এলডিসি উত্তরণের বাড়তি সময়ের সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর সংস্কারের ওপর – ড. ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in কালের কণ্ঠ on 31 October 2026

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য আরো তিন বছর সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও একই সুবিধা পেয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাড়তি সময় পাওয়া স্বস্তির বিষয়। তবে এই সময়কে শুধু বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার সুযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং অর্থনীতির দীর্ঘদিনের দুর্বলতা দূর করা এবং এলডিসি-পরবর্তী পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হওয়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।

জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য প্রধানত তিনটি সূচক বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা। সাধারণভাবে তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি সূচকে নির্ধারিত মান অর্জন করতে হয়। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) প্রতি তিন বছর পরপর দেশগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন করে।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মান অর্জন করে। ২০২১ সালের মূল্যায়নেও এই সাফল্য ধরে রাখায় সিডিপি বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ করে। এরপর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এবং সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর উত্তরণের সময় নির্ধারিত হয়।

তবে উত্তরণের সূচকগুলোতে ভালো ফল করলেই অর্থনীতির সব দুর্বলতা দূর হয়ে যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের সংকট, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং রপ্তানিতে সীমিত বৈচিত্র্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব এবং জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহের ঝুঁকি।

এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির কাছে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি বাংলাদেশের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বাড়তি সময় দেওয়ার পক্ষে মত দেয়। তবে তারা স্পষ্ট করে যে এই সময়ে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করতে হবে। জাতিসংঘ একই সঙ্গে সংস্কার, উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশ ২০২৫ সালের শুরুতে ১৫৭টি করণীয়সহ একটি মসৃণ উত্তরণ কৌশল (এসটিএস) গ্রহণ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এর অগ্রগতি সন্তোষজনক হয়নি। এখন নতুন করে আরেকটি বড় পরিকল্পনা তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান কৌশলটি পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। কোন কাজ ২০২৭, ২০২৮ ও ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। প্রতিটি কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। উচ্চপর্যায়ের তদারকির পাশাপাশি নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন।

সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে

আগামী তিন বছরে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। করব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করার একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

সরকারি ব্যয়েও অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে হবে। কম গুরুত্বপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে অর্থ ব্যয় না করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনশীল অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ আদায় জোরদার করা, ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি শক্তিশালী করা জরুরি। ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক খাতের সংস্কারকে এককালীন উদ্যোগ নয়, একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে নিতে হবে। সুস্থ ব্যাংকব্যবস্থা ছাড়া উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

বাণিজ্যচুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে

এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্য বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের কিছু সুবিধা হারাবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি বাজারে উত্তরণের পরও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে, তবু দীর্ঘমেয়াদে বাজারপ্রবেশ নিশ্চিত করতে এখন থেকেই প্রস্তুতি প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি (এফটিএ) ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তির প্রাথমিক আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রস্তুতি এগিয়েছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। এসব উদ্যোগকে সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।

জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (সিইপিএ) ৪ আগস্ট ২০২৬ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব চুক্তির সুবিধা শুধু শুল্কমুক্ত রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন, যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এসব দেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকস এবং হালকা প্রকৌশলপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সম্ভাবনাময় খাতগুলোর জন্য বিশেষায়িত শিল্পকেন্দ্র, উৎপাদন ও রপ্তানিতে ভালো ফলের ভিত্তিতে করসুবিধা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে।

তবে যেকোনো বাণিজ্যচুক্তির আগে আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে দেশীয় শিল্প, কর্মসংস্থান, ভোক্তা ও সরকারি রাজস্বের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা মূল্যায়ন করতে হবে। চুক্তির সাফল্য শুধু স্বাক্ষরের সংখ্যা দিয়ে নয়, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল, তা দিয়ে বিচার করতে হবে।

রপ্তানি সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে

বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তৈরি পোশাকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কমাতে নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রচলিত রপ্তানি খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

পণ্য পরিবহনের খরচ কমানো, বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ এবং ব্যবসার প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে শ্রম অধিকার, পরিবেশ ও পণ্যের মানসংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করতে হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মেধাস্বত্বসংক্রান্ত চুক্তি (ট্রিপস) অনুযায়ী এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিশেষ ছাড়গুলোও উত্তরণের পর পরিবর্তিত হবে। তাই বিশেষ করে ওষুধশিল্পের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে প্রযুক্তি ব্যবহার, গবেষণা এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

জলবায়ু ঝুঁকি ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সহজ শর্তে জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

একই সঙ্গে উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কোনো শিল্প বা শ্রমিকগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন কর্মসংস্থান এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়তি সময়ে নিতে হবে বাস্তব সংস্কার কর্মসূচি

এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য আরো তিন বছর পাওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। তাই সরকারকে এখনই সময়ভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং প্রতি বছর তার অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করা নয়; বরং এমন একটি শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা ছাড়াও টেকসই উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে পারে। বাড়তি তিন বছরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এই লক্ষ্য অর্জনে কতটা কার্যকর সংস্কার করা সম্ভব হয়, তার ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ এবং সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

Get latest updates of CPD's research, policy discourse, publications, and events.