Originally posted in দ্য বিজনেস স্ট্যাণ্ডার্ড on 28 September 2026
অর্থবছরের দুই মাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ৬৯.৯ কোটি ডলার, ছাড় হয়েছে ২৯.৫ কোটি ডলার
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ।
রোববার প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান বাবদ ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার ছাড় হয়েছে।
বিপরীতে, আগে নেওয়া বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারকে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার ডলার দিতে হয়েছে।
এর মধ্যে আসল বাবদ ৫১ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং সুদ বাবদ ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে আসল পরিশোধ বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সুদ পরিশোধ বেড়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় কমে যাওয়ার পাশাপাশি অতীতে নেওয়া ঋণের পরিশোধের সময় হওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইআরডির কর্মকর্তারা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “আমাদের ওপর রাজস্ব চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। কারণ দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প মূলত বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। অতীতে নেওয়া ঋণের বড় একটি অংশ এখন পরিশোধের পর্যায়ে পৌঁছেছে—অর্থাৎ অর্থের বহিঃপ্রবাহ বাড়ছে। কিন্তু বিপরীতে নতুন ঋণের অর্থ ছাড়, বিশেষ করে বৈদেশিক সহায়তা বা এক্সটারনাল ফাইন্যান্সের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে একটি স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে।”
তিনি বলেন, “একদিকে চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করতে হবে, অন্যদিকে নতুন প্রকল্পও নিতে হবে—অর্থাৎ অর্থের চাহিদা আরও বাড়বে। এই প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ থাকবেই। প্রয়োজনীয় বৈদেশিক সহায়তা বা রিজার্ভ না পাওয়া গেলে অর্থায়নের এই ঘাটতি আরও প্রকট হবে।”
ফাহমিদা খাতুন বলেন, এখানে দুই ধরনের চাপ কাজ করছে—একটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর, অন্যটি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বাড়তি অর্থের চাহিদা। উন্নত দেশগুলোরও বৈদেশিক ঋণ থাকে, তবে একই সঙ্গে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখন অর্থের অন্তঃপ্রবাহ কমছে, বিপরীতে বহিঃপ্রবাহ বাড়ছে—এটিই বড় উদ্বেগ।
তিনি বলেন, অর্থ ছাড় কম হওয়ার একটি বড় কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি। অনেক প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন করা যায় না। ফলে প্রতিশ্রুত অর্থ থাকলেও তা ছাড় হয় না। পাইপলাইনে আটকে থাকা অনেক ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে কমিটমেন্ট ফি দিতে হচ্ছে।
“তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা ও কার্যকারিতা—দুটিই বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধান না করলে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হবে,” বলেন তিনি।
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন আগের মতো অনুদান খুব কম পায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঋণ নিতে হচ্ছে এবং এর বিপরীতে সুদও দিতে হচ্ছে। ফলে ঋণের ব্যয় বাড়ছে।
তার মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রকল্পের গুণগত মান। অনেক সময় এমন প্রকল্প নেওয়া হয়, যেগুলোর প্রত্যাশিত রিটার্ন যথেষ্ট ভালো নয়। প্রকল্পের যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই বা মূল্যায়ন না হওয়ায় কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কত আয় বাড়বে বা কত মানুষ সেবা পাবে—এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় আসে না। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বা লবিংয়ের প্রভাবও থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা থাকে উল্লেখ করে ফাহমিদা খাতুন বলেন, অপচয়, লিকেজ, দুর্নীতি ও বিলম্বের কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়ে যায়। এতে প্রকল্পের প্রত্যাশিত রিটার্ন আরও কমে যায়।
তার মতে, এসব কারণে প্রকল্পের গুণগত মান ও রিটার্ন—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রকল্প নির্বাচন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় মূলত পাইপলাইনে থাকা প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু অর্থবছরের শুরুতে, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে, প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতির হওয়ায় অর্থ ছাড় কমে যায়।
তিনি আরও বলেন, আইএমএফ কর্মসূচি চালু থাকলে অতিরিক্ত কয়েকশ মিলিয়ন ডলার দ্রুত পাওয়া যেত। একইভাবে নীতিভিত্তিক বাজেট সহায়তা থাকলেও দ্রুত অর্থ ছাড় সম্ভব হয়, কারণ এসব ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত পূরণের পরই অর্থ ছাড় করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের সহায়তা সীমিত থাকায় বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ কমেছে।
জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থ ছাড় বাড়ানোর দুটি প্রধান উপায় রয়েছে—প্রথমত, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, যাতে পাইপলাইনে থাকা অর্থ দ্রুত ছাড় হয়; দ্বিতীয়ত, সংস্কারভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে বাজেট সহায়তা নিশ্চিত করা।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে অর্থ ছাড় সব সময় ঋণ পরিশোধের চেয়ে বেশি থাকলে বহিঃঋণের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।
তিনি বলেন, “মূল প্রশ্ন ঋণ নেওয়া হবে কি না, তা নয়; বরং ঋণ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে অনেক ঋণ কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান বা মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সাম্প্রতিক তথ্যেও গুণগত উন্নতির ঘাটতি রয়েছে। ফলে ঋণ নিয়ে ভবিষ্যতে তা পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি না হলে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
এদিকে ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে ৭৫ কোটি ৭০ হাজার ডলার ছাড় হয়েছিল, যা এবার কমে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতিও কমেছে।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ মোট ২৪ কোটি ৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার ডলার। সে হিসাবে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি কমেছে ১ দশমিক ১৪ শতাংশ।


