Originally posted in কালেরকণ্ঠ on 18 October 2026

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩.২ শতাংশ এবং গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশ। এপ্রিলে আইএমএফ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল ৪.৩ শতাংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামোতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৮.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রয়েছে। ব্যবধানটি বড়, তবে দুটি সংখ্যা একই ধরনের হিসাব নয়। আইএমএফের হিসাবটি বর্তমান অর্থনৈতিক সূচকগুলোর অবস্থার ভিত্তিতে করা পূর্বাভাস। অন্যদিকে, সরকারেরটি সংস্কার ও বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জিত হলে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা।
আইএমএফ এত কম প্রবৃদ্ধি দেখছে কেন? কারণ, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রধান চালকগুলো দুর্বল। বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক হালনাগাদে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ ও রপ্তানির গতি কমেছে, মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাচ্ছে এবং ব্যবসার খরচ বাড়াচ্ছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সীমিত রাজস্বের কারণে সরকারি বিনিয়োগও চাপে।
তা ছাড়া খেলাপি ঋণের অনুপাত অনেক বেশি, রাজস্ব আদায় নিম্ন পর্যায়ে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগকে আরো বাধাগ্রস্ত করছে।
২০২৬ সালের জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হচ্ছে—আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেশি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ। তা ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। আইএমএফ ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশে নামবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিনিয়োগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ বছরের কাঠামোতে বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে এবং রাজস্ব আয় ১১ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য আছে। তা অর্জনে ব্যাংক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো জরুরি। উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সরকারের একটি দিকনির্দেশনা। কিন্তু সংস্কারে দেরি হলে ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব প্রবৃদ্ধির ব্যবধান থাকবে।
আইএমএফের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ২.২ শতাংশে নেমে ২০৩০-৩১ সালে প্রায় ৩ শতাংশে উঠতে পারে। এটি সরকারি ৮.৫ শতাংশ লক্ষ্যের অনেক নিচে। তবে আইএমএফের হিসাব কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। এটি যেহেতু বর্তমান প্রবণতার ভিত্তিতে করা পূর্বাভাস, তাই নতুন তথ্য ও নীতির ভিত্তিতে হিসাব বদলাতে পারে। তবে এটি ইঙ্গিত করে, সংস্কার ছাড়া অর্থনীতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্রুত পুনরুদ্ধার করবে না।
আইএমএফের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে ভারত ৭ শতাংশ, ভুটান ৬.৯ শতাংশ, মালদ্বীপ ৩.৮ শতাংশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা ৩.৭ শতাংশ এবং পাকিস্তান ৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। ভারতের প্রবৃদ্ধিতে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সেবা খাত সহায়ক। ভুটানে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পাকিস্তানে ঋণপ্রবাহের উন্নতি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রবৃদ্ধি বাড়াচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও সেবা, পর্যটন ও সাম্প্রতিক পুনরুদ্ধার ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের তুলনায় এসব দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বেশি; তবে দেশভেদে প্রবৃদ্ধির চালকগুলো আলাদা।
বাংলাদেশের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা। একই সঙ্গে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ, খেলাপি ঋণ আদায় ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ জরুরি। কর ফাঁকি ও অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমিয়ে রাজস্ব বাড়াতে হবে। সামাজিক সহায়তা যেন দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি কার্যকর করা দরকার। বর্তমানে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
আইএমএফের পূর্বাভাসকে অনিবার্য ভবিষ্যৎ ভাবা ঠিক নয়, আবার উপেক্ষাও করা যাবে না। সরকারের উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে সংস্কার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান অগ্রগতির ওপর। এখন মূল প্রশ্ন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কত উঁচু হবে তা নয়। বরং কিভাবে মূল্যস্ফীতি কমবে, উৎপাদন বাড়বে, বিনিয়োগ ফিরবে এবং মানুষের জন্য কাজ তৈরি হবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি।


