Originally posted in আমাদের সময় on 25 February 2026
৩ সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তারেক রহমান
বিএনপি নতুন সরকার গঠনের পর জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এক সপ্তাহে তারেক রহমানের কাছে জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে আশাবাদ। দেশ পরিচালনায় তারেক রহমান পুরোনো প্রথা ভেঙে নতুন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।
সরকারের সুফল পেতে মোটা দাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে নতুন সরকারকে। প্রথমত, ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে ব্যবসায়ী সমাজসহ জনগণের মধ্যে স্বস্তি তৈরির পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ স্বার্থ ও লাভের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ প্রশ্নে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এখন অনেকটাই দৃশমান।
এমন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে সরকারকে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে সমাজ তথা দেশকে স্থিতিশীল করাও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ পরাশক্তি হিসাবে পরিচিত রাষ্ট্রগুলোর নানামুখী চাপ আছে বাংলাদেশে। এসব দেশের আছে আলাদা-আলাদা স্বার্থ। ইন্দোপ্যাসিফিক আউটলুকসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, কানেক্টিভিটিতে বাংলাদেশকে কে কীভাবে কাছে পাবে, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাবনিকাশ। ‘বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী’-এমন কূটনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করা হলেও বস্তুত শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে দেশগুলোর মধ্যে রীতিমতো এখন চলছে প্রতিযোগিতা। ফলে ভূরাজনৈতিক এবং দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এসব বিষয়ে ‘ভারসাম্য’ অবস্থা তৈরি করা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে এই তিন দেশের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, পাকিস্তান, মিয়ানমারেরও আছে নানা ইস্যু। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। সে আলোকে বিভিন্ন দেশের এসব চাপ ও চাওয়াপাওয়া মোকাবিলা করে দেশের স্বার্থরক্ষায় প্রাধান্য দিতে হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
উন্নয়ন সহযোগী যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণ্যিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি নতুন করে সামরিক কেনাকাটায় আগ্রহী। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বেশকিছু চুক্তি করেছে তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে চীনের আধিপত্য বিস্তার তারা ভালোভাবে নিচ্ছে না বলে ইতোমধ্যে বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।
এদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প আছে চীনের। রপ্তানিসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও অন্যতম অংশীদার তারা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চীনের সঙ্গে বেশকিছু চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। চীন বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে আগ্রহী। কিন্তু বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোয় তৃতীয় পক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ চায় না বেইজিং। ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনকালে ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা খাত, বিদ্যুৎসহ নানা সেক্টরে চুক্তি হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তলানিতে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় দুদেশের মধ্যে সৃষ্ট অস্বস্তি এখনো পুরোপুরি কেটেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইতোমধ্যে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চায় বলে জানিয়েছেন ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। দেশটির সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক বার্তা এসেছে। পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী মনোভাব নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী ভারত। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার। রোহিঙ্গা ইস্যুর পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্ত এবং আরাকান আর্মি নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বৈরিতাও বিরাজমান। সব বিষয়ই ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে সামাল দেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলে, বাংলাদেশের জন্য প্রধানতম চ্যালেঞ্জ ভূরাজনীতিতে প্রবল একটি চাপ দেখা যাচ্ছে। বৃহৎ বৈশ্বিক শক্তি, আঞ্চলিক শক্তি-দুইটিই সক্রিয়। বিষয়গুলোর সঙ্গে আমরা আগে খুব বেশি পরিচিত ছিলাম না। এখন বাস্তবতায় পালটাপালটি যে চাপ দেখা যায়, সেটি নতুন অভিজ্ঞতা। