Thursday, April 23, 2026
spot_img
Home CPD in the Media

মূল্যবৃদ্ধিতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে বাড়বে ভোক্তা চাপ: ড. মোয়াজ্জেম

দ্বিগুণ দামে তেল কিনছে সরকার

Originally posted in কালবেলা on 21 April 2026

বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেল গম চিনির দাম বাড়ছে

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, মাস দুয়েক আগেও অপরিশোধিত তেল কিনতে বাংলাদেশের খরচ হতো প্রতি ব্যারেল ৫০ থেকে ৬০ ডলার, আর এখন স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে ১১৬ ডলারে। সেইসঙ্গে বেড়েছে জাহাজ ভাড়াও। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে এ দাম সমন্বয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ইরান যুদ্ধের জেরে সরকার বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

এর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য গম, চিনি, ভোজ্যতেল, মসুর ডালসহ জরুরি ভোগ্যপণ্যের দাম। গত এক মাসে এসব পণ্যের দাম ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের দাম।

এতে দেশে পণ্যমূল্য আরও বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতিকে চরম ভাবে উসকে দেবে। এ ছাড়া যদি দাতা সংস্থাগুলো থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া না যায়, তবে শেষ পর্যন্ত দেশের রিজার্ভ থেকে আমদানি ব্যয় মেটাতে হবে সরকারকে। এর মধ্যে আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তিগুলো পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তার ওপর রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় অর্থ ও বাণিজ্য চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ অধিকাংশ পণ্যের রপ্তানি কমছে। গত ৯ মাস ধরে টানা কমেছে দেশের সার্বিক রপ্তানি আয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সবমিলিয়ে বাণিজ্য চাপে পড়ছে, যা সরকারের আর্থিক জায়গা আরও সংকুচিত করবে। এতে চরম চ্যালেঞ্জে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন প্রতিদিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিভিন্ন পণ্যমূল্যের তথ্য সংগহ করে। কমিশনের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত এক মাসে বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার অর্ধেকই পূরণ হয় সয়াবিন থেকে। এক মাস আগে আর্জেন্টিনায় সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি টন ১ হাজার ১১৫ ডলার, যা বর্তমানে ১ হাজার ২৬৬ ডলার ছাড়িয়েছে।

একই ভাবে বেড়েছে অপরিশোধিত পাম তেলের দাম। মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত পাম তেলের দাম গত এক মাসে বেড়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ। প্রতি টন ১ হাজার ৯৫ ডলারের পাম তেল এখন ১ হাজার ২২০ ডলার ছাড়িয়েছে।

দেশে চালের পর দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য শস্য গমের দামও গত এক মাসে প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার অনুসারে প্রতি টন গম এখন ২৩৬ ডলার, যা এক মাস আগে ২৩০ থেকে ২৩২ ডলারের মধ্যে ছিল।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত এক মাস পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনির দাম বেড়েছে ৬ থেকে ৯ শতাংশ। আগে প্রতি টন চিনি কেনা যেত ৩০৮ থেকে ৪১২ ডলারে, যা এখন ৩৩৬ থেকে ৪৩৭ ডলার।

গত এক মাসে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানিকৃত মসুর ডালের দাম বেড়েছে প্রতি টনে ৩৪ ডালার বা প্রায় ৮ শতাংশ। প্রতি টন ৪২০ ডলারের মসুর ডাল এখন ৪৫৪ ডলারের বেশি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার ৯০ শতাংশই মেটাতে হয় আমদানি করে। দেশে প্রতি মাসে কম বেশি আড়াই লাখ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়। তাই বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি মাসে বাংলাদেশের ভোজ্যতেল কেনা বাবদই বাড়তি খরচ হবে ৩ দশমিক ৪৫ কোটি ডলার। এ ছাড়া চিনি, গম, মসুর ডালসহ অন্যান্য পণ্যও আমাদানিনির্ভর। ফলে বাড়তি খরচ হবে এসব পণ্য আমদানিতেও।

