Originally posted in দেশ রূপান্তর on 8 January 2026
কৃষিপণ্যের অতি উৎপাদনেও কাঁচামালের সংকটে শিল্প!

দেশে আলু, টমেটো, সবজি, মরিচ, আমসহ নানা পদের কৃষিপণ্যের ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে। এসব পণ্য ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। এসব পণ্য ঘিরে শত শত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলেও, তাদের ভুগতে হচ্ছে কাঁচামালের সংকটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ কাঁচামলের পুরোটাই আনতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, আম, টমেটো, আলু এবং মরিচের মতো পণ্যগুলোর ২ থেকে ৬ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে এসব শিল্পে। অথচ আলু বা আমের মতো পণ্যের উৎপাদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষপর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মানের ঘাটতি, উত্তম কৃষিচর্চার মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন না হওয়া, ভালো জাতের কৃষিপণ্যের উৎপাদন না থাকায় এ সংকটে পড়তে হচ্ছে বলে মনে করেন কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প-সংশ্লিষ্টরা, যা শুধু দেশের বাজারই নয়, রপ্তানি বাজারকেও ছোট করে ফেলছে।
জানা যায়, সারা বিশ্বে আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, সদ্য সমাপ্ত বছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ টনের বেশি। এই কৃষিপণ্যটির উৎপাদন হয়েছে চাহিদার চেয়েও ২০ লাখ টনের বেশি। তবে সংকটের বিষয় হলো উৎপাদিত আলুর মাত্র ২ শতাংশ বা তারও কম ব্যবহার প্রক্রিয়াজাত করতে পেরেছে এ শিল্প। কারণ, শিল্পে ব্যবহার উপযোগী আলুর উৎপাদন দেশে তলানিতে। অথচ, এ শিল্প চিপসের মতো মজাদার খাবার শুধু দেশেই নয়, সারা বিশে^ই জনপ্রিয়।
শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছে, সারা বছর চিপস তৈরির মতো আলু দেশে চাষাবাদ খুবই সীমিত। দেশের উৎপাদিত আলুর অধিকাংশই খাওয়ার উপযোগী, শিল্পে ব্যবহার উপযোগী নয়। কারণ, শিল্পে ব্যবহার করে চিপস বা ক্র্যাকার্স তৈরি করতে হলে আলুতে ড্রাই মেটারের পরিমাণ থাকতে হয় ২২ শতাংশ বা তারও বেশি। অথচ দেশে উৎপাদিত আলুতে ড্রাই মেটার পাওয়া যায় ১৭-১৮ শতাংশের মধ্যে। যে কারণে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদনেও শিল্পের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। আবার বাড়তি আলু বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেমনটা দেখা গেছে গত বছর। আলুর দাম এত বেশি কমে যায় যে, উৎপাদনের খরচেরও অর্ধেক দামে বিক্রি করেছেন কৃষক।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রথম সারির একটি কোম্পানি প্রাণ, যারা চিপস উৎপাদন ও বাজারজাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াস মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মতো চিপস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কন্টাক্ট ফার্মিং করে শিল্পে ব্যবহার উপযোগী আলু উৎপাদন করতে হচ্ছে। সারা বছর চিপসের যে চাহিদা রয়েছে, তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আমরা সরবরাহ করতে পারছি। বাকি বাজারটা ধরতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে উন্নত জাতের আলুর চাষ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’
এদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি এলডিসি-পরবর্তী সময়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছেন, বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বাজার প্রতিনিয়তই বড় হচ্ছে। প্রতি বছর ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ হারে স্থানীয় বাজার বড় হলেও সেখানে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্য কাঁচামাল হিসেবে খুব একটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আলু, টমেটো, আমের মতো পণ্যগুলোর শিল্পে ব্যবহার হচ্ছে ২ থেকে ৬ শতাংশ। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজার পৌঁছবে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলারে। এ পরিস্থিতিতে শিল্পে রপ্তানি উপযোগী আড়াইশ কোম্পানি থাকলেও বিশ^বাজারে রপ্তানির পরিমাণ খুবই নগণ্য। যদিও শিল্পে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পারিবারিক ও বাণিজ্যিক দুভাবেই ব্যাপক আমের চাষ হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ববাজারের প্রিমিয়াম মার্কেটে রপ্তানির জন্য যে আম দরকার, তার উৎপাদন বাংলাদেশে নেই। যেমনটা ভারত বা থাইল্যান্ডের রয়েছে। ভারতে আলফোসোনা নামের একটি আমের চাষ হয়, যার পাল্প রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের ভালোমানের জাত এখনো নেই, যা দিয়ে পাল্প রপ্তানি করতে পারে যে আম রপ্তানি হচ্ছে তার মাত্র ৬ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে জুস এবং ম্যাঙ্গোবার হিসেবেই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিদেশে যেটুকু রপ্তানি হচ্ছে তার পুরোটাই যাচ্ছে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের জন্য তৈরি হওয়া ‘এথনিক মার্কেটে’।
একই অবস্থা বিস্কুট ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে। একটি বিস্কুট তৈরি করতে গম, চিনি, ভোজ্য তেল, ভেজিটেবল ফ্যাটসহ যেসব উপাদান দরকার, তার সবটাই আসে বিদেশ থেকে। যেমন গমের চালান আনতে হয় কানাডা, ইউক্রেন বা রাশিয়া থেকে। এখন অবশ্য আমেরিকা থেকেও গম আমদানি হচ্ছে নিয়মিত। এ ছাড়া ব্রাজিল থেকে চিনি, মালয়েশিয়া থেকে আনতে হচ্ছে পামওয়েল।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রপ্তানি পণ্যের ক্ষেত্রে নতুন নতুন গন্তব্য ও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের পণ্যের এখনো মূল ক্রেতা ওই বাংলাদেশি প্রবাসীদের ‘এথনিক মার্কেট’। এর বাইরে বিভিন্ন দেশের মানদন্ড মেনে তাদের মূল চেইনে আমরা পণ্য পাঠাতে পারছি না। এ ছাড়া গতানুগতিক পণ্যের বাইরে বিশ্বের উন্নত দেশের মূল খাবারগুলো উৎপাদন করতে পারছি না। আমাদের উন্নত দেশের পণ্য উৎপাদন ও তাদের মান অনুযায়ী সেগুলো তৈরি করতে না পারলে এ খাতের উন্নতি হবে না।
জানা গেছে, বর্তমানে রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৩৯৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে রপ্তানির গন্তব্যও আবার নির্দিষ্ট। রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি পণ্যের গন্তব্য বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশ। পণ্যের ক্ষেত্রেও আবার খুব বেশি ভিন্নতা নেই। মাত্র পাঁচ ধরনের খাদ্যপণ্যই রপ্তানি বাজারের অর্ধেক দখল করে আছে।
এদিকে এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি বাজারে সক্ষমতা ধরে রাখতে বা নতুন বাজার তৈরি করতে হলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামালের ব্যবহার এবং মানসম্পন্ন পণ্য তৈরির বিকল্প নেই বলেও জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারে অনেক ক্ষেত্রে এ দেশের খাদ্যপণ্য অনিরাপদ হচ্ছে। যাতে করে চাইলেও আমরা সব কাঁচামাল ব্যবহার করতে পারছি না। অনিরাপদ হওয়ার কারণে দেশে থাকলেও সেটাকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। দেশে গ্যাপ (গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস) বাস্তবায়ন নেই। সরকারি-বেসরকারি পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব মানসম্পন্ন কাঁচামাল উৎপাদনের নীতি নিয়ে তা বাস্তবায়ন জরুরি।



