুদে ঋণ পাচ্ছি না, আমাদের ৩-৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
বিশ্বজুড়ে এখন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যাকে বলা হয় সিলভার ইকোনমি। এটি আমাদের জন্য বিশাল একটি বাজার হতে পারে। এ অর্থনীতিতে শুধু নার্সিং বা চিকিৎসা সেবাই নয়, বয়স্কদের উপযোগী পোশাক, পর্যটন এবং ব্যক্তিগত সেবার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। আমাদের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে এ বাজারের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এমনকি আমাদের তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গেও এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, কারণ বয়স্কদের জন্য বিশেষায়িত পোশাকের চাহিদা আগামীতে বাড়বে।
প্রশ্ন: পরিবর্তিত বিশ্ববাজারে এ খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও সুসংহত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন?
মোস্তাফিজুর রহমান: তৈরি পোশাক খাতের ভেতরেও বৈচিত্র্য আনতে হবে, বিশেষ করে নন-কটন বা পলিস্টার ও সিনথেটিক পোশাকের দিকে নজর দিতে হবে, কারণ এর বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। উদ্যোক্তারা যেন নির্বিঘ্নে উৎপাদন করতে পারেন, সেজন্য ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি নিরবচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে তাদের সহায়তা করতে হবে।
সবশেষে বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলব। গত বছর আমরা ২ বিলিয়ন ডলারও বিনিয়োগ আনতে পারিনি। যে বিনিয়োগ বেড়েছে তার অর্ধেকই ছিল আগের মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ। অন্যদিকে, পত্রিকায় দেখলাম ভিয়েতনাম গত ৯ মাসে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এনেছে। তারা সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকসের মতো নতুন খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং, এ জায়গাগুলোতে অনেক বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আমাদের প্রয়োজন হবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এমন কোনো অদৃশ্য খরচ কি আছে, যা সরকারি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না; কিন্তু সাধারণ জনগণকে তার ভার বহন করতে হয়?
মোস্তাফিজুর রহমান: তা তো আছেই। আমাদের দেশে একটি বড় সাবমার্জড বা ব্ল্যাক ইকোনমি (ছায়া অর্থনীতি) রয়েছে, যেখানে এমন অনেক লেনদেন হয়, যা সরকারি হিসাবে আসে না। আগে এ ছায়া অর্থনীতি সরকারের খাতায় না থাকলেও দেশের ভেতরেই আবর্তিত হতো; ফলে কর্মসংস্থান, ভোগ বা আয় বাড়ত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এ কালো টাকার একটি বড় অংশ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। অর্থাৎ রেমিট্যান্স বা বৈধ আয় দেশে আসেনি, বরং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে চলে গেছে। ফলে দেশে যে নতুন ভ্যালু তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।
এর একমাত্র সমাধান হলো সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরে এটি কার্যকর করতে হবে। দুর্নীতি একেবারে নির্মূল করা হয়তো সম্ভব নয়; কিন্তু দুর্নীতি করলে তার যে কঠোর শাস্তি হয়—সেই সংস্কৃতি চালু করতে হবে। এটি করা গেলে সৎ মানুষ উৎসাহিত হবেন এবং সমাজে দুর্নীতির প্রবণতা কমে আসবে।
আমরা এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছি। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে—পরিবর্তন, সুশাসন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আকাঙ্ক্ষা, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা জরুরি। বর্তমান সরকার সেই ম্যান্ডেট নিয়েই এসেছে, তাই সামনের দিনগুলোতে এ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: বর্তমান নীতিনির্ধারকদের কোন অর্থনৈতিক ভুলটির কারণে আজ থেকে পাঁচ বছর পর বাংলাদেশকে সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
মোস্তাফিজুর রহমান: এক শব্দে যদি বলি, সেটি হলো জবাবদিহির অভাব। আমরা যদি কাউকে জবাবদিহির আওতায় না আনি, তবে তিনি দুর্নীতি করলেও বা ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও তার কোনো প্রতিকার করা যাবে না। কেউ যদি কোনো প্রকল্পের দায়িত্বে থেকে ১০ টাকার কাজ ৫০ টাকায় করেন বা ৩ বছরের প্রকল্প ৮ বছরে শেষ করেন এবং তার জন্য যদি কোনো জবাবদিহি করতে না হয়, তবে এ ভুলের মাশুল শুধু পাঁচ বছর পর নয়, পরবর্তী প্রজন্মকেও দিতে হবে।
সুতরাং, আমাদের একটি জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজ নিজ দায়িত্বে এর প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তবে এর প্রধান পূর্বশর্ত হলো, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, এ চর্চাটি প্রথমে তাদের কাছ থেকে আসতে হবে। ওপরের স্তরে জবাবদিহি না থাকলে, নিচের স্তরের কেউই পরোয়া করবে না; সবাই ভাববে, ওপরের মানুষটিই তো করছেন, আমি করলে আর সমস্যা কী!