সরকারি হিসাব মতে, জ্বালানি তেলে প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগছে। ফলে চলতি বছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা ভর্তুকির ৪২ হাজার কোটি টাকায় কাজ হচ্ছে না। আগামী জুন পর্যন্ত আরও ৩৯ হাজার কোটি টাকা বাড়তি লাগবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান কালবেলাকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের অর্থনীতিকে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছে। সবচেয়ে বেশি ভোগাবে মূল্যস্ফীতি। দেশে জরুরি পণ্যের মধ্যে অনেকগুলোর দাম আগেই বেড়েছে। আবার রোববার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে আরেক দফা বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারেও যেহেতু দাম বাড়ছে, সেটাও কয়েক মাস পর দেশের বাজারে প্রভাব ফেলবে। এতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু দেশে বাড়তি কোনো আয় নেই।

তিনি বলেন, এ প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে আমদানি শুল্ক ছাড় দিয়ে সমন্বয় করতে হবে। তবে অবশ্যই তার সুফল যেন ভোক্তা পায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার ধরে রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় যেটা করতে হবে সেটা হলো—জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে।

এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক অর্থবছর শেষে আগের মূল্যস্ফীতি বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস পরিবর্তন করে আইএমএফ বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। গত অক্টোবরে আইএমএফ বলেছিল, চলতি অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হবে।

এরই মধ্যে দেশের রিজার্ভে চাপ তৈরির কিছুটা আভাস মিলেছে। বৈদেশিক মুদ্রার ‘যথেষ্ট’ মজুত আছে দাবি করার এক সপ্তাহের মাথায় গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দিনে বাজার থেকে ১২ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে এসব ডলার কেনা হয়। গত ২ মার্চ প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই হিসাবে দেড় মাসে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ৪৫ পয়সা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী এখন মূল্যস্ফীতির হার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের মানুষের আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ছে বেশি। মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলে সাধারণত তারা কম খরচ করে এবং সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে বাজারে সামগ্রিক চাহিদা কমে যায়। চাহিদা কমে গেলে ব্যবসা ও শিল্পে এর প্রভাব পড়ে। এতে উৎপাদন হ্রাস পায়, নতুন বিনিয়োগও শ্লথ হয়। আর এর সবই ঘটেছে বাংলাদেশে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালবেলাকে বলেন, অর্থ ও বাণিজ্যে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা এড়ানো সম্ভব নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে যদি আমদানি ব্যয় মেটাতে দেশের রিজার্ভ থেকে অর্থ নিতে হয়। একই সঙ্গে আইএমএফসহ দাতা সংস্থাগুলো থেকে যদি স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া না যায়।

তিনি বলেন, এ সংকট ব্যবস্থাপনা করতে হবে দক্ষ হাতে। সরকারকে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যয় সংকোচন করতে হবে। বাজেট চলতি বছর যা আছে তার মধ্যেই রাখতে হবে। বাড়ানো যাবে না। বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগের রাস্তাটা সহজ করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো পণ্য বা সেবার মূল্য যখন বাড়বে, তখন যাতে নিয়ম মেনে বাড়ে সেটা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। কারণ দেশে কোনো কিছুই নিয়ম মেনে বাড়ে না।

সিপিডির এক গবেষণা বলছে, ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানির সংকট ও দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে চলতি বছর শেষে জিডিপি শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ কমবে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি বেড়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ওঠবে। আর সুদের হার আরও ৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়বে।

সার্বিক আমদানি খরচ বাড়ার এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গতি দরকার। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি কমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও কমছে। সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে রপ্তানি কমেছে ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও গত আট মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে। এ সময় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ আয় কমেছে।

একই সময় তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্য—শীর্ষ এই পাঁচ খাতের সব কটির রপ্তানি কমেছে। ছোট খাতগুলোর অধিকাংশেরও রপ্তানি কমেছে।

দেশের রপ্তানির ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। আর তৈরি পোশাকের বড় দুই বাজার হলো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। তথ্য বলছে, এসব দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক বাজার থেকে তাদের আমদানিও কমে যায়।

গত শুক্রবার মার্কিন শ্রম দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৪ শতাংশ থাকলেও মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশে। এটি ২০২৪ সালের মে মাসের পর এক বছরে সর্বোচ্চ বাড়ার রেকর্ড। প্রায় একই অবস্থা ইউরোপেও।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহম্মদ হাতেম বলেন, আমরা আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারিনি। এখন নতুন করে সংকটের সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ছে। অন্যদিকে আমাদের রপ্তানির বাজারগুলোয় মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় রপ্তানি আরও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সামনের দিনগুলোয় কী হবে—তা নিয়ে আমরা সবাই শঙ্কিত।

Get CPD's latest research, policy insights, publications, and event updates.