Sunday, April 12, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বাজেট সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — ফাহমিদা খাতুন

Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড on 11 April 2026

জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ৩.২৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা চাইছে সরকার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মাঝে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছে থেকে ৩.২৫ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ঋণচুক্তি চূড়ান্ত ও অর্থছাড় নিশ্চিতের জন্য তৎপরাতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

তারা আরও জানান, প্রথম পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবির) কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার করে, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছে থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ও জাপানের কাছ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার চাইবে সরকার।

অর্থ বিভাগ থেকে যে প্রথমিক চাহিদা পেয়েছে ইআরডি, তার ভিত্তিতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাকে ইতিমধ্যে বাজেট সহায়তা ঋণ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বাজেট সহায়তার জন্য আলোচন্য চালিয়ে যাচ্ছে।

ইআরডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশের শর্তে বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময় ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থতিতে সংকট মোকাবিলায় যেসব উন্নয়ন সহযোগী বাজেট সহায়তা দিয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সরকার। জ্বালানি সমস্যা দূর করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।’

অর্থনীতিবিরা বলছেন, চড়া আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়ে ভাটা ও রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য ঝুঁকির মতো ধাক্কা সামলে দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে বাজেট সহায়তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তারা সতর্ক করে বলেন, সময়মতো অর্থছাড় অত্যন্ত জরুরি। কারণ অর্থছাড়ে দেরি হলে জ্বালানি সরবরাহ, বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সামস্তিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কাজ ধাক্কা খেতে পারে।

বিশ্বব্যাংক থেকে ১ বিলিয়ন ডলার

ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংকের কাছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই ৫০০ মিলিয়ন বাজেট সহায়তার জন্য ইতিমধ্যে সংস্থাটির প্রথমিক আশ্বাসও মিলেছে। এছাড়া আরো ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হবে।

১৩ থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওয়াশিংটন ডিসিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন বৈঠক হবে। ওই বৈঠকগুলোতে মোট ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা ঋণের বিষয়ে আলোচনা হবে। জুনের মধ্যে যাতে ঋণচুক্তি সই হয়, সে বিষয়ে তৎপরতা চালানো হবে বলে ইআরডির কর্মকর্তারা জানান।

এডিবি থেকে ১ বিলিয়ন ডলার

এদিকে বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা দেবে এডিবি। এই অর্থ আগামী মে-জুনের মধ্যে ছাড় হবে বলে ইআরডির কর্মকর্তারা জানান।

এই সহায়তা দুটি কর্মসূচির আওতায় আসবে। ‘স্ট্রেংদেনিং ইকনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রাম (সাব-প্রোগ্রাম ২)’-এর অধীনে প্রথমে ৫০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটের কথা মাথায় রেখে সেই বরাদ্দ আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে এই খাতে মোট বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার।

এছাড়া ‘সেকেন্ড স্ট্রেংদেনিং সোশ্যাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম (সাব-প্রোগ্রাম ২)’-এর অধীনে আরও ২৫০ মিলিন ডলার মিলবে। সব মিলিয়ে এডিবির মোট বাজেট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ১ বিলিয়ন ডলার।

এআইআইবি থেকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার

কর্মকর্তারা জানান, এআইআইবির কাছ ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

আগামী সপ্তাহেই ‘ওয়াটার রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট-স্মার্ট আরবান সার্ভিস ডেলিভারি প্রোগ্রাম (সাব-প্রোগ্রাম ১)’-এর আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ চেয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হবে।

জাইকা থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার

ইআরডি সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে বাজেট সহায়তার বিষয়ে জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার (জাইকা) সঙ্গেও আলোচান শুরু হয়েছে।

জাইকার কাছে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের এই ঋণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য সম্ভাবনা

ইআরডির কর্মকর্তারা বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কী পরিমাণ বাজেট সহায়তা পাওয়া যাবে, তার ওপর ভিত্তি করে কোরিয়া, ইউরোপী বিভিন্ন দেশ ও মধ্যপাচ্যভিত্তিক সংস্থাগুলোসহ অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও বাজেট সহায়তা চাওয়া হবে। ইতিমধ্যে এসব উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইআরডি।