প্রশ্ন: আগামী পাঁচ বছরের জন্য যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির সংস্কারের রূপরেখা তৈরি করতে বলা হয়, তবে আপনার মতে প্রথম পাঁচটি সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত?
মোস্তাফিজুর রহমান: সংস্কারের ক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবিত পাঁচটি প্রধান সিদ্ধান্ত বা ক্ষেত্র হলো—
প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার: আমরা এ খাতে একটি বড় ব্ল্যাক হোল-এ পড়েছি, যেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত জরুরি। এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করা হচ্ছে, যাতে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়। তবে এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা দিতে হবে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবমুক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অভিভাবক হিসেবে তার নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব খাতের সংস্কার: রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং তার বাস্তবায়ন—এই দুটিকে আলাদা করা যায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে মূল লক্ষ্য হতে হবে করের আওতা বা ট্যাক্স বেস বাড়ানো।
আমাদের দেখতে হবে করের ভিত্তি কতটা বাড়ানো যায়। দেশে এক কোটির বেশি টিআইএনধারী আছেন; কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন রিটার্ন জমা দেন বা কর দেন? আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ কিন্তু চাল, ডাল, তেল, চিনি কিনতে গিয়ে ঠিকই কর (ভ্যাট) দিচ্ছেন। আমাদের মোট রাজস্বের দুই-তৃতীয়াংশই আসে অপ্রত্যক্ষ কর থেকে। তাই দেশে করের ভিত্তি কম—এ কথা বলা যাবে না। আমাদের মূলত প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি কম। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে এ প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি বাড়ানো সম্ভব।
তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা: এ খাতে এখন আমাদের অ্যাগ্রেসিভলি পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে কূপ খনন জোরদার করতে হবে। আমাদের বিশাল কয়লার মজুত রয়েছে; কিন্তু এটি উত্তোলনের বিষয়টি একটি বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিবেশের ক্ষতি না করে কতটুকু কয়লা তোলা যায়, তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সংলাপ হওয়া প্রয়োজন, যা এখনো হচ্ছে না।
চতুর্থত, খাদ্য নিরাপত্তা ও সুশাসন: বর্তমানে বড় কোনো সংকট নেই বলে এটি নিয়ে আমরা কম আলোচনা করছি; কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। খরা বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের পর্যাপ্ত মজুত থাকতে হবে। সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং সঠিক সময়ে আমদানির হিসাব নিখুঁতভাবে করার পদক্ষেপ নিতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। রাষ্ট্র এবং আমাদের মতো নন-স্টেট অ্যাক্টরদের সমন্বয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ নাগরিক নিরাপদে কাজ করতে পারবেন।
পঞ্চমত, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার: আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে শিক্ষায় আমাদের অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। এত দিন আমরা শুধু পরিমাণগত দিক (যেমন: পাসের হার বা এনরোলমেন্ট) নিয়ে মেতে ছিলাম। এখন সময় এসেছে গুণগত উৎকর্ষ বাড়ানোর।
তরুণ প্রজন্মকে একটি উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে গড়ে তুলে তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের গন্তব্য হওয়া উচিত—একটি আর্থিকভাবে উন্নত, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র। এ গন্তব্যে পৌঁছাতে হলে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা অপরিহার্য। একই সঙ্গে তরুণদের সামনে আশার আলো দেখাতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন মানুষদের থাকতে হবে, যাদের নতুন প্রজন্ম আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে পারে। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলেই বাংলাদেশ তার যে অঙ্গীকার আছে, তা বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।
প্রশ্ন: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মোস্তাফিজুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।


