তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে পুঁজির সংকট ও প্রশিক্ষণের অভাব বড় বাধা – তৌফিকুল ইসলাম

Originally posted in খবরের কাগজ on 18 October 2026

পুঁজির অভাবে আছেন তরুণ উদ্যোক্তারা

প্রতিবছর শ্রমের বাজারে যুক্ত হওয়া তরুণ-তরুণীদের অনেকে উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হন। তবে নানামুখী সংকটে বেশির ভাগই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েন। অনেকে আবার উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কিছু দূর এগিয়েও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না।

অর্থনীতির বিশ্লেষক ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হতে না পারার অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে পুঁজির অভাবকে চিহ্নিত করেছেন। একই সঙ্গে বিপণন সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার অভাব এবং চাহিদামতো প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকাকেও দায়ী করেছেন।

উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী এমন তরুণ-তরুণীদের অনেকে একই মত জানিয়ে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ নতুন করে শ্রমবাজার বা চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ থাকেন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। বছরে আনুমানিক ৯ লাখ তরুণ কাজের সুযোগ বা চাকরি পান। বাকিরা থাকেন বেকার। মানচিত্র দেখুন

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকার তরুণদের সংখ্যা আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে। তরুণ জনসংখ্যাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এটি অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি খবরের কাগজকে বলেন, দেশে বড় মাপের শিল্প-বিনিয়োগ আনতে হলে বড় মাপের প্রস্তুতি প্রয়োজন। যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কঠিন। তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার বাধাগুলো দূর করা এর চেয়ে সহজ, প্রস্তুতিও কম। এতে তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই বেকার তরুণ-তরুণীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। এতে দেশে শিল্প-বিনিয়োগও বাড়বে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, আমাদের তরুণ-তরুণীদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। অনেকে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হতে চান। তরুণ-তরুণীদের অন্যতম বাধা অর্থের অভাব। বেশির ভাগ ব্যাংক তরুণ উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ দিতে চায় না। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার কারণেও ব্যাংক, ঋণ দিতে পারে না। তরুণরা অনেকটা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন সমিতি বা অন্য খাত থেকে অর্থ জোগাড় করে থাকে। এটা তাদের ব্যবসার জন্য অনেক সময় ঝুঁকির হয়ে যায়।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশে তরুণদের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পিছনে সবচেয়ে বড় বাধা পুঁজির সংকট। বাংলাদেশ সাধারণত ব্যাংক ছাড়া ঋণ প্রদানের জন্যে তেমন কোনো আলাদা প্ল্যাটফর্ম নেই, যা অনেক দেশেই আছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি জটিল। এ ছাড়া একজন তরুণ শুরুতেই কোন ধরনের ব্যবসা করবে, কীভাবে ব্যবসা শুরু করতে হবে, ব্যবসার কোন বাধার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নিতে হবে–এসবের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে উদ্যোক্তাদের জন্য গাইডলাইন প্রদান করা হয় না বললেই চলে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে রয়েছে। এই খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তাই প্রথাগত ব্যাংক ঋণ পান না। জামানতবিহীন ঋণের কথা বলা হলেও ব্যাংকগুলো নানাবিধ নথিপত্র খোঁজে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট নিবন্ধন ও ব্যাংক লেনদেনের হিসাবপত্র। তারা শক্তিশালী গ্যারান্টরের (জামানত) খোঁজও করে। এসব শর্ত পূরণ করতে না পেরে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা বিপাকে পড়েন। তারা বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণ নেন।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকার বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তা নিয়ে কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছে। তবে এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের বিষয়ে কোনো কিছু লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তরুণদের যথাযথভাবে উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করা গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের বেশির ভাগ কাজ রাজধানীকেন্দ্রিক। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখে, তাদের সেবা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন অঞ্চলকেন্দ্রিক হওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিটি অঞ্চলে একটি করে কেন্দ্র থাকতে হবে, যেখানে তরুণরা বিনা মূল্যে বা কম খরচে অফিস স্পেস, আইনি পরামর্শ এবং অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মেন্টরশিপ পাওয়া যাবে।

গত মার্চে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ চাকরি পাননি। তরুণীরা এ ক্ষেত্রে আরও বড় বাধার মুখে পড়েছেন।

অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত চাকরিপ্রার্থী তৈরি করে, চাকরিদাতা নয়। অর্থের অভাব তরুণ-তরুণদের অন্যতম সংকট।

জুতা-স্যান্ডেল প্রস্তুতকারক ব্যবসায়ী তরুণ উদ্যোক্তা জালাল আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ৭ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অন্যের দোকানে সরবরাহ করি। নিজেই দোকান দিতে চাই। এর জন্য কয়েকবার ব্যাংকেও গিয়েছি। ব্যাংক জামানত চেয়েছে। অনেক কাগজপত্র চেয়েছে। এসব না থাকায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছি না।

জালাল আহমেদ বলেন, আমাদের জন্য ব্যাংক বড় জটিল। এই জটিল বিষয়কে যদি সহজ করা হতো। আমাদের মতো কতজন অল্প পুঁজির তরুণ ব্যাংকের টাকা মেরে খেয়েছে? তাহলে এত জটিলতা কেন–প্রশ্ন তরুণ এই উদ্যোক্তার।

Get latest updates of CPD's research, policy discourse, publications, and events.