এদিকে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণ কর্মসূচি চলছে। সেই ঋণের পরের ১.৫ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি আগামী জুনে ছাড় হবে বলে অর্থ বিভাগ জানিয়েছে।

কর্তমকর্তারা জানান, উন্নয়ন সহযোগীরা বাজেট সহায়তা দেয় কিছু সংস্কারমূলক শর্ত পূরণের ভিত্তিতে। বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পলিসি ম্যাট্রিক্স তৈরি কাজ করছে অর্থ বিভাগ।

গত অর্থবছর পর্যন্ত মিলেছে ১৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার

গত অর্থবছর পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ১৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। এর সিংহভাগই নেওয়া হয়েছে কোভিড-পরবর্তী সময় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায়।

ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩.৪৪ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা নিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২.০৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১.৭৬৭ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২.৫৯৭ বিলিয়ন ডলার ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১.০৯ বিলিয়ন ডলার সহায়তা মিলেছিল।

স্পষ্ট সামষ্টিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন: জাহিদ হোসেন

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের ঋণের চাহিদা বেড়েছে।

তবে শুধু এই ধরনের সহায়তা দিয়ে চাপ পুরোপুরো সামলানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক অ্যাসেসমেন্ট, বিশেষ করে ব্যালান্স অভ পেমেন্টে কোথায় কী ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা।’

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, তিনটি প্রধান চ্যানেলে চাপ তৈরি হচ্ছে—জ্বালানি ও সারের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল বিশ্ববাজার ও চড়া শিপিং খরচের কারণে রপ্তানি আয় হ্রাস এবং রেমিট্যান্সে সম্ভাব্য ধাক্কা।

তিনি বলেন, আর্থিক হিসাবেও প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে ট্রেড ফাইন্যান্সিংয়ে রিস্ক প্রিমিয়াম বৃদ্ধির মাধ্যমে। পাশাপাশি আর্থিক দিক থেকেও চাপ বাড়বে—রাজস্ব আদায় কমা, ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের সম্প্রসারণের প্রয়োজন হবে।

‘যদি এসব ব্যয় স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের মাধ্যমে মেটানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কাও রয়েছে,’ বলেন তিনি।

জাহিদ হোসেন বলেন, এই প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন সহযোগীরা জানতে চাইবে—সরকার সংকট মোকাবিলায় কী কর্মসূচি নিচ্ছে। তাই একটি সমন্বিত সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি প্রয়োজন, যেখানে ব্যয়সহ স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকবে। অগ্রাধিকার খাত হবে সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, সার মজুত এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনা।

উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয়ের ওপরেও জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ব্যালান্স অভ পেমেন্টে আইএমএফ, আর সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি সহায়তা দিতে পারে।

তিনি সতর্ক করেন, আগে নেওয়া সংস্কার, বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি থেকে সরে আসা যাবে না। এতে ভুল বার্তা যাবে এবং নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

নির্দিষ্ট সময়ে ঋণ পাওয়া জরুরি: ফাহমিদা খাতুন

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বাজেট সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার ব্যাঘাত দেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যা আমদানি ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও এখন সীমিত, জ্বালানি মজুতও অল্প সময়ের চাহিদা মেটাতে পারবে। সরকারের ফিসকাল স্পেসও সংকুচিত—অর্থাৎ অভ্যন্তরীণভাবে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করার সক্ষমতা কম। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারা দেখাচ্ছে, আর রেমিট্যান্স বর্তমানে প্রধান ভরসা হলেও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে সেটিও কমে যেতে পারে ।

তার মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের জোগান আসবে কোথা থেকে?

এখানে উন্নয়ন সহযোগীদের বাজেট সহায়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো সংস্থাগুলোর সহায়তা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে এবং বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা প্রতিদিনই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় দাবি করে। তাই এই সহায়তা দ্রুত ছাড় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে দ্রুত ও পর্যাপ্ত বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করতে পারলে তা অর্থনীতির ওপর চাপ কমাবে, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.