Originally posted in দৈনিক সমকাল on 9 February 2026

দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের গুরুত্ব বাড়ছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বহুদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইশতেহার ছিল প্রান্তিক বিষয়। দলগুলো নির্বাচন শেষে তা ভুলে যেত। আর জনগণও বিশেষ গুরুত্ব দিত না। তবে এখন দলগুলো ইশতেহারকে আরও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করছে এবং জনগণও আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো– ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। জনগণ যত সচেতন হবে, ততই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধ্য হবে
বিএনপি তাদের ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। বর্তমান অবস্থা থেকে মাত্র আট বছরে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করতে হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৯ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু দেশের যে বিনিয়োগ পরিবেশ তাতে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন বাস্তবসম্মত নয়। মোট বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির ২২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ইতিহাস বলে, জিডিপির অনুপাতে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া কোনো দেশই টেকসইভাবে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারেনি।
বিএনপি কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতা, কর ফাঁকির সংস্কৃতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং দুর্নীতির যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো অতিক্রমের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ইশতেহারে এর রূপরেখা খুব স্পষ্ট নয়।
জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শুনতে আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবতার সঙ্গে এর ফারাক অনেক। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ। অর্থনীতির আকার দুই ট্রিলিয়ন ডলারে নিতে হলে ১০ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার স্থিতিশীল বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং স্বচ্ছ প্রশাসন, যা এখনও আমাদের বড় দুর্বলতা।
জামায়াত ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই আনার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। অথচ বর্তমানে আমাদের এফডিআই জিডিপির শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশেরও নিচে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট দূর না হলে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তারা জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা বলেছে, কিন্তু এর জন্য যে বিপুল আর্থিক ব্যয় প্রয়োজন, তা কীভাবে সংগ্রহ করা হবে– তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসন ছাড়া এ ক্ষেত্রে উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু ইশতেহারে এসব মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা নেই। দলটি কর্মসংস্থানের কথা বলেছে, কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া বিপুল কর্মসংস্থান কীভাবে হবে, তাও সুনির্দিষ্ট নয়।
কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও বিএনপি এবং জামায়াত দুই দলই এক থেকে পাঁচ কোটি নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় এটি অর্জন করা সম্ভব নয়। বিদেশে শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতা, ভাষা, প্রযুক্তি-জ্ঞান বাড়াতে হবে এবং নতুন বাজার খুঁজতে হবে। একইভাবে দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া বড় পরিসরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না।
বিএনপি চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি অত্যন্ত ভালো প্রস্তাব। কিন্তু এই বিশাল কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিপুল অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে সেটিই হবে বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর স্পষ্ট পরিকল্পনা ইশতেহারে থাকা উচিত ছিল।
এলডিসি উত্তরণ: সুস্পষ্ট পরিকল্পনা অনুপস্থিত
২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্য আর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। একই সঙ্গে আমাদেরও আমদানি শুল্ক কমাতে হবে। ফলে রাজস্ব আয়ে চাপ আরও বাড়বে। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এই গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত রূপান্তরের ঝুঁকি মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা অনুপস্থিত। বিনিয়োগ, রপ্তানি, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বাজার বৈচিত্র্য– এসব খাতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া উত্তরণের সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন– তারা এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত নন। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, মিডিয়া, নাগরিক সমাজসহ সব অংশীজনকে নিয়ে আলোচনাভিত্তিক সংস্কারের পথ নিতে হবে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জনগণের মঙ্গলের জন্য– এ বিশ্বাস স্থাপন করেই এগোতে হবে।
সংস্কারই টেকসই উন্নয়নের চাবিকাঠি
আমাদের প্রশাসন, বন্দর, করব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো– সব জায়গাতেই গভীর সংস্কারের প্রয়োজন। কিন্তু এসব সংস্কারে রাজনৈতিক বা ক্ষমতাসীন স্বার্থগোষ্ঠীর বাধা আসে। যেই দল নির্বাচনে জয়লাভ করুক, তাকে অজনপ্রিয় হলেও বাস্তবতাভিত্তিক সংস্কারের দিকে হাঁটতে হবে। কারণ উন্নয়ন কোনো জাদুকাঠি দিয়ে আসে না। টেকসই নীতি, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ধারাবাহিকতায় প্রকৃত উন্নয়ন হয়।
ইশতেহারের দায়িত্বশীলতা
সবশেষে বলতে চাই, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো আরও বাস্তবভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য করুক। উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকলে মানুষ আস্থা হারায়। এই নির্বাচনের পরের নির্বাচনে প্রতিটি দল তাদের পূর্ববর্তী ইশতেহারের কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে– তার একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রকাশ করবে– এটাই জনগণের প্রত্যাশা। টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার পথে এগোতে হলে প্রতিশ্রুতিকে নীতি এবং নীতিকে বাস্তবায়নের শক্তি দিতে হবে। ইশতেহার তখনই অর্থবহ হবে যখন তা হবে বাস্তবমুখী, জবাবদিহিমূলক এবং অর্থনীতির সত্যিকারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
লেখক : ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি


