দুর্বল আর্থিক কাঠামোই বড় চিন্তার কারণ – তৌফিকুল ইসলাম খান

Published in বাংলা ট্রিবিউন on Friday 14 June 2019

নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন নেতৃত্ব এবং বর্তমান অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতি, তিন বিবেচনাতেই আগামী বছরের বাজেট নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আগ্রহ ছিল। এবারের বাজেট সম্প্রতি দুর্বল আর্থিক কাঠামোর দুষ্টচক্র থেকে বের হবে, এ প্রত্যাশা ছিল সবচেয়ে বেশি। বাজেট যেহেতু মূলত সরকারের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক পরিকল্পনা, তাই এটি যদি সুশৃঙ্খলভাবে না করা হয়, তবে তার প্রকৃত কার্যকারিতা সবসময়ই প্রশ্নের সম্মুখীন থাকে। গত পাঁচ বছরে আয়, সরকারি ব্যয় বা বিনিয়োগের বিচারে বাজেট বাস্তবায়নের হার ক্রমেই কমে আসছে।

পাঁচ বছর আগেও এ হার যেখানে ৯০-৯৫ শতাংশ ছিল, তা এখন ৭৫-৮০ শতাংশে নেমে এসেছে। তাই আগামী অর্থবছরের আয় বা ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রণয়নে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, যা আপাতদৃষ্টিতে খুব বেশি নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরে যে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি অনুমিতি ধরা হয়েছে (৪৬ দশমিক ২ শতাংশ), তা অর্জন করা সম্ভব নয়। সংশোধিত বাজেটে মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব কাটছাঁট করা হলেও প্রকৃত পক্ষে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ৮৫ হাজার কোটি হতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বছর শেষে হয়তো ৪৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। মনে রাখতে হবে, অর্থমন্ত্রীই গত মাসে সংসদে জানিয়েছেন, এই অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মাত্র ১১ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই ধরনের বাস্তবতা সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতির বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের অর্থনীতির আকার এবং আমাদের উন্নয়ন অভিলাষের বিচারে, আমাদের সরকারি আয় বা ব্যয়ের পরিমাণ কিন্তু বেশি নয়। একইভাবে ঘাটতি অর্থায়নের ক্ষেত্রে যে নাটকীয় কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা এবারের বাজেটে দেওয়া হলো তা অতীতেও পেশ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন করা যায়নি।

জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি থেকে নেওয়া ঋণ কীভাবে আগামী অর্থবছরে একলাফে ৪৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হবে, তার কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার পরিবর্তনের ঘোষণা বাজেট ঘোষণায় অন্তত পাওয়া গেলো না। আগামী অর্থবছরে ৯৬০ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ সঞ্চালন করা যে সহজ হবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ বছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার বিবেচনাও সহজ নয়। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী ঋণের পাশাপাশি নতুন করে তারল্য সংকটও দেখা দিয়েছে। বাজার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে জোর করে সুদের হার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মাঝে ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়া ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থাই নির্দেশ করে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এ ঋণ সরবরাহ করতে প্রস্তুত আছে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

সত্যিকার অর্থে প্রস্তাবিত বাজেটের আর্থিক কাঠামো অটুট রেখে বাজেট বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যাংকিং খাতে নাটকীয় ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের জরুরি বিষয়টি বাজেট বক্তৃতায় যথাযথ স্থান পায়নি।

অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় টাকার মুদ্রামান কমিয়ে আনার বিষয়টি আবশ্যক ছিল বলেই আমার মনে হয়েছে। আমি কিছুটা অবাক হয়েছি এটা দেখে যে, বাজেটের সামষ্টিক অর্থনীতির নীতি পরিকল্পনায় বরং টাকাকে আগামী বছর আরও অতি মূল্যায়ন করার অনুমিতি নেওয়া হলো। টাকার অবমূল্যায়নের যে প্রয়োজনীয়তা আছে, তা বাজেটে রফতানিকারকদের অতিরিক্ত ১ শতাংশ এবং রেমিটেন্স প্রবাহে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাবনা থেকেই স্পষ্ট। ২-৩ শতাংশ টাকার অবমূল্যায়ন করে এ ধরনের রাজস্ব ব্যয়ের চাপ থেকেও বের হয়ে আসা যেতো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতিমালায়ও এ ব্যবস্থা অধিকতর গ্রহণযোগ্য। বরং এ থেকে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে সম্প্রতি কৃষকরা ধান উৎপাদনে যে ক্ষতির সম্মুখীন হলো, তাদের এককালীন নগদ ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতো। সিপিডি’র পক্ষ থেকে সম্প্রতি আমরা প্রত্যেক কার্ডধারী কৃষককে ৫০০০ টাকা এককালীন নগদ ক্ষতিপূরণ সরাসরি ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে দেওয়ার প্রস্তাব করি। বাজেটে যদি দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের ওপর আয়করের সারচার্জ সীমা বাড়িয়ে প্রণোদনা না দিয়ে আয় বৈষম্য হ্রাসেই গুরুত্ব দেওয়া হতো, তা হলেই তা বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে নতুন করে ‘কালো টাকা সাদা’ করার সুবিধা সাংঘর্ষিক বলেই মনে হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বরাদ্দ না বাড়াটা অবশ্যই হতাশাজনক।

বাজেটে যুব উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্ট-আপ তহবিল নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। নতুন মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আইনের প্রণয়ন নিয়ে হয়তো এখনও অনেক আলোচনা ও পরিমার্জন প্রয়োজন; কিন্তু ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর নমনীয় মনোভাব এ আইনকে আরও সুসংহত করার সুযোগ তৈরি রেখেছে। তবে রাজস্ব আদায় এ সংস্কারের পর সত্যিকার গতি পাবে বলে আশা করি।

 

লেখক: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি), ঢাকা