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোয় আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সহমত দরকার। কারণ, আমাদের মধ্যে সহমত না থাকলে একেক পক্ষ একেকদিকে টানবে। এর ফলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জাতীয় স্বার্থের এসব বিষয়ে জনমতও দরকার। বিষয়টি যেন এমন হয়, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক একই থাকবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলছেন। বাংলাদেশের স্বার্থের আলোকে যে শক্তির সঙ্গে যে যে বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে আমরা মনোযোগী হব। এখানে লক্ষ রাখতে হবে, এসব শক্তিধর দেশের মধ্যে পারস্পরিক যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, সেখানে যেন আমরা না ঢুকে পড়ি। উদাহরণ হিসাবে বললে, চীনের সঙ্গে এমন জায়গাগুলোয় কাজ করব, যেখানে অন্যদের আসার সুযোগ নেই। যেসব জায়গায় প্রতিযোগিতা আছে, সেখানে আমরা পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও কাজ করতে পারি। আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে আরও বেশি কাজ করতে পারি। ভিয়েতনাম কীভাবে একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে সুন্দরভাবে, সেগুলো দেখে আমাদের বাস্তবতায় প্র্যাকটিস করা উচিত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঐতিহ্যগত কূটনীতি অবলম্বন না করে নিজের মতো কূটনীতি শুরু করেছেন। সেটা আরও অনেক দেশকে প্রভাবিত করেছে। তারা রাখঢাক না রেখে সরাসরি কথা বলছে। এই পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি বর্তমান সরকারের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
তিনি বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইতোমধ্যে অনেকগুলো চুক্তি করেছে। চীন ও ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও অনেকগুলো চুক্তি হয়েছে। এ চুক্তিগুলোর ধারাবাহিকতা এখন বর্তমান সরকারকে বহন করতে হবে। বিষয়টি অনেক চ্যালেঞ্জিং। এ চুক্তিগুলো পুনরায় নিরীক্ষা করতে হবে। কোনো চুক্তিতে একেবারেই বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা না হলে সেগুলো থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে। আর যদি সরকার মনে করে, যে চুক্তিগুলো করা হয়েছে, সেগুলো চ্যালেঞ্জিং হলেও বাংলাদেশ মোকাবিলা করতে পারবে, তাহলে সেগুলো মোকাবিলা করতে হবে। কোনো চুক্তিতে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ‘কনফ্লিক্ট’ করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত জটিলতা ও আরাকান আর্মির প্রভাব বৃদ্ধির মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরাকান আর্মিকেও আমলে নিতে হবে। আবার আন্তর্জাতিক কমিউনিটি, ইউএনএইচসিআর তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কমবেশি আলাপ-আলোচনা করতে হবে।
জনগণের কাছে দেওয়া বিপুল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সামনে বড় বাধার দেওয়াল হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক নানা সংকট। দেশি-বিদেশি ঋণের চাপ, খেলাপি ঋণের বিস্তার, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, দ্রব্যমূল্যে অস্থিরতা ও রাজস্ব সংকট-সব মিলে দেশের অর্থনীতি এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। এই ভয়াবহ সংকট সৃষ্টির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে পতিত আওয়ামী সরকারের আলোচিত অলিগার্ক ও ‘দরবেশ যুগ’। এর সঙ্গে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় ইউনূস সরকারের দেড় বছরের ‘মব কালচার’। সবকিছু মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি গভীর খাদে আটকা পড়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের সামনে এখন বড় সংকট দেশি-বিদেশি ঋণের ভয়াবহ চাপ। আবার বিনিয়োগের অভাবে শিল্প খাত একরকম স্থবির হয়ে আছে। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে না, বাড়ছে বেকারত্ব। এছাড়া পিছু ছাড়ছে না টাকার সংকট। মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টেনে ধরাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতি নিয়ে এমন শঙ্কার বাইরে ছিলেন না সদ্য বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। এজন্য তিনি শেষ সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার পরার্মশ দেন। এর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি-ব্যবস্থাপনা সুচারুরূপে সম্পন্ন করা, বাজার পর্যবেক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চলমান সমস্যা দূরীকরণ এবং সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা। এছাড়া রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস চালুর ওপর জোর দেন।
দেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি সরকারের সামনে উল্লেখযোগ্য সংকটের মধ্যে রয়েছে-বিপুল অঙ্কের ঋণ পরিশোধ ও অভ্যন্তরীণ ব্যয় মেটাতে টাকার যোগান ঠিক রাখা। এরই মধ্যে চলে আসছে আগামী বাজেট। এক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থ সংগ্রহ। কারণ, পর্যাপ্ত টাকার সংস্থান না থাকলে শক্তিশালী বাজেট দেওয়া কঠিন হবে। এজন্য সরকারকে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগ দিতে হবে। তবে রাজস্ব বোর্ডের পরিস্থিতিও স্থিতিশীল নয়। