Originally posted in জাতীয় অর্থনীতি on 4 November 2026

ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো। তিনি ২০১৭ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে এমএসসি ও পিএইচডি ডিগ্রিধারী এই অর্থনীতিবিদ যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। সামষ্টিক অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, জ্বালানি, আর্থিক খাত, বাণিজ্য এবং উন্নয়ননীতি নিয়ে তার দীর্ঘদিনের গবেষণা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, নীতি প্রণয়ন ও সাধারণ মানুষের ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়ে তিনি নিয়মিতভাবে গবেষণা ও মতামত দিয়ে আসছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সানজিদুল ইসলাম
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনশক্তি সরবরাহকারী দেশ হলেও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না কেন? এর পেছনে প্রধান অর্থনৈতিক ও নীতিগত দুর্বলতাগুলো কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন: বাংলাদেশের বড় শ্রমশক্তি থাকলেও শ্রমিকদের দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার নির্ভরযোগ্য সনদ সব সময় বিদেশি নিয়োগদাতার চাহিদার সঙ্গে মেলে না। শ্রমবাজারের তথ্য সংগ্রহ, চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগদাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগেও ঘাটতি রয়েছে। ফলে কর্মীর সংখ্যা বেশি হলেও উচ্চ মজুরির পেশায় বাংলাদেশের উপস্থিতি কম। নীতিতে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যার চেয়ে তাদের আয়, নিরাপদ নিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ ও আধা দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। এই প্রবণতা থেকে বের হতে না পারার কারণ কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন: দ্রুত বিদেশে যাওয়ার আশায় অনেক কর্মী অল্প সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বল্পদক্ষ কাজে যোগ দেন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে বিদেশি নিয়োগদাতার চাহিদার সংযোগ দুর্বল। উন্নত প্রশিক্ষণ, ভাষা শেখা ও সনদ অর্জনে সময় ও অর্থ লাগে, অথচ প্রশিক্ষণ শেষে চাকরি নিশ্চিত হয় না। দক্ষ কর্মীর জন্য বেশি খরচ ও অনিশ্চয়তা থাকায় কর্মী ও নিয়োগকারী— দুই পক্ষই পরিচিত স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারের দিকে ঝোঁকে।
জাতীয় অর্থনীতি: ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতাগুলো কোথায়? প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন: ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম একেকটি ক্ষেত্রে এগিয়ে— কারও ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা, কারও নিয়োগব্যবস্থা ও বিদেশি নিয়োগদাতার সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী। বাংলাদেশের প্রধান দুর্বলতা হলো, প্রশিক্ষণ ও সনদের মানে অসামঞ্জস্য, উচ্চ অভিবাসন ব্যয়, অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা এবং কর্মী পাঠানোর পর পর্যাপ্ত সহায়তার অভাব। ফলে নিয়োগদাতারা দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেন না। দেশভিত্তিক চাহিদা বুঝে প্রশিক্ষণ এবং কর্মীর দক্ষতার গ্রহণযোগ্য সনদ নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: বিদেশে কর্মী পাঠাতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু কেন?
ড. ফাহমিদা খাতুন: চাহিদার তুলনায় চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা বেশি— এই সুযোগে দালাল ও অনানুষ্ঠানিক উপ-এজেন্টরা অতিরিক্ত অর্থ নেয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ ও খরচ স্বচ্ছ নয়; কর্মীরাও যাচাই করা চাকরির তথ্য সহজে পান না। অনেক কর্মী ঋণ নিয়ে বিদেশে যান এবং আয় দিয়ে সেই ব্যয় তুলতে দীর্ঘ সময় নেন।
জাতীয় অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণব্যবস্থার বড় সীমাবদ্ধতা কী?
