Thursday, April 9, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

নীতিগত জটিলতা ও উচ্চ ব্যয়ে বাধাগ্রস্ত এফডিআই প্রবাহ – মোস্তাফিজুর রহমান

Originally posted in আজকের পত্রিকা on 9 April 2026

বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২৬%

দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ধারাবাহিক কমছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ২০২৫ সালের প্রান্তিকে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা প্রায় ২৬.৩৫% কমেছে। একইভাবে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক সময়ে নিট এফডিআই এসেছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ১৩ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ পরিমাণের দিক থেকে নিট এফডিআই বছরের ব্যবধানে ২ কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ডলার কমেছে। অন্যদিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের অন্যান্য খাত—সরাসরি নতুন মূলধন বিনিয়োগ কিংবা মুনাফার অর্থ পুনর্বিনিয়োগ চিত্রেও নেই আশানুরূপ স্বস্তির খবর। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত বছর বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ তৈরি ছিল না। রাজনৈতিক সমঝোতার অস্থিরতা, নির্বাচন ও স্থায়ী সরকারের অনিশ্চয়তা—এসব কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশে প্রবেশ করতে চাননি। অন্তর্বর্তী সরকারও কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তারা বাধার মুখে পড়েছিল। মূলত এসব কারণেই দেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফাও (রিইনভেস্টেড আর্নিংস) কমেছে। এক বছরের ব্যবধানে এটি কমেছে ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে রিইনভেস্টেড আর্নিংস দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল ৩২ কোটি ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা বলতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম থেকে অর্জিত মুনাফা, যা লভ্যাংশ হিসেবে বাইরে না পাঠিয়ে দেশে পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়। যদিও এটি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়, তবে প্রকৃত এফডিআই প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে সরাসরি নতুন মূলধন বিনিয়োগের ওপর, যা এখনো দুর্বল রয়েছে।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিবেশ বিবেচনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা কমিয়েছে। কারণ, সে সময় নির্বাচন হবে কি না, এ নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। যদিও ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হয়েছে, তবে ওই প্রান্তিকে এ নিয়ে শঙ্কা ছিল। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশে এফডিআই প্রবাহে বাধা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নীতিগত জটিলতা, উচ্চ ব্যবসায়িক ব্যয়, এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। নতুন উদ্যোগ গ্রহণে ধীরগতি, স্থানীয় করকাঠামো ও প্রশাসনিক জটিলতাও বিনিয়োগের চাহিদাকে কমিয়ে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, বন্দর ব্যবস্থাপনায় পরিবহন ও লজিস্টিক সুবিধার সীমাবদ্ধতা, পাশাপাশি কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়ানো ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দেশে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগ কমেছে। এতে বোঝা যায়, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন, পাশাপাশি বিদেশিরাও নতুন বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকছেন। নীতিগত সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি নতুন মূলধন বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা ও আন্তপ্রতিষ্ঠানের ঋণ—এই তিন উৎস মিলিয়ে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৬ কোটি ৩৮ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ে ৪৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসায়িক পরিবেশের সহজীকরণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.