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে নজর দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। অপর দিকে জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, কৃষি খাতের সার ব্যবস্থাপনার দিকেও বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন উভয় কাজটি একই সঙ্গে করতে হবে। এ দুটি সূচকে ব্যালেন্স সৃষ্টি করাই হবে বড় মুনশিআনার কাজ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সরকারকে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত হচ্ছে-বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে আনা, দ্বিতীয়ত বিনিয়োগ চাঙ্গা করে সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তৃতীয়ত অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। তিনি মনে করেন, মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের অনেক মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। সেটি নিরসন করতে হবে। এছাড়া বিনিয়োগ না বাড়লে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়বে না। আর সব কিছুর জন্য অর্থের প্রয়োজন হবে। বর্তমান রাজস্ব আহরণ দিয়ে বেশি কিছু করা যাবে না। সরকারের অনেক প্রতিশ্রুতি আছে। ফলে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। তার মতে, রাজস্ব খাতে দুর্নীত বন্ধ করে কর জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হবে।
এদিকে টানা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এক ধরনের গলদগর্ম হয়ে পড়েন। নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। গত জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। মূলত সরবরাহ লাইনে সমস্যার কারণে পণ্যের মূল্য বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে। তবে আগামী জুনে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কাছাকাছি আসবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। তার মতে, সরকারের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও কৃচ্ছ সাধনের ফলে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে।
অন্যদিকে ইউনূস সরকার পরিচালন ব্যয়ও কমাতে পারেনি। অল্প সময়ের ব্যবধানে অন্তর্বর্তী সরকারের ঋণ বেড়েছে শতকরা প্রায় ২৬ ভাগ। সরকারি ঋণবৃদ্ধির হার বার্ষিক আনুপাতিক হিসাবে আওয়ামী সরকারের চেয়েও বেশি। এই ঋণ অর্থনীতিতে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করছে। প্রায় ২২ লাখ কোটি টাকার সরকারি ঋণের ভার কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু হয় এই সরকারের। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা তিন লাখ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের মধ্যে অভ্যন্তরীণ (ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র ও কর্মচারীদের ফান্ড) ঋণ প্রায় ১২ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে হবে, যা একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমানোর কাজটিও নিশ্চিত করবে। তবে ঋণের দায় বেশি হওয়ায় একটি মিতব্যয়ী বাজেটের খসড়া তৈরি দরকার বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাজেট প্রণয়ন, ঋণ পরিশোধ সবই নির্ভরশীল রাজস্ব আয়ের ওপর। কিন্তু রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভালো হয়নি। দেশে কর জিডিপির অনুপাত এশীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলো তুলনায় ৮ শতাংশের কম। সমসাময়িক দেশগুলোর তুলনায় অত্যন্ত নিম্নমানের কর আদায় হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে শুধু দুই খণ্ড করে দিয়েই সংস্কার করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এতে কুফল বেড়েছে। নানা কারণে আশানুরূপ রাজস্ব আহরণ হচ্ছে না।
এদিকে বৈদেশিক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির প্রবৃদ্ধি হলেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেশ কমছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে আশানুরূপ উৎপাদন না হওয়ায় মোট রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থায় ব্যাংক খাত। সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপিডি) গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৮-২০২৩ সাল পর্যন্ত গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ব্যাংক খাতের দেওয়া মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের। নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে- ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে নিয়মের মধ্যে এনে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দেওয়া। যাতে নতুন করে আর কোনো অনিয়ম না হয়। এছাড়া যার এ সেক্টরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে তাদের প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করা।
অর্থ বিভাগের হিসাবে গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদ হার বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ঋণের সুদ হার বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলেও খেলাপি ঋণ, পুঁজিঘাটতি ও শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েই গেছে। আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি গত নভেম্বরে কমছে। এটি বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ। এই দুর্ভোগের মূল কারণ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের পুঁজি বিকাশে বড় বড় ঋণের উপস্থিতি। এগুলো সংগ্রহ করার কথা ছিল পুঁজিবাজার থেকে। এর গভীরে রয়েছে একটি দুর্বল পুঁজিবাজার এবং এখানকার কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়া। সবল ইকুয়িটি বাজার গড়ে না ওঠার কারণে পুঁজিবাজারের বিপদ চেপেছে ব্যাংকের ওপর।