ড. ফাহমিদা খাতুন: প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়লেই দক্ষতা বাড়ে না; প্রশিক্ষকের যোগ্যতা, যন্ত্রপাতি, হাতে-কলমে শিক্ষা এবং পাঠ্যক্রমের মানও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ নির্দিষ্ট দেশের কাজের নিয়ম, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সনদের মান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না হলে নিয়োগদাতার কাছে দক্ষতা প্রমাণ করাও কঠিন। প্রশিক্ষণকে চাকরির চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করে ভাষা, পেশাগত দক্ষতা, নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রের আচরণ একসঙ্গে শেখাতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশ কেন প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারছে না? নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: এসব বাজারে সুযোগ থাকলেও ভাষা, সনদ, কাজের অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার শর্তপূরণে কর্মীদের প্রস্তুতি সীমিত। নিয়োগদাতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বাজারভিত্তিক দক্ষতা জরিপ এবং দূতাবাসের শ্রমবাজার কূটনীতিও আরও শক্তিশালী করা দরকার। ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বিওইএসএল)-এর মাধ্যমে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়োগের উদ্যোগ রয়েছে; ইউরোপীয় ইউনিয়নের Talent Partnership-ও প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা স্বীকৃতির কাজ করছে। তবে এসব উদ্যোগকে বৃহত্তর পরিসরে নিতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ওপর বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের বড় অংশ নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
ড. ফাহমিদা খাতুন: কয়েকটি দেশের ওপর শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স কেন্দ্রীভূত থাকলে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, অভিবাসননীতি পরিবর্তন বা নির্মাণ খাতের সংকটে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় একসঙ্গে কমে যেতে পারে। এতে ফিরে আসা কর্মীর সংখ্যা, বেকারত্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ধরে রাখার পাশাপাশি এশিয়া ও ইউরোপে নতুন পেশা ও গন্তব্য তৈরি করা জরুরি।
জাতীয় অর্থনীতি: বিদেশে কর্মী নিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগী, অতিরিক্ত ফি, প্রতারণা ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব সমস্যা দূর করতে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও সরকারি তদারকি কতটা কার্যকর?
ড. ফাহমিদা খাতুন: লাইসেন্স, জরিমানা ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকলেও অনানুষ্ঠানিক দালাল, অতিরিক্ত ফি এবং প্রতারণার অভিযোগ রয়ে গেছে। নিয়োগব্যবস্থার তদারকির সক্ষমতা বাড়ানো এবং অনিয়ন্ত্রিত উপ-এজেন্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। ডিজিটাল ব্যবস্থায় এজেন্সির তথ্য ও অভিযোগ সংরক্ষণে অগ্রগতি হয়েছে, তবে দ্রুত তদন্ত, ক্ষতিপূরণ এবং দোষী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকলে এর সুফল সীমিত থাকবে।
জাতীয় অর্থনীতি: বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ডলারের বিনিময় হার ও আমদানি সক্ষমতা রক্ষায় রেমিট্যান্স কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রবাহ কমে গেলে অর্থনীতি কতটা চাপে পড়বে?
ড. ফাহমিদা খাতুন: রেমিট্যান্স দেশে ডলার সরবরাহ বাড়ায়। এতে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা হয়। প্রবাসী পরিবারের জন্যও এই অর্থ খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই প্রবাহ কমে গেলে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতি নয়, বহু পরিবারের জীবনযাত্রাও চাপে পড়তে পারে।
রেমিট্যান্স হঠাৎ কমলে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে। আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হলে জ্বালানি, খাদ্য ও উৎপাদনের উপকরণ আনার ওপর চাপ পড়তে পারে। ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে প্রভাব কতটা হবে তা নির্ভর করবে রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক নীতির ওপরও। রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অর্থনীতির সব সমস্যার একক সমাধান নয়।
জাতীয় অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা মোকাবিলায় জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত নীতিমালা, কূটনৈতিক তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় কতটা কার্যকর? কোথায় সংস্কার সবচেয়ে জরুরি?
ড. ফাহমিদা খাতুন: শ্রমবাজারের চাহিদা নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, কূটনীতি ও কর্মী সুরক্ষার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভাগ করা। কিন্তু সমন্বিত তথ্য ও জবাবদিহির অভাবে নীতির বাস্তবায়ন দুর্বল হয়। সবচেয়ে জরুরি হলো বিদেশি নিয়োগদাতার চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণ যুক্ত করা, দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে নিয়োগ ব্যয় ও কর্মীর অধিকার স্পষ্ট করা, এবং দূতাবাস, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বিওইএসএল) ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একক কর্মপরিকল্পনা গড়া। শ্রমিকের নিরাপত্তা ও ন্যায্য নিয়োগকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